গুজব ও অপপ্রচার সম্পর্কে ইসলাম যা বলে

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৪, ১২:৩৩ এএম

গুজব রটানো এবং অপপ্রচার মারাত্মক গুনাহের কাজ, যা সামাজিকভাবেও অত্যন্ত ঘৃণিত। আধুনিক বিশ্বে তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও তথ্য আদান-প্রদান অত্যন্ত সহজলভ্য হয়েছে। মুহূর্তেই হাজার মাইল দূরের মানুষটি হতে পারে আমাদের গল্প বা আড্ডার সঙ্গী। তথ্যপ্রযুক্তির এই অবাধ প্রবাহ একদিকে মানুষের জীবনকে করেছে সহজ ও উপভোগ্য, অন্যদিকে এক শ্রেণির অসাধু মানুষ তথ্যপ্রযুক্তির অপব্যবহার করে সমাজে ছড়াচ্ছে মিথ্যা ও গুজব, যা মানুষের মধ্যে তৈরি করে সহিংসতা, বিভেদ এবং বিনষ্ট করে সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা।

ইসলামের দৃষ্টিতে তথ্য একটি পবিত্র আমানত। প্রতিটি আমানতের ব্যাপারে মহান আল্লাহর কাছে আমাদের জবাবদিহি করতে হবে। যারা সমাজে গুজব রটিয়ে বা মিথ্যা তথ্য প্রচার করে পারস্পরিক সম্প্রীতি বিনষ্টে প্রয়াসী হয়, তারা খেয়ানতকারী, ফাসেক ও মুনাফেক। দেশে দিন দিন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে। যদিও প্রযুক্তির এই উন্নয়ন মানুষের জীবনকে সহজ-সাবলীল করেছে এবং গোটা মানবজাতিকে করেছে গতিশীল। কিন্তু স্মার্টফোন দিয়ে মুহূর্তেই স্পর্শকাতর একটি বিষয়কে ভাইরাল করা সম্ভব। এই প্রবণতা বেশি লক্ষ করা যায় নেতিবাচক ও অপরাধমূলক কাজে। একই সঙ্গে তথ্যের অবাধ প্রবাহ মানুষকে বিভ্রান্তও করছে। মানুষ স্বার্থ হাসিলের জন্য সমাজে ভুল ও মিথ্যা কিংবা আংশিক মিথ্যা ছড়িয়ে দিচ্ছে। সমাজে ভয়ভীতি ও আতঙ্কের সৃষ্টি করছে। গুজবের এই ভয়াবহতা থেকে জাতিকে রক্ষা করতে হলে প্রয়োজন কঠোর আইন, নৈতিক শিক্ষা ও সামাজিক সচেতনতা।

গুজব অর্থ রটনা বা মিথ্যা তথ্য ছড়ানো, যার কোনো ভিত্তি নেই। জনসাধারণ সম্পর্কিত কোনো বিষয়, ঘটনা, তথ্য বা ব্যক্তি নিয়ে মুখে মুখে প্রচারিত অমূলক, বিকৃত বর্ণনা বা গল্পকে গুজব বলা হয়। গুজব সৃষ্টি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিদ্বেষ সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে যেমনিভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের সাইবার নিরাপত্তা জোরদার করেছে এবং এ বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছে তেমনি গুজব প্রতিরোধে ইসলামেরও রয়েছে চমৎকার দৃষ্টিভঙ্গি এবং অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থান। ইসলামে গুজবের কোনো স্থান নেই এবং এ বিষয়টি ইসলামে খুবই গর্হিত কাজ হিসেবে চিহ্নিত। পবিত্র কোরআন ও হাদিসে গুজব তথা মিথ্যা অপপ্রচারের ব্যাপারে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রয়েছে। গুজব ছড়ানো ইসলামে শাস্তিযোগ্য অপরাধ। গুজব ছড়িয়ে যারা মানুষের সম্মানহানি করে তাদের জন্য দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির বিধানও রয়েছে ইসলামে।

ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরকালে মানুষকে তার প্রতিটি কাজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। সুতরাং একজন মুসলমান কল্যাণশূন্য কোনো কাজে লিপ্ত হবে না। আর যে কাজে নিজের ও সমাজের কোনো ধরনের ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, তা থেকে অবশ্যই বিরত থাকবে। গুজব তেমনই একটি কাজ। গুজব মানেই ভিত্তিহীন কোনো কথার প্রচার। তা মানুষ হাসানোর জন্য হোক বা মানুষের ভেতর ভয় ও আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য করা হোক। ইসলাম কোনো অবস্থাতেই গুজব ছড়ানোকে সমর্থন করে না। ইসলামের শিক্ষা হলো, মানুষ সর্বতোভাবেই তা পরিহার করবে। বরং প্রয়োজন ব্যতীত কোনো কথা সে বলবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে চুপ থাকে সে মুক্তি পায়।’ (তিরমিজি ২৫০১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সব শোনা কথা প্রচার করা ব্যক্তির মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।’ (সুনানে আবু দাউদ ৪৯৯২) হাদিস বিশারদরা এই হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, কোনো কথা শুনেই প্রচারের প্রবণতা মানুষকে মিথ্যায় লিপ্ত হওয়ার আশঙ্কা বাড়ায়। ফলে সে পৃথিবীতে লজ্জিত হয় এবং পরকালেও তার জন্য রয়েছে শাস্তির বিধান।

সামাজিক মাধ্যমে প্রচারিত অনেক সংবাদের সঙ্গে সামাজিক স্বার্থ জড়িত থাকে। এমন সংবাদের প্রচার মানুষকে ভুল সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে রক্ষা করে এবং কখনো কখনো বড় ধরনের বিপর্যয় থেকেও আত্মরক্ষার উপলক্ষ হয়। এমন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যাপারেও ইসলামের নির্দেশনা হলো, সংবাদ প্রচারের আগে অবশ্যই তা যাচাই করে নিতে হবে। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘হে মুমিনগণ! তোমাদের কাছে যদি কোনো ফাসেক ব্যক্তি কোনো সংবাদ নিয়ে আসে, তবে তা যাচাই করো, অজ্ঞতাবশত কোনো গোষ্ঠীকে আক্রান্ত করার আগেই, (না হলে) তোমরা কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে।’ (সুরা হুজরাত ৬) অপর আয়াতে বলা হয়েছে, ‘যে বিষয়ে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না। নিশ্চয়ই কান, চোখ ও অন্তরের প্রতিটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ (সুরা বনি ইসরাইল ৩৬)

সমাজে বা সামাজিক মাধ্যমে এমন আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়লে মুসলিম সমাজের উচিত তাতে আক্রান্ত না হওয়া। তার প্রসারে সহযোগিতা না করা। বরং যথাযথ কর্র্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের মাধ্যমে তা সমাধানের চেষ্টা করা। পবিত্র কোরআনেও এমনটাই নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন তাদের কাছে নিরাপত্তা বা ভয়ের কোনো সংবাদ পৌঁছে, তখন তারা তা প্রচার করে। যদি তারা তা (সংবাদটি) রাসুল বা তাদের দায়িত্বশীল ব্যক্তির দৃষ্টিগোচর করত, তবে তাদের (দায়িত্বপ্রাপ্ত) অনুসন্ধানকারীরা তার যথার্থতা নির্ণয় করতে পারত। তোমাদের প্রতি যদি আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমত না থাকত, তবে সামান্যসংখ্যক ব্যতীত সবাই শয়তানের অনুসরণ করত।’ (সুরা আয়াত ৮৩)

কোনো বিষয়ে ভিত্তিহীন তথ্য প্রচার করাই হচ্ছে অপপ্রচার। আমাদের সমাজে বিভিন্ন বিষয়ে অপপ্রচার মহামারীর আকার ধারণ করেছে। বর্তমানে এটা প্রতিপক্ষকে দমনের শ্রেষ্ঠ হাতিয়ার। কোনো ব্যক্তি অথবা কোনো প্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো দলকে জনসাধারণের কাছে হেয়প্রতিপন্ন করতে অপপ্রচারের বিকল্প নেই। ইসলামের দৃষ্টিতে কারও বিরুদ্ধে অপপ্রচার করে তার সম্মানহানি করা জঘন্য পাপ। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো ভুল করে কিংবা কোনো পাপ করে, অতঃপর কোনো নির্দোষ ব্যক্তির প্রতি অপবাদ আরোপ করে, সে জঘন্য মিথ্যা ও প্রকাশ্য পাপের বোঝা বহন করে।’ (সুরা নিসা ১১২)

যারা কোনো কথা শোনামাত্র সত্যতা যাচাই না করেই মানুষের কাছে প্রচার করে বেড়ায়, রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের মিথ্যাবাদী হিসেবে গণ্য করেছেন। মিথ্যা হলো সব পাপের মূল। আর মিথ্যা মানুষকে জাহান্নামের পথে টেনে নিয়ে যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো ব্যক্তির মিথ্যাবাদী সাব্যস্ত হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে কোনো কথা শোনামাত্রই (তার সত্যতা যাচাই না করেই) মানুষের কাছে বলে বেড়ায়।’ (আবু দাউদ ৪৯৯২)

লেখক : ইসলামি গবেষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত