ইন্টারনেটের ধীরগতিতে গুরুত্বপূর্ণ কাজে বিঘ্ন

আপডেট : ২৫ জুলাই ২০২৪, ০৭:০৭ এএম

তিন দিনের সাধারণ ছুটি শেষে গতকাল থেকে শুরু হয়েছে সরকারি-বেসরকারি দপ্তরের কার্যক্রম। দেশের বেশিরভাগ অফিস এখন ইন্টারনেটনির্ভর। মঙ্গলবার রাত থেকে দেশে সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু হলেও এর গতি ছিল খুবই কম। আবার কোথাও কোথাও বন্ধ ছিল ইন্টারনেট। ফলে অফিস খুললেও দাপ্তরিক কাজে চরম ব্যাঘাত সৃষ্টি হয়েছে।

এদিকে গতকাল রাত থেকে সারা দেশে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট চালু হয়েছে। যদিও গতি ছিল কম। মোবাইলের ফোরজি ইন্টারনেট চালুর বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। আর সহসা চালু হচ্ছে না ফেসবুক।

ঢাকার গুলশান এলাকায় একটি বহুজাতিক কোম্পানিতে চাকরি করেন কায়সার আহমেদ। গতকাল রাতে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেশ কিছুদিন পর অফিস শুরু হওয়ার কারণে বেশ কাজ জমে গিয়েছে। যার বেশিরভাগই ইন্টারনেটনির্ভর। ইন্টারনেটের সিগন্যাল থাকলেও গতি না থাকার কারণে জরুরি কাজগুলো তারা করতে পারেননি। তবে বিভিন্নজনকে ফোন দেওয়া আর টুকটাক কিছু দাপ্তরিক কাজ হয়েছে, যেগুলোতে ইন্টারনেট লাগে না।

কায়সারের মতো একাধিক ব্যক্তি ইন্টারনেট না থাকা এবং গতি কম হওয়ায় ঠিকমতো কাজ করতে না পারার দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে ইন্টারনেট সেবা চালু হলেও ধীরগতির কারণে সময়মতো সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে ভোগান্তিতে পড়েন সংবাদকর্মীরা।

রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা-বিটিআরসির কার্যালয়ে ইন্টারন্যাশনাল ইন্টারনেট গেটওয়ে (আইআইজি) এবং সাবমেরিন কেব্ল অপারেটরদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক অবকাঠামোর কী অবস্থা, সন্ত্রাসীদের দেওয়া অগ্নিসংযোগ এবং কাটা পড়া লাইন মেরামতের অগ্রগতি কতটা হলো, সেসব বিষয়ে সেখানে আলোচনা হয়।

বৈঠক শেষে বিকেলে এক ব্রিফিংয়ে প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, গতকাল রাতের মধ্যেই সারা দেশে পরীক্ষামূলকভাবে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা চালুর সিদ্ধান্ত তারা নিয়েছেন। সেই সঙ্গে শুক্র ও শনিবার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যামটবের সঙ্গে বৈঠকের পর রবিবার থেকে মোবাইলের ফোরজি নেটওয়ার্ক চালু করার বিষয়ে চিন্তা করা হবে।

পলক বলেন, ‘মঙ্গলবার রাত থেকে ইন্টারনেট চালু হলেও অনেক জায়গায় গতি ছিল কম। মূলত ইন্টারনেট পুনঃস্থাপন কাজের জন্যই ব্যান্ডউইথের এই ধীরগতি। এজন্য আমরা আন্তরিকভাবে দুঃখিত। আস্তে আস্তে এটা স্বাভাবিক করার চেষ্টা করা হচ্ছে।’

ফেসবুক চালুর বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, তারা (ফেসবুক) তাদের নিজেদের গাইডলাইন নিজেরাই মানে না। একেক দেশে একেক রকম আচরণ করে। মিয়ানমার ও ফিলিস্তিনে যখন মুসলমানদের ওপর আক্রমণ হয়, গণহত্যা চালানো হয়, সেগুলো নিয়ে তাদের আচরণ ভিন্ন। আবার ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধকে নিয়ে তাদের আরেক ধরনের অবস্থান। অথচ বাংলাদেশে সহিংসতা উসকে দেওয়ার জন্য যেসব ভিডিও কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে বিভিন্ন গ্রুপ থেকে ফেসবুক সেগুলো বন্ধ করছে না।

তিনি বলেন, ‘আমরা খেয়াল করছি যে এই মুহূর্তে কিছু সামাজিক মাধ্যম, বিশেষ করে ফেসবুক, ইউটিউবÑ তারা যেহেতু আমাদের বাংলাদেশের আইন কোনোভাবে মানছে না, আমাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা কোনো কিছুকেই তারা সম্মান দেখাচ্ছে না এবং তারা তাদের নিজেদের পলিসি গাইডলাইন, প্রাইভেসি সেটিংস নিজেরাই ভঙ্গ করছে। তো এই মুহূর্তে আমরা এই ঝুঁকিটা কীভাবে নেব?’

পলক বলেন, ‘ফেসবুক, ইউটিউব ও টিকটকের কোনো জবাবদিহি নেই। বুস্টিংয়ের মাধ্যমে তারা ঠিকই বাংলাদেশে ব্যবসা করছে, কিন্তু দেশের নিয়ম মানছে না। বাংলাদেশের নিয়ম মানতে তাদের চিঠি দেবে সরকার। এর জবাব দিতে এসব প্রতিষ্ঠানকে হাজির হতে বলা হবে। তারা (ফেসবুক) এসে যদি সেই প্রতিশ্রুতি দেয় যে তারা দায়িত্বশীল আচরণ করবে, তখন আমরা বিবেচনা করে দেখব।’

ইন্টারনেট বন্ধ থাকার কারণে সবক্ষেত্রে নানামুখী ভোগান্তির পাশাপাশি আইটি, ফ্রিল্যান্সার এবং ই-কমার্স খাতের উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়েছেন। অনেকে দেশের বাইরে চলে যাওয়ারও চিন্তা করছেন।

বিষয়টি স্বীকার করে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সীমিত পরিসরে ইন্টারনেট চালুর পর অনেক ফ্রিল্যান্সার খুশি। আবার অনেকেই দেশের বাইরে গিয়ে ফ্রিল্যান্সিং করার চিন্তা করছেন বলেও আমার কাছে খবর এসেছে। আমি সবাইকে বলব, আপনারা একটু ধৈর্য ধরেন। পাশাপাশি এখন ডট বিডি, ডট জিওভি ডোমেইনগুলো সুলভ ও সহজ করে দিয়েছে সরকার। এফ কমার্স খাতের উদ্যোক্তাদের নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করতে পারে।’

দেশীয় ওটিটি প্ল্যাটফর্মগুলোকেও এ ধরনের ডোমেইন ব্যবহারের আহ্বান জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘ই-কমার্স খাতের উদ্যোক্তারা যেন নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন, সেজন্য আমরা দেশীয় ডোমেইন সহজ করেছি।’

ইন্টারনেট ব্যবহারে সবাইকে ‘সহনশীল’ হওয়ার আহ্বান জানিয়ে জুনাইদ আহমেদ পলক বলেন, ‘সত্য-মিথ্যা যাচাই আগে, ইন্টারনেটে শেয়ার পরে। তা না হলে ব্যক্তি, পরিবার ও দেশ সবাই ক্ষতির শিকার হবেন।’

মোবাইল ডেটা চালু নিয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রতিমন্ত্রী বলেন, মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশের (অ্যামটব) সঙ্গে বৈঠক করে রবি বা সোমবারের মধ্যে মোবাইল ডেটা চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে।

ইন্টারনেট বন্ধের কারণে মেয়াদোত্তীর্ণ অব্যবহৃত ডেটার কী হবে, তা জানতে চাইলে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

ফেসবুকের বিকল্প মাধ্যম গড়ে তোলার পরামর্শ দিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ একটি বড় বাজার। এখানে ১৩ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী রয়েছেন। তাই নতুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তৈরির চ্যালেঞ্জ নেওয়ার জন্য উদ্যোক্তাদের অনুরোধ করেন তিনি।

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন ঘিরে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ও পরবর্তী সংঘাতের মধ্যে ১৭ জুলাই রাতে মোবাইল ইন্টারনেট এবং ১৮ জুলাই রাতে ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাঁচ দিন পর মঙ্গলবার রাতে দেশে সীমিত পরিসরে ব্রডব্যান্ড সেবা চালু করে দেওয়া হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত