১
বিশ্বনন্দিত বাংলাদেশি অর্থনীতিবিদ, ক্ষুদ্র ঋণের প্রবক্তা ও শান্তিতে নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের প্রস্তাবে রাজি হয়েছেন। ছাত্রদের প্রস্তাব অনুযায়ী তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান হতে সম্মত। তিনি বলেছেন, ‘ছাত্ররা যদি এত সেক্রিফাইস করতে পারে, দেশের মানুষ যদি এত সেক্রিফাইস করতে পারে, তাহলে আমারও কিছু দায়িত্ব আছে।’
ইতিমধ্যে যা ক্ষতি হয়েছে তা টাকার অঙ্কে কোনোভাবেই হিসাব করা সম্ভব নয়। সশস্ত্র লড়াই করে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, তা যেন এখন একটি মৃত্যুপুরী। উৎপাদন ও রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, হু হু করে বেড়ে যাচ্ছে মূল্যস্ফীতি। ইতিমধ্যে তৈরি পোশাক ও হিমায়িত খাদ্য রপ্তানি মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে। ক্রেতাদের আশ্বস্ত করতে হবে। পাচার করা টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে।
গণ-আন্দোলনের মুখে সদ্য সাবেক আওয়ামী লীগ সরকার নিজেদের Sponsorship-এ বিভিন্ন সময়ে যে অরাজকতা, নৈরাজ্য, ভয় ও দুর্নীতির অভয়ারণ্য তৈরি করে রেখেছিল, তার পুনরাবৃত্তি কোনোভাবেই কাম্য নয়। সরকার পতনের পরপরই সোমবার বিভিন্ন স্থানে, আওয়ামী লীগ অফিস, বিভিন্ন বাসাবাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগের ঘটনার কথা জানা যাচ্ছে, যা অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যেও আক্রান্ত হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সত্য আর গুজব নির্ধারণ করা খুব দুরূহ হয়ে পড়ে। রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা এ ধরনের পরিস্থিতির সুযোগ নেয়। এ ছাড়া অতি উৎসাহী মানুষ প্ররোচনায় পড়ে, গুজবের বশবর্তী হয়ে অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার জন্ম দেয়। এগুলো বন্ধ করতে হবে। যে গণতন্ত্র আমাদের শিক্ষার্থীরা উদ্ধার করতে চেয়ে রক্ত দিয়েছে, সেটা আমরা কোনোভাবেই বিনষ্ট হতে দিতে পারি না। ফলে সব মহলকে সতর্ক থাকার সময় এটি।
মুক্তিযুদ্ধের মৌলিক চেতনায় যে সাম্যের কথা ছিল, যে ভ্রাতৃত্ববোধের কথা ছিল, সবার জন্য যে সমান সুযোগ সৃষ্টির কথা ছিল সেই চেতনাই তো বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনকারীরা বলছেন। একে বাস্তব ভিত্তি দিতে সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে। এ ছাড়া দেশের মানুষ রাজনৈতিক মেরুকরণ ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ-বিপক্ষ বয়ানের আড়ালে উন্নয়নের গল্পের ফাঁকিটা বুঝতে পেরেছে। এমন political polarity বহাল থাকলে উন্নয়ন হিসাব কষে দেখিয়ে দেওয়া সম্ভব হলেও, সেটা সুষম ও টেকসই উন্নতি হবে না।
আমাদের সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বহুধা বিভক্ত রাজনীতির পুনর্মিলন বা reconciliation ঘটাতে হবে। নাজুক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি সামলে উন্নতি করতে হবে। আর্থিক খাত ও আমলাতন্ত্রের ব্যাপক সংস্কার করতে হবে, যাতে করে দুর্নীতির শিকড় উপড়ে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা যায়। দুর্নীতি দমন কমিশনসহ স্বায়ত্তশাসিত সব প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করতে হবে। এগুলো শক্তিশালী না হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক উন্নতি কোনোটাই টেকসই হবে না।
বাংলাদেশের ছাত্রসমাজের উন্নত বুদ্ধিমত্তা ও সময়োচিত গণতান্ত্রিক আন্দোলন থেকে সরকারগুলো কোনো শিক্ষা নিতে চায় না। এটি এ দেশের একটি নেতিবাচক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এ দেশের ছাত্রসমাজ ১৯৫২ সালে বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি তৈরি করেছে ভাষা আন্দোলন সংঘটিত করে। ১৯৬৯ সালে গণ-অভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছে, ১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছে এবং ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদের কবল থেকে গণতন্ত্র ছিনিয়ে এনেছে। কিন্তু প্রতিবারই তাদের অর্জনকে ব্যর্থ করে দিয়েছে রাজনীতিবিদ ও এ দেশের স্ট্যাবলিশমেন্ট। কিন্তু তারা ঘুরে দাঁড়িয়েছে, ফলে ছাত্রদের এই সম্মিলিত শক্তিকে নিয়ে অপরাজনীতি করা ও হেয় করা ঠিক হবে না। সর্বোপরি সার্বভৌমত্বের শক্তি যে জনগণ তাদের দূরে ঠেলে দিলে, তাদের ক্ষমতাহীন করার চেষ্টা করলে সরকার জনগণ থেকে আলাদা হয়ে পড়ে সেটি স্পষ্ট হয়েছে। ফলে জনগণের ক্ষমতায়ন ছাড়া এই সংকট উত্তরণ কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
২
ঠাকুর মায়ের ঝুলিতে একটি গল্পে বলা হয়েছে, ‘রূপ দেখতে তরাশ লাগে, কইতে লাগে ভয়/ কেমন করে রাক্ষসীরা মানুষ হয়ে রয়!’ সাম্প্রতিক প্রেক্ষাপটে কথাটি লিজেন্ডারি সত্য কাহিনিতে পরিণত হলো। দোর্দ- প্রতাপশালী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে সামরিক হেলিকপ্টারে করে পাশর্^বর্তী দেশে আশ্রয়ের খোঁজে বাংলাদেশ ছাড়েন। এ খবর এখন সবারই জানা।
বাংলাদেশের ছাত্ররা গত ১৫ বছর ধরে জাতির ওপর চেপে বসা দুঃশাসন উপড়ে ফেলল। এটা মোটেই সহজ ছিল না। জুলাই মাসের প্রথমে শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলনটি সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনে রূপ নেয়। আন্দোলনটি বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনে আরেকটি নতুন মাইলফলক হয়ে থাকবে।
শুরুর দিকে হাসিনা সরকার পুলিশ, বিডিআর, আর্মিসহ সব রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে আন্দোলন দমনের কাজে নামিয়ে দেয়। বাহিনীগুলোও বলপ্রয়োগের দিকে এগোলেও পরে তারা ছাত্র-জনতার শক্তি বুঝতে পেরে হোক অথবা দেশের জনগণের প্রতি দায় থেকে হোক শক্তি প্রয়োগের অবস্থান থেকে নমনীয় হয়ে আসে। বাংলাদেশ আর্মি তো জানিয়ে দেয় যে, দেশের মানুষের বিরুদ্ধে তারা গুলি করবে না। এর পরপরই আসলে দ্রুত পরিস্থিতি বদলাতে থাকে। নরম হয়ে আসার প্রতাপশালী সরকারের কণ্ঠস্বরও কাতর হয়ে আসে।
কবির সুমনের বিখ্যাত ওই গানটি আমরা স্মরণ করতে পারি ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু তুমি, কণ্ঠ ছাড়ো জোরে।’ আমাদের ছাত্ররা, শিক্ষকরা হাল ছাড়েননি। বরং শত বাধার মুখোমুখি হয়ে তারা লড়াই করে এই গানটির মতোই বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে উজ্জীবিত করেছেন। আমরা দেখলাম জুলুম, অত্যাচার, নির্বিচারে হত্যার বিপরীতে ঠান্ডা মাথায় কীভাবে ছাত্রদের আন্দোলন ক্রমে, ব্লকেড, complte shutdown, অসহযোগ আন্দোলন ও অবশেষে লং মার্চ টু ঢাকা কর্মসূচির মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ লাভ করল। শত শত ছাত্র-জনতা, শিশু, পুলিশ সদস্যের অনাকাক্সিক্ষত মৃত্যুর মধ্য দিয়ে নতুন ইতিহাস লিখা হলো।
শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালানোর পর সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানান। জাতির উদ্দেশে ভাষণে তিনি প্রতিশ্রুতি দিয়ে বলেছেন, ‘দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি একটি interim সরকার গঠন করে দেশ পরিচালনা করা হবে।’ তিনি আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উদ্দেশে বলেন, ‘আপনারা দয়া করে আমাকে সাহায্য করুন। সমস্ত হত্যার বিচার করব... আমি সমস্ত দায়দায়িত্ব নিচ্ছি।’ জেনারেল জামান সবাইকে অনুরোধ জানিয়ে বলেন, ‘সমস্ত ধ্বংসযজ্ঞ, ভাঙচুর, মারামারি ও সহিংসতা থেকে বিরত থাকুন। শান্তি-শৃঙ্খলার পথে ফেরত আসুন।’ তবে দেশের সব রাজনৈতিক দল, সুধী সমাজ, একাডেমিক তো বটেই, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে রক্ত দিয়ে এই আন্দোলন গড়ে তোলা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়কদের প্রস্তাব গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করতে হবে। সিদ্ধান্ত যাই আসুক, সেখানে যেন এই আন্দোলনকারীদের এবং তাদের প্রস্তাবে প্রতিনিধিত্ব থাকে।
৩
বাংলাদেশে একাধিকবার গণতন্ত্র হরণের ঘটনা ঘটেছে। যারাই গণতন্ত্র হরণ করেছিল, তাদের ধারণা ছিল জনগণ নয়, কূটকৌশল আর বন্দুকের নলই ক্ষমতার উৎস। স্বৈরাচারী, কর্তৃত্ববাদী, ফ্যাসিস্ট সরকার যতই শক্তিশালী হোক না কেন, জনগণই আসলে ক্ষমতার উৎস। গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে হাসিনা সরকারের পতনের ঘটনায়, তা আমরা নতুন করে দেখলাম। বিভিন্ন সময়ে, ২০১৪ থেকে পরবর্তী কালে ২০১৮ ও ২০২৪ সালের মেকি নির্বাচন দিয়ে প্রায় সব সামলে যাওয়া আওয়ামী লীগ সরকার শেষ পর্যন্ত টিকতে পারল না। স্বাধীন বাংলাদেশে প্রায় সাড়ে তিন দশক আগে ১৯৯০ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারেরও পতন হয়েছিল ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানেই। এটি স্বাধীনতাকামী বাঙালির একটি রাজনৈতিক ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছে। এই ঐতিহ্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ারই একটি অংশ।
কিন্তু দেখা যায়, একটি গণঅভ্যুত্থানের পর নানারকম পক্ষ-বিপক্ষ ও রাষ্ট্রের সুবিধাভোগী শ্রেণি, কায়েমি স্বার্থবাদী প্রতিষ্ঠান এবং পুরনো মূল্যবোধ ও রাজনীতি বহন আঁকড়ে থাকা রাজনৈতিক দল ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করে। এমনও দেখা যায়, আন্দোলনের মূল চেতনাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্র তৈরি করা হয়। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রীলঙ্কার উদাহরণ বেশ উল্লেখযোগ্য। এমনকি ১৯৭১ সালে আমাদের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং ১৯৯০ সালের স্বৈরাচারবিরোধী গণঅভ্যুত্থানের উদাহরণও এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ফলে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ তো বটেই, সেই সঙ্গে সেনাবাহিনীসহ বর্তমানে যারা দেশকে সামনের দিকে এগিয়ে নেবেন তাদের ইতিহাসের আলোকে সঠিক সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ নিতে হবে। আগের ভুলগুলো আর করা যাবে না। কারণ, বারবার শুরু থেকে শুরু করতে গিয়ে আসলে পিছিয়েই থাকতে হয়।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
