‘তিনি পুরুষ হলে জয়টা হবে আমার অনেক বড় অর্জন’

আপডেট : ০২ আগস্ট ২০২৪, ০১:২৪ পিএম

আন্তর্জাতিক বক্সিং অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজিত হয়েছিল গত বছর। সেবার ডিএনএ এবাং হরমোন লেভেলের পরীক্ষা করাতে হয়েছিল এক ‘নারী’ বক্সারকে। সেই পরীক্ষায় লিঙ্গ প্রমাণে ব্যর্থ হওয়ায় টুর্নামেন্ট থেকে বাদ দেওয়া হয় তাকে। অথচ সেই বক্সারই দিব্যি খেলে যাচ্ছেন প্যারিস অলিম্পিকে। কাল রাতে আবার তার নামের পাশে জড়িয়ে গেছে বিতর্ক শব্দটিও।

আলজেরিয়ার সেই বক্সারের না ইমানে খেলিফ। মূলত আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটিই তাকে সবুজ সংকেত দেয় অলিম্পিকের ৩৩তম আসরে খেলার। আর তার বিপক্ষে খেলতে নেমে বক্সিং রিংয়ে ৪৬ সেকেন্ডও থীতু হতে পারেননি ইতালির বক্সার অ্যাঞ্জেলা কারিনি। চোখের জলকে সঙ্গী করে পরে তিনি ম্যাচ থেকে ছিটকে গিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার প্যারিসের নর্থ অ্যারেনায় খেলিফ মুখোমুখি হন ইতালির কারিনির। ম্যাচটি শুরু না হতেই দেখে ফেলে শেষের মুখ। ম্যাচের সূচনালগ্ন থেকেই তার সামনে নিরুপায় ইতালির বক্সার অ্যাঞ্জেলা। খেলিফের আঘাতে খেলা শুরুর মাত্র ৪৬ সেকেন্ডেই ম্যাচ ছেড়ে দিতে বাধ্য হন ইতালির বক্সার। এরপর নাকে রক্ত এবং কাঁদতে কাঁদতে রিং ছাড়তে দেখা যায় তাকে।

এ প্রসঙ্গে রিং ত্যাগের সময় অ্যাঞ্জেলা বলেন, ‘প্রচণ্ড ব্যথা হচ্ছে। আমার হৃদয় ভেঙে গেছে। বাবাকে গর্বিত করতে এই লড়াইয়ে নেমেছিলাম। আমাকে অনেকবারই যোদ্ধা হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। কিন্তু আমার শরীরের কথা ভেবে থামতে হলো। আমি কখনও এমন ঘুষি খাইনি। দ্বিতীয় আঘাতের পর আমি নাকে অসহ্য ব্যথা অনুভব করি। এত বছরে রিংয়ে আমার জীবনে এত লড়াইয়ে কখনও এমন অভিজ্ঞতা হয়নি।’

এনিয়ে বেশ ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন দর্শকরা। এটিকে তারা কেলেঙ্কারি এবং কুৎসার বিষয় বলেও আখ্যায়িত করেছেন। সঙ্গে প্রশ্নও তুলেছেন, তাকে কেন আবার অলিম্পিকে খেলার অনুমতি দেয়া হলো? ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনিও এই প্রসঙ্গে ক্রোধ ঝেড়েছেন।

বৃহস্পতিবার খলিফের দাপুটে জয়ের পর আক্রমণ বেড়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ রাইলি গেইনস নামে একজন খেলাফ ও কারিনির লড়াইকে, ‘নারীর বিরুদ্ধে পুরুষ সহিংসতাকে মহিমান্বিত করেছে’ বলে অভিহিত করেছেন

বিখ্যাত ‘হ্যারি পটার’ উপন্যাসের লেখক জে কে রাউলিং কারিনির কান্নাজড়িত একটি ছবি শেয়ার করেছেন। রাউলিংয়ের ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘একজন পুরুষের হাসি যিনি জানেন যে তিনি একজন নারীবিদ্বেষী ক্রীড়া প্রতিষ্ঠান দ্বারা সুরক্ষিত আছেন যিনি সবেমাত্র মাথায় ঘুষি মেরেছেন এবং একজনের স্বপ্ন চূর্ণবিচূর্ন হয়ে গেছে।’

খেলাফের পাশাপাশি চীনের ইউ-টিংকে নিয়েও সমালোচনা হচ্ছে। ক্ষোভ প্রকাশ করা হচ্ছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। তবে তাদের পাশে দাঁড়িয়েছে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি। আইওসি এই দুই অ্যাথলেটের বিরুদ্ধে বর্তমান আগ্রাসনের নিন্দা করেছে। বিবৃতিতে তারা বলেছে, ‘দুই অ্যাথলেট বর্তমানে যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন তাতে আমরা দুঃখিত।’

কাল গভীর রাতে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘প্রত্যেক ব্যক্তির বৈষম্য ছাড়াই খেলাধুলা অনুশীলন করার অধিকার রয়েছে।’ আইওসির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, অলিম্পিক বক্সিং প্রতিযোগিতায় একজন অ্যাথলেটের লিঙ্গ নির্ধারিত হয় তার পাসপোর্টের মাধ্যমে।

বিবৃতিতে আইওসি উল্লেখ করেছে, ‘নারী বিভাগে বহু বছর ধরে আন্তর্জাতিক বক্সিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিচ্ছে আলজেরীয় এবং চীনা-তাইপেই বক্সাররা। কোনো বিতর্ক ছাড়াই টোকিও অলিম্পিকে অংশ নিয়েছিল, খেলিফ নারীদের লাইটওয়েট কোয়ার্টার ফাইনালে পৌঁছেছিল। এছাড়া ইউ-টিং ফেদারওয়েটের শেষ ষোলোতে গিয়ে হেরেছিল।’

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘তার ব্যক্তিত্ব ও মর্যাদার ওপর এ ধরনের আক্রমণ গভীরভাবে অন্যায়, বিশেষ করে যখন তিনি অলিম্পিকে তার ক্যারিয়ারের শীর্ষে ওঠার জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন।’

শুক্রবার উজবেকিস্তানের সিতোরা তুর্দিবেকোভার বিপক্ষে লড়বেন ইউ-টিং। শনিবার নারীদের ৬৬ কেজি বিভাগের কোয়ার্টার ফাইনালে হাঙ্গেরির আনা লুকা হামোরির মুখোমুখি হবেন খেলিফ।

যদিও এই সব বিতর্ককে পাত্তা দিচ্ছেন না ৬৬ কেজি বিভাগের কোয়ার্টার ফাইনালের খেলফের প্রতিপক্ষ হাঙ্গেরিয়ান লুকা হামোরি। ২৩ বছর বয়সী এই বক্সার বলেছেন, ‘খেলাফের বিপক্ষে আমি আগে কখনও রিংয়ে লড়াই করিনি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিসব গল্প হচ্ছে তাতে আমি পাত্তা দিচ্ছি না। আমি এখানে পদক জিততে এসেছি। তাই অন্য কোনোকিছুর পরোয়া করি না। আমি রিংয়ে নেমে আমার জয় ছিনিয়ে আনব। তার বিপক্ষেও জয়ের ব্যাপারে আমি আত্মবিশ্বাসী। তিনি পুরুষ হলে তার বিপক্ষে জয়টা হবে আমার জন্য অনেক বড় অর্জন। আমি মনে করি একটি দুর্দান্ত লড়াই হবে এবং আমি আশা করি আমি জিততে পারি।’

 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত