আক্রান্ত বাংলাদেশ এবং পেশাদারিত্বের সংকট

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৪, ১২:৪০ এএম

১৭-২৩ জুলাই ২০২৪। আক্রান্ত বাংলাদেশ: নিহত প্রায় ২০০। আহত কয়েক হাজার। সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল হিমশিম খাচ্ছে। ডাটা সেন্টারে আগুন, ইন্টারনেট বন্ধ। অচল দেশীয়-আন্তঃদেশীয় বাণিজ্য, ব্যাংক আর অর্থনীতি। ক্ষতি দিনে ১২০০০ কোটি টাকা। প্রিপেইড মিটারে বিল দেওয়া যাচ্ছে না। বিদ্যুৎহীন বাড়ি, পানি উঠছে না ট্যাংকিতে। সেতু ভবন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, দুর্যোগ অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশনসহ সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অগ্নিকান্ড-ধ্বংসযজ্ঞ। পার্ক করা গাড়িগুলো পুড়ে কঙ্কাল। কুতুবখালী-যাত্রাবাড়ীতে এক রাতে ২২টি স্থানে অগ্নিসংযোগ। হবিগঞ্জের বানিয়াচং গ্রামে ১০০ আহত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ। রাস্তা দখল করে করাত দিয়ে গাছ কাটা। এ সবের কিছুই সম্ভব না সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের পক্ষে। সামর্থ্য নেই। সাধ্য, অর্থ ও সংগঠন নেই তাদের।

সবই একটা গোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের পরিকল্পনা। দু’চারদিনের পরিকল্পনায় কারাগার ভেঙে কয়েদি পলায়ন অসম্ভব। সুযোগের অপেক্ষায় ছিল গোষ্ঠীটি। আর পেয়েই আঘাত করেছে। ছোবল মেরেছে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর। গণমাধ্যমে এদের চলাচল, বেশভূষা, বেপরোয়া ভাব আর সংঘাতের প্রকৃতি থেকে স্পষ্ট এরা প্রশিক্ষিত। স্বল্পমেয়াদি নয়, অনেক দিন এবং নিয়মিত প্রশিক্ষণ। দেখা গেছে বাড্ডা, মোহাম্মদপুর, রামপুরা, যাত্রাবাড়ীর অলিগলি থেকে করেছে ঝটিকা আর সংঘবদ্ধ আক্রমণ। লক্ষ্য শুধু ধ্বংস। দীর্ঘদিনের এই পরিকল্পনাকে যে ছাত্রদের কোটাবিরোধী আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করে আক্রমণ শানাচ্ছে নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আগে থেকে কিছুই জানত বলে বোধ হচ্ছে না। নিরাপত্তা কার্যক্রম সবই প্রতিক্রিয়া (Reactive), কোনো আগাম (Proactive) অ্যাকশন দেখা যায়নি। ২১ জুলাই পুলিশ প্রধান জানালেন ‘সব কিছুই পরিকল্পিত’। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রত্যক্ষদর্শী গাড়িচালক একটি টিভি চ্যানেলকে বললেন ‘এখানে গাড়ি পোড়াতে আসা লোকগুলো আপনার-আমার বয়সী। সঙ্গে কিছু বস্তির টোকাই ছিল। গাড়িগুলোতে কী একটা ছিটিয়ে আগুন দিয়েছে।’ দাহ্য পদার্থটি খুব সম্ভব গানপাউডার ছিল। এগুলো সংগ্রহ, ব্যবহার পেশাদার-প্রশিক্ষিত লোকের পক্ষেই সম্ভব। এই-ই ছিল ছাত্রআন্দোলনের চিত্র।

সংস্থাগুলো এসব খবর আগাম জানতে পারল না কেন? কেপিআই স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তা এসওপি (SOP) কেন কাজ করল না? ব্যর্থতার দায় কার ও কোথায়? ট্রাম্পের ওপর আক্রমণের দায় নিয়ে মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস প্রধান পদত্যাগ করেছেন। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ওপর আক্রমণ। দায় কি কাউকে নিতে হবে না! যদি না নেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে এমন ঘটনা আরও ঘটবে। সরকার তা নিশ্চয়ই খুঁজে বের করবে এবং দেশরক্ষার অত্যাবশ্যকীয় ব্যবস্থা নেবে।

অন্যতম ব্যর্থতার জায়গা হচ্ছে পেশাদারিত্বের অভাব। অপেশাদাররা থাকেন বড় দায়িত্বে। এই অংশের কাজ তোষামুদি আর দলদারিত্ব। পেশাদাররা সাইডলাইনে। সাবেক আমলা বন্ধুর ভাষায় দলদাস। দাসত্ব বিষয়টা প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ হয়ে গেছে। যত অন্ধভাবে সেবা করবে ততই তরক্কি। এদের পক্ষে তাই দেশসেবা হয় না। আগাম সতর্কতা দেওয়া হয়নি এবারের সংকটে। এভাবে চললে আগামীতেও হবে না। শীর্ষস্থানে যখন অযোগ্যরা, অন্ধরা যেখানে বেশি দেখছে সেখানে চক্ষুষ্মান মেধাবী পয়দা হবে কেমন করে! চিন্তা যখন নিজের আখের গোছানোর, প্রতিষ্ঠানের কাজ করার সময় কোথায় তাদের?

অপেশাদার গোষ্ঠী সংকটে সরকারের সাহায্যে আসে না। উল্টো সংকট বাড়িয়ে তোলে। জনগণের জানমালের নিরাপত্তা দিতে বিহ্বল হয়ে পড়ে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘সংকোচের বিহ্বলতায় নিজেরই অপমান।’ কারা নিজেদের অপমানিত করেছেন? নিরস্ত্র আবু সাইদকে রাবার বুলেট দিয়ে হত্যা করে, কে বিব্রত করেছেন সরকারকে? সন্ত্রাসীরা দ্বিতীয় দফা সেতু ভবন আক্রমণ করল। কী আশ্চর্য! কেউ গ্রেপ্তার নেই! এভাবে কি আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখা যায়!

জাতি পেশাদারিত্বের অভাবে সংকটাপন্ন। জানমাল অনিরাপদ। সরকার তখন দেশের একমাত্র পেশাদার প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর সহায়তা নিল। মাত্র কয়েক ঘণ্টার নোটিসে মাঠে নামলেন তারা। জ্বালাও-পোড়াও বন্ধ হলো এক দিনে। টিভি সাক্ষাৎকারে মাঠে কর্মরত একজন ব্রিগেডিয়ার ‘আমরা সন্ত্রাসীদের অবস্থান-আস্তানা চিহ্নিত করেছি। বাসাভাড়া যারা দিয়েছেন তাদের জিজ্ঞাসাবাদের আওতায় আনছি।’ সন্ত্রাসীদের মূলে আঘাত এটাই পেশাদার আচরণ। আর অন্যরা দিলেন রাজনৈতিক বক্তব্য অমুক দল দায়ী। যা কেবল রাজনীতিবিদদেরই মানায়। কখনই এমনটি আমরা আশা করিনি। অবশ্য আমাদের আশা-নিরাশা নিয়ে কজনই বা ভাবেন? কিন্তু এখনো কি সময় আসেনি, নিজেকে জিজ্ঞাসা করার? আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম আর আত্মশুদ্ধির সময় আসেনি এখনো! আমরা জানি না, আদৌ আসবে কি না। তবে নিজেকে জিজ্ঞাসা করা ছাড়া, কে কবে কোন সমস্যার সমাধান পেয়েছে?

অন্যত্র অপেশাদারিত্বের দু’একটা বচন না দিলে বড্ড একপেশে হবে লেখাটা। তিনি উপাচার্য ছিলেন সর্বোচ্চ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের। বঙ্গবন্ধুর নামে প্রতিষ্ঠিত এই প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম কাজ গবেষণার মাধ্যমে চিকিৎসা বিজ্ঞানে নতুন জ্ঞান অর্জন, আধুনিক চিকিৎসাসেবা দেওয়া। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক তৈরির মাধ্যমে সারা দেশে চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া। তার গবেষণা আর পোস্টগ্রাজুয়েট ডিগ্রি দুটো নিয়ে অনেক ধোঁয়াশা। যোগ্যতা ‘কর্মী-নেতা’। বাকি সব তো গণমাধ্যমে এসেছে বারবার। এরা ২০৪১ সালের দিকে এগিয়ে দেবেন না দেশকে। পিছিয়ে দেবেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০২ সালে শিশু বিভাগে যোগ্য প্রার্থীকে বাদ দিয়ে, অন্যজনকে নেওয়া হয়। গত ২২/২৩ বছরে সে বিভাগ আছে আঁতুড় ঘরেই। দেশ পেছাল ২২/২৩ বছর। তাতে কি! মেধাবীদের কি আদৌ প্রয়োজন আছে? এ প্রসঙ্গে দুই দশক আগে শোনা একজন চিকিৎসক নেতার উক্তি শোনাই ‘তুমি প্রতিষ্ঠান বা ছাত্রদের জন্য কী করতে পারবে সেটা মুখ্য নয়। আমার দলের কী কাজে লাগবে সেটাই আসল।’ সত্য কথনের জন্য ভদ্রলোককে ধন্যবাদ দিই। এদিকে সংকটের মধ্যে সবাইকে রেখে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তা সুরম্য অট্টালিকা ছেড়ে উত্তরার বাসায় আশ্রয় নিয়েছেন। সরকার কিন্তু শিক্ষকদের ক্যাম্পাস ছাড়তে বলেনি।

বাংলাদেশ মধ্যম আয়ের দেশে উপনীত হয়েছে। ২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা চলছে। পেশাদারিত্ব আর মেধাবীদের লালন করেই এটা সম্ভব। আমাদের সংবিধানও তাই বলে। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতির ২০ (২) ধারায় লেখা ‘রাষ্ট্র এমন ব্যবস্থা সৃষ্টির চেষ্টা করিবেন, যেখানে...বুদ্ধিবৃত্তিক সকল প্রকার শ্রম সৃষ্টিধর্মী প্রয়াসের ও মানবিক ব্যক্তিত্বের পূর্ণতর অভিব্যক্তিতে পরিণত হইবে।’ সংবিধান প্রণেতারা ১৪০ (১ ক) অনুচ্ছেদে বলেছেন উপযুক্ততার ভিত্তিতে নিয়োগের কথা। অর্থাৎ সংবিধানের মূলনীতি হিসেবে বুদ্ধিবৃত্তিক তথা মেধাভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণের অভিপ্রায় ব্যক্ত হয়েছে। তার ভিত্তিতে উপযুক্ত-যোগ্য ব্যক্তি দেশের কাজ করবেন। কিন্তু বাস্তব কি সেই কথা বলে? আমাদের বিভিন্ন প্রশাসনে উপযুক্ত ব্যক্তি রয়েছেন। কিন্তু তারা এই সময়ে এসে বুদ্ধিবৃত্তিক কোনো কাজ করতে পারছেন না। পদে পদে বাধা। এই-ই যদি হয়, মেধানির্ভর সমাজ তৈরির প্রতীক, তাহলে তার সংকেত কেমন হবে? তার নমুনা কিন্তু আমরা দেখলাম। একটা প্রশ্ন মাথায় সবসময় ঘুরপাক খায়। আমরা কি কেবল চিরকাল বিভিন্ন সমস্যা, অরাজকতা দেখেই যাব? কোনো সমাধান নেই! স্বাধীনতার অর্ধশত বছর পার হয়ে আমরা চলছি আরও প্রবীণের পথে। আর এই দেশে এখনো এসবের জন্য কথা বলতে হয়, এটাই কষ্টের, অপার বেদনার।

আজকের সংকট আমাদের আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে সংবিধানপ্রণেতারা কেন মেধাভিত্তিক দেশ গড়ার কথা বলেছেন? স্বাধীনতার ৫৩ বছরে অর্জন অনেক। সে অর্জনকে ধরে ২০৪১-এ উন্নত বাংলাদেশ আমরা পেতে পারি সংবিধানের মূলনীতি অনুসরণ করে। আদর্শ, দলীয় রাজনীতি অবশ্যই থাকবে। দেশের কাজে মেধাকে প্রাধান্য দিন। বর্তমানে গার্মেন্টস ও অন্যান্য আধা-যান্ত্রিক অর্থনীতির সঙ্গে বুদ্ধিবৃত্তিক অর্থনীতি গড়ে তুলুন। উন্নত বিশ্ব তাই-ই করেছে। সেদিন সবুজ পাসপোর্ট সমাদৃত হবে বিশ্বে। বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী হোক এটা কেবল আর স্লোগান থাকবে না। তখনই জয় হবে বাংলাদেশের মানুষের।

লেখক: অধ্যাপক

shakildr@gmail. com

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত