কোটা সংস্কারের দাবিতে সারা দেশে তীব্র আন্দোলন হয়েছে। এক পর্যায়ে তা সংঘাতে রূপ নিয়েছিল। সহিংসতায় নিহত হয়েছে দেড়শর বেশি মানুষ। এ পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছে সহস্রাধিক। দেশ জুড়ে জ্বালাও-পোড়াও, ভাঙচুর হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সরকার ইন্টারনেট বন্ধ করেছিল। পরে কারফিউ জারি করে সেনাবাহিনী মাঠে নামানো হয়েছে। ঘটনায় প্রাণহানি-ধ্বংসযজ্ঞের পাশাপাশি আহত হয়ে এখনো হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছেন অনেকে। পঙ্গু হয়েছেন অসংখ্য মানুষ। কারও দৃষ্টিশক্তি প্রায় নিভু নিভু। এসব অসহায় ছাত্র-জনতার সুচিকিৎসার দায়িত্ব কে নেবে? তাদের যন্ত্রণা-কষ্টের ভার কে বহন করবে?
২৪ জুলাই থেকে খুলেছে অফিস-আদালত। তবে নতুন সময়সূচি নির্ধারণ করা হয়েছে। টানা ৫ দিন ইন্টারনেট বন্ধ থাকার পর মঙ্গলবার রাতে সীমিত আকারে চালু হয়েছে। সবশেষ ৪ দফা দাবি জানিয়েছে আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে সহিংসতা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় দেড়শর বেশি মামলা হয়েছে। এর চেয়েও জরুরি হচ্ছে, আহতদের সুচিকিৎসার ব্যবস্থা করা। এরই মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং সমাজের গণ্যমান্যরা এ বিষয়ে কথা বলেছেন। আন্দোলনের কারণে অনেকেই চোখ হারানোর ঝুঁকিতে।
রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ভর্তি আছেন অনেকেই। নরসিংদীর বাবুরহাটে স্টেশনারির দোকান তৌহিদুল ইসলাম ভূঁইয়ার। বয়স ৩৫ বছর। কোটা সংস্কার আন্দোলন কেন্দ্র করে সংঘর্ষের খবর পেয়ে গত বৃহস্পতিবার দোকান বন্ধ করে বাড়িতে ফেরার জন্য বিকেল ৪টার দিকে ভেলানগরে এসে নামেন। তখন সেখানে আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ চলছিল। আন্দোলনকারীরা ইটপাটকেল ছুড়ছিল পুলিশকে লক্ষ্য করে। পুলিশ তাদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার শেল ও ছররা গুলি ছুড়ছিল। এই পরিস্থিতিতে পড়ে চোখে আঘাত পান তৌহিদুল। প্রথমে নরসিংদী সদর হাসপাতাল, সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সর্বশেষ সে রাতেই আনা হয় তাকে রাজধানীর চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে। তৌহিদুলের বড় ভাই মাহবুব ভূঁইয়া বলেন, ‘চিকিৎসকরা বলেছেন, আমার ভাইয়ের দুচোখ নষ্ট হয়ে গেছে। আর দৃষ্টি ফিরে পাবে না। এখন উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে নিয়ে যেতে চাই। সরকারের পক্ষ থেকে যদি কোনো সাহায্য করে। স্ত্রী, ছোট ছোট তিনটা বাচ্চা ওর। কীভাবে যে চলবে?’
শুধু তৌহিদুল নন, দেশ জুড়ে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে সংঘর্ষের সময় চোখে আঘাত পেয়েছেন অসংখ্য মানুষ। তাদের মধ্যে গত ১৭ জুলাই (বুধবার) থেকে গত ২৩ জুলাই (মঙ্গলবার) পর্যন্ত চিকিৎসা নিতে রাজধানীর জাতীয় চক্ষুবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে এসেছেন ৪২৯ জন। তাদের মধ্যে ভর্তি করা হয়েছে ৩২৩ জনকে। জরুরি ভিত্তিতে অস্ত্রোপচার করা হয়েছে ২৯১ জনের। বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১০-১২ রোগী। এ ছাড়া ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে রয়েছেন হাজার হাজার আহত। যাদের সুচিকিৎসা জরুরি। দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে গেলে দেখা যায়, অবর্ণনীয় কষ্ট ও চাপা যন্ত্রণার মধ্যে রয়েছেন হাজারো মানুষ। কেউ চিরজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেছেন আবার অনেকের সংসারে একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি এখন গুরুতর আহত। এদের পরিণতি কী হবে! এ বিষয়ে কে ভাববে?
কেন বা কী কারণে আন্দোলন হয়েছে, কারা আন্দোলনের উসকানি দিয়েছে, কারা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে, এটা বের করা যেমন জরুরি তেমনি জরুরি আন্দোলনের কারণে যারা আহত হয়েছেন, তাদের সুরক্ষা দেওয়া এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে, দায়িত্বশীল কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সুবিবেচনা দেখাবেন।
