জুলুম-অত্যাচার অনুচিত

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৫১ এএম

মানুষ সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। মানুষের সব কাজের হিসাবনিকাশ হবে। আল্লাহতায়ালার কাছে সব কাজের জবাবদিহি করতে হবে। মানুষের জন্য মহান আল্লাহ সুনির্দিষ্ট নীতিমালা সংবলিত কোরআন নাজিল করেছেন। পবিত্র কোরআনে পরকালে মানুষের জবাবদিহির বিষয়টি সুনিশ্চিত করা হয়েছে। পরকালীন জীবনে কোনো মানুষই জবাবদিহি ছাড়া এক কদমও নড়তে পারবে না। যারা জুলুম-অত্যাচার করে পরকালে তাদের পরিণতি হবে অত্যন্ত কঠিন। আর জুলুমের মধ্যে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে সবচেয়ে বড় ও জঘন্যতম জুলুম। অন্যায়ভাবে কোনো মানুষকে হত্যা করা পুরো মানবজাতিকে হত্যা করার শামিল বলে শরিয়তে উল্লেখ রয়েছে। মহান আল্লাহ সবসময় মজলুমের পক্ষে থাকেন। মজলুমের দোয়া কবুল করেন। আর জালেমের শাস্তিকে ত্বরান্বিত করেন। জালেমকে দুনিয়াতেই শাস্তির মুখোমুখি করেন। পরকালে তো তাদের জন্য ভয়াবহ শাস্তি অবধারিত থাকবেই। তাই কারও প্রতি জুলুম করা থেকে সাবধান থাকা বাঞ্ছনীয়। জুলুমের পরিচয় সম্পর্কে বলা যায়, যার যা প্রাপ্য তাকে সেই প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করার নামই জুলুম। সে হিসেবে কারও অধিকার হরণ, বিনা অপরাধে নির্যাতন, আর্থিক, দৈহিক ও মর্যাদার ক্ষতিসাধন, মানহানিকর অপবাদ দেওয়া, দুর্বলের ওপর নৃশংসতা চালানো, অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ হরণ, অশ্লীল ভাষায় গালাগাল, উৎপীড়ন বা যন্ত্রণা ইত্যাদি কাজ জুলুমের পর্যায়ভুক্ত। মানুষের ওপর কোনোভাবেই অন্যায় আচরণ, জুলুম-অত্যাচার করা যাবে না। মানুষের প্রতি জুলুম-অত্যাচার সবচেয়ে মারাত্মক অপরাধ। এ কারণেই মজলুম-অত্যাচারিত ব্যক্তির আবেদন-নিবেদন মহান আল্লাহর দরবারে সরাসরি পৌঁছে যায়। আল্লাহতায়ালা মজলুমের চাওয়া-পাওয়া খুবই দ্রুততার সঙ্গে কবুল করে থাকেন। সুতরাং মানুষের উচিত, দুনিয়ার কোনো সৃষ্টির প্রতিই জুলুম-অত্যাচার না করা।

শান্তি ও মানবতার ধর্ম ইসলামে সব ধরনের জুলুম বা অত্যাচার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও হারাম। শুধু জুলুম নয়, জুলুমের সহযোগিতা করা এবং জালেমদের সঙ্গে সুসম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠতা রক্ষা করাও হারাম। আর এ বিধান শুধু মুসলমান নয়, কোনো অমুসলিমের ওপর জুলুম করলেও তার জন্য এ হুকুম। মানুষের ওপর জুলুম এক ভয়াবহ গুনাহ। এ কারণে পরকালে দোজখে প্রবেশ করতে হবে। জুলুম থেকে বাঁচার কার্যকর উপায় হচ্ছে লালসা, ক্ষমতার লোভ, হিংসা, ধর্মীয় বিদ্বেষ, ক্রোধ থেকে আত্মসংবরণ করা এবং জনসেবা, ধর্মীয় সেবা ও পরোপকারমূলক কাজে আত্মনিয়োগ করা। হালাল ও বৈধ পন্থায় উপার্জন করা, হালাল টাকা-পয়সার মাধ্যমে পানাহার করা এবং হালাল পোশাক-পরিচ্ছদে সন্তুষ্ট থাকা। সমাজের অনেকেই ধর্মপ্রাণ হিসেবে ধর্মকর্মে অগ্রগামী হলেও অন্যের ওপর জুলুম-অত্যাচারে পিছিয়ে নেই। বিশেষ করে সমাজের সহজ-সরল ও নিম্নশ্রেণির মানুষের ওপর। আরও অবাক করার বিষয় হলো, এই দুর্বল শ্রেণির লোকদের ওপর জুলুমকে অনেকেই অপরাধ বলে মনে করে না। উল্টো কোনো কোনো ক্ষেত্রে আনন্দ প্রকাশ করতেও দেখা যায়।

সবার মনে রাখা দরকার জুলুম, অত্যাচার, নির্যাতন ও নিপীড়ন এমন এক অপরাধ যা সাধারণত আল্লাহ মাফ করেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত ওই মজলুম ব্যক্তি জালেমকে মাফ না করে। আল্লাহতায়ালা কোরআনে বলেছেন, ‘জুলুমবাজরা তাদের জুলুমের পরিণতি সম্পর্কে অচিরেই জানতে পারবে, তাদের গন্তব্যস্থল কেমন।’ হজরত রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, আল্লাহতায়ালা জালেমকে দীর্ঘ সময় পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে থাকেন। অবশেষে যখন পাকড়াও করেন তখন তাকে আর রেহাই দেন না। অতঃপর তিনি এই আয়াত পাঠ করেন, তোমার প্রভুর পাকড়াও এ রকমই হয়ে থাকে, যখন তিনি জুলুমরত জনপদগুলোকে পাকড়াও করেন। তার পাকড়াও অত্যন্ত যন্ত্রণাদায়ক, অপ্রতিরোধ্য। (সহিহ বুখারি)

জুলুমের পরিণতি সম্পর্কে কোরআনে আরও ইরশাদ হয়েছে, ‘আর তোমরা জালেমদের প্রতি ঝুঁকে পড়বে না, জালেমদের সহযোগী হবে না, তাহলে আগুন তোমাদেরও স্পর্শ করবে।’ (সুরা হুদ ১১৩)

মানুষের অধিকার হরণ করা এবং তাদের ধন-সম্পদ আত্মসাৎ করা অনেক বড় জুলুম। এই ধরনের জুলুমের কারণে পুরো পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করছে। শান্তি ও সম্প্রীতি বিনষ্ট হচ্ছে। বিত্তবানরা দরিদ্র শ্রেণিকে ও ক্ষমতাবানরা সাধারণ লোকের প্রতি হিংসার বশবর্তী হয়ে নির্যাতন, নিপীড়ন করে। ফলে একসময় জালেম বা অন্যায়কারীর জীবনে নেমে আসে নানা বিপদাপদ। যারা মানুষের ওপর জুলুম করে এবং প্রাপ্য অধিকার থেকে বঞ্চিত করে তাদের ব্যাপারে রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয় যারা মানুষকে অন্যায়ভাবে কষ্ট দেয়, আল্লাহতায়ালা তাদের শাস্তি প্রদান করবেন।’ (মুসলিম ২৬১৩) পবিত্র কোরআনের অসংখ্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা জুলুমের ব্যাপারে মানবজাতিকে সতর্ক করেছেন। ইরশাদ হয়েছে, ‘অচিরেই জালেমরা জানতে পারবে, তাদের প্রত্যাবর্তনস্থল কোথায় হবে।’ (সুরা শুআরা ২২৭) অন্য আয়াতে আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘জালেমরা কখনো সফল হয় না।’ (সুরা আনআম ৫৭)

জুলুমের পরিণাম খুবই ভয়াবহ। জুলুম এমন একটি অন্যায় কাজ, যার শাস্তি আল্লাহতায়ালা ইহকালেও দিয়ে থাকেন। জালিমের বিচার শুধু কেয়ামতের দিবসেই হবে না, বরং দুনিয়াতেই আল্লাহ তাদের জুলুমের প্রতিদান দেওয়া শুরু করেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘দুটি পাপের শাস্তি আল্লাহতায়ালা আখেরাতের পাশাপাশি দুনিয়াতেও দিয়ে থাকেন। তা হলো, জুলুম ও আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার শাস্তি।’ (সুনানে তিরমিজি ২৫১১)

সমাজে বিরাজমান অত্যাচার-অনাচার ও বিশৃঙ্খলা-অস্থিরতার মূল কারণ হলো জুলুম। একে অপরের ওপর নানা রকম অবিচারের ফলে আল্লাহতায়ালা মানুষের ওপর এ বিশৃঙ্খলা চাপিয়ে দিয়েছেন। আল্লাহতায়ালা ইরশাদ করেন, ‘জল ও স্থলভাগে যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিয়েছে তা মানুষের কর্মের ফলস্বরূপ।’ (সুরা রুম ৪১)

মজলুমের দোয়া কখনো ব্যর্থ হয় না। মজলুমের অশ্রুফোঁটা ও অন্তরের অভিশাপ খুব ভারী। মজলুমের আর্তনাদের ফলে আল্লাহর পক্ষ থেকে জালেমদের ওপর নেমে আসে কঠিন আজাব। তাদের অধঃপতন ত্বরান্বিত হয়। রাসুল (সা.) ইরশাদ করেছেন, ‘তিন ব্যক্তির দোয়া আল্লাহর কাছ থেকে ফেরত আসে না। এক. ইফতারের সময় রোজাদারের দোয়া। দুই. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দোয়া। তিন. মজলুমের দোয়া। আল্লাহ তাদের দোয়া মেঘমালার ওপরে তুলে নেন এবং তার জন্য আসমানের দরজাগুলো খুলে দেন। মহান রব বলেন, আমার সম্মানের শপথ, কিছুটা বিলম্ব হলেও আমি তোমাকে অবশ্যই সাহায্য করব।’ (তিরমিজি : ৩৫৯৮)

রাসুল (সা.) আরও বলেন, ‘তোমরা মজলুমের দোয়ার ব্যাপারে সতর্ক থাকো। কেননা মহান আল্লাহ ও তার দোয়ার মাঝে কোনো পর্দা থাকে না।’ (সহিহ বুখারি ১৪৯৬)

লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত