বেদখল হচ্ছে বন উজাড় হচ্ছে গাছ

আপডেট : ২৬ জুলাই ২০২৪, ১২:৪২ এএম

গাজীপুরে ব্যাপকহারে বেদখল হচ্ছে বনভূমি। এতে উজাড় হচ্ছে বন, হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য। প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক পরিবেশের দূষণ ঘটায় বদলে যাচ্ছে জলবায়ু পরিস্থিতি। দূষণের ঝুঁকিতে পড়ে মানুষসহ সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর জীবন ধারণে বিঘ্ন ঘটেছে। পরিবেশের মাটি, পানি ও বায়ু, মাটির ওপরের পানি, এমনকি ভূ-গর্ভস্থ পানি কোনো কিছুই নিরাপদে নেই। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পরিবেশের ভারসাম্য, দেখা দিচ্ছে নানা রোগ। এ অবস্থার পরিবর্তন করা না গেলে পরিবেশ ও জলবায়ু পরিস্থিতি পরবর্তী কালে প্রজন্মের জন্য চরম হুমকিস্বরূপ হয়ে উঠবে বলে ধারণা বিশেষজ্ঞদের। 

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, বন কর্মকর্তাদের গোচরেই কলকারখানার মালিক ও প্রভাবশালীরা বিভিন্ন কৌশলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি গ্রাস করছে। এতে সবুজ বেষ্টিত বন ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। ভূমি ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করে প্রভাবশালীদের হাত থেকে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের জমি রক্ষা করতে না পারলে আগামী কয়েক দশকের মধ্যে ভাওয়াল জাতীয় উদ্যানের গাছসহ জীববৈচিত্র্য হারিয়ে যাবে বলে মনে করছে এলাকাবাসী।

এদিকে, নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে গাজীপুরের কালিয়াকৈর, শ্রীপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় বনের ভেতর অবৈধভাবে একের পর এক গড়ে উঠছে করাতকল। রাতে এসব করাতকলে শত শত গাছ চেরাই করা হচ্ছে। এতে উজাড় হচ্ছে বন, হারিয়ে যাচ্ছে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য। এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন উপজেলায় অবৈধ ইটভাটার কারণে পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে প্রতিনিয়ত। টনের পর টন গাছ এসব ইটভাটায় জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করায় পরিবেশে কার্বনের পরিমাণ যেমন বাড়ছে, তেমনিভাবে কমছে গাছের সংখ্যা। ইটভাটার ধুলো আর ধোঁয়ায় এলাকার ফসলি জমিতে দেখা দিয়েছে বিরূপ প্রতিক্রিয়া। ফসলহানি, ফল ও সবজি পচে যাওয়া, কুঁকড়ানোসহ নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। ইটভাটায় আইন অমান্য করে অবাধে কাঠ পোড়ানোয় বাতাসে কার্বনের মাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। ফলে ব্যাহত হচ্ছে কৃষি উৎপাদন। সামগ্রিকভাবে পরিবেশ দূষণের মাত্রা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।

বাংলাদেশ রিভার ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মনির হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, আগ্রাসী নদী দখল আর দূষণে নদীর পানিতে মাছ নেই বললেই চলে। নদী রূপ নিচ্ছে মরা খালে। দখল ও দূষণে হারিয়ে যেতে বসেছে গাজীপুরের বিভিন্ন নদ-নদী ও জলাশয়। দখলবাজদের দৌরাত্ম্যে অস্তিত্ব হারাচ্ছে নদী। কলকারখানার বিষাক্ত বর্জ্যে নদীর পানি দূষিত হচ্ছে। কেমিক্যাল মিশ্রিত কালচে ও নীল রঙের পানিতে ভয়াবহ দুর্গন্ধ থাকায় এ পানি ফসলি জমিতেও ব্যবহার করতে পারছেন না কৃষক। পানিতে দূষণের মাত্রা বেশি থাকায় অক্সিজেনের পরিমাণ নেই বললেই চলে। আর এতে করে এসব নদী, খালে মাছসহ নানা জলজপ্রাণি হারিয়ে গেছে।

তিনি আরও জানান, তুরাগ, বালু ও শীতলক্ষ্যা নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছে শত শত কারখানা। ডায়িং, প্রিন্টিং, নিটিং সিরামিক, ইটভাটাসহ বেশিরভাগ কারখানায় ইটিপি না থাকায় সরাসরি বর্জ্য মিশছে নদীর পানিতে। এ ছাড়া বাসাবাড়ির মলমূত্র, গৃহস্থালি বর্জ্যও মিশছে নদীর পানিতে। ফলে পানি দূষিত হচ্ছে ভয়াবহ হারে। বিভিন্ন কলকারখানা এবং যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া ও রাসায়নিক মিশ্রিত শিল্পবর্জ্য, জমিতে ব্যবহৃত কীটনাশক, রাসায়নিক সার, ময়লা-আবর্জনা, পলিথিন, প্লাস্টিক ইত্যাদি পরিবেশের উপাদানকে দূষিত করছে।

নদী বাঁচাও আন্দোলনের সভাপতি অধ্যাপক আনোয়ার সাদত জানান, গাজীপুরে নগরায়ণ ও শিল্পায়নের ফলে পয়ঃনিষ্কাশন ও শিল্পবর্জ্য অনেক বেড়ে গেছে। খাদ্যের উচ্ছিষ্ট ময়লা-আবর্জনা, জীবজন্তুর মৃতদেহ, গৃহস্থালির ব্যবহার্য নানা ধরনের পচনশীল বস্তু যেখানে সেখানে ফেলা হয়। এগুলো পচে বিভিন্ন রোগের জীবাণুর সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া বৃষ্টির পানির সঙ্গে এগুলো মিশে পুকুর, নদী ও জলাশয়ের পানিতে মিশে যাচ্ছে। ফলে পানিও দূষিত হচ্ছে। এসব বর্জ্য বিভিন্ন জলাশয়ে পড়ছে। জলাশয় থেকে নদীতে এবং নদী থেকে সাগরে যাচ্ছে। ফলে পানি দূষিত হচ্ছে। এগুলো মাটির নিচের পানির সঙ্গেও মিশে পানিকে দূষিত করছে। পানি দূষিত হলে সে পানিতে মাছ ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও বাঁচতে পারে না। ফলে পানির পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হয়।

পরিবেশ দূষণ থেকে জেলাবাসীকে রক্ষার বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবুল ফতে মোহাম্মদ সফিকুল ইসলাম বলেন, ‘গাজীপুরে নদী দূষণ রক্ষায় একাধিক কমিটি কাজ করছে। দূষণ, দখল রোধ এবং নাব্যতা ফিরিয়ে আনার জন্য একটি মাস্টারপ্ল্যান করা হয়েছে। তাছাড়া বনের ভেতর অবৈধভাবে গড়ে ওঠা করাতকলের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত