বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের কর্মকর্তাদের উদাসীনতা ও স্বার্থপরতামূলক আচরণে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভবনের চতুর্থতলায় অবস্থানরত নারী ফুটবলাররা। সোমবার ছাত্র-জনতার তীব্র আন্দোলনের মুখে পতন হয়েছে শেখ হাসিনা সরকারের। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করে দেশত্যাগ করেছেন। এরপর থেকেই সাধারণ ছাত্ররা যেমন শুরু করেছে বিজয়োৎসব একই সঙ্গে সুযোগসন্ধানীরা দেশ জুড়ে শুরু করে লুটপাট, অরাজকতা। বিভিন্ন জায়গায় নাশকতা ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ে ব্যাপক জানমালে ক্ষয়ক্ষতি হয়। ক্ষয়ক্ষতি থেকে নিজেরা রক্ষা পেতে সোমবার বাফুফের প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাষ্ট্রপতির আদেশ অমান্য করে বন্ধ রাখে বাফুফে ভবন। জানা গেছে, কর্মকর্তারা সোমবার বাসা থেকে দাপ্তরিক কাজ করেছেন। তবে গতকাল গোটা দিনই অরক্ষিত বাফুফে ভবনে অনিরাপদ অবস্থায় ছিলেন। ভবনের বাইরের ফটক তালা দিয়ে বন্ধ থাকলেও কোনো নিরাপত্তারক্ষীর দেখা মেলেনি।
গতকাল বিকেলে মতিঝিলের বাফুফে ভবনের সামনে গিয়ে এক ভুতুড়ে পরিবেশ দেখা গেছে। চতুর্থ তলায় সিনিয়র জাতীয় দলের ৪০-এর অধিক ফুটবলার অবস্থান করছিলেন। সহকারী কোচ মাহবুব হোসেন লিটুর অধীনে তারা দুবেলা জিম করেছেন। তবে তাদের জন্য বাড়তি নিরাপত্তা দূরে থাক, স্বাভাবিক সময়ের মতো নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিতে দেখা যায়নি। এর মধ্যেই বাফুফে ভবনের সামনে হাজির হয়েছিলেন একঝাঁক ফুটবল সমর্থক। বাংলাদেশি ফুটবল আলট্রাস নামে এই সমর্থকগোষ্ঠী সেখানে জড়ো হয়ে মানববন্ধন করে বাফুফের চার মেয়াদের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের পদত্যাগের দাবি জানান। সে সময় সমর্থকরা ছাড়াও এলাকার অনেক মানুষকে সেখানে জড়ো হতে দেখা যায়। নারী জাতীয় দলের ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম বাবু ছাড়া বাফুফের নারী ফুটবল কমিটির কোনো সদস্য ফুটবলারদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সেখানে ছিলেন না। এমনকি বাফুফের সাধারণ সম্পাদক ইমরান হোসেন তুষারও কাল বাফুফে ভবনে যাননি।
অরক্ষিত বাফুফে ভবনে না রেখে কেন মেয়েদের কোনো হোটেল কিংবা ক্যাম্প বন্ধ করে নিজ নিজ বাসায় পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়নি জানতে চাইলে তুষার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসলে ঘটনাগুলো এত দ্রুত ঘটে গেছে আমরা কোনো ব্যবস্থাই নিতে পারিনি। সমর্থকদের অবস্থানের সময় আমিই প্রধান ফটক থেকে নিরাপত্তাকর্মীদের ভেতরের দিকে চলে আসার নির্দেশ দিয়েছিলাম যাতে অন্তত তাদের সঙ্গে কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে। এটা ঠিক বাফুফে ভবনে কোনোরকম হামলা হলে বা কিছু হলে ফুটবলের বড় ক্ষতি হয়ে যাবে। তবে দেশের সার্বিক যে অবস্থা, তাতে বাড়তি নিরাপত্তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। মেয়েদের ক্যাম্প বন্ধ করে বাসায় পাঠিয়ে দেওয়ার কথা আমরা ভাবছি।’
মেয়েদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ওয়ার্ক ফর্ম হোমের সিদ্ধান্ত কেন জানতে চাইলে বাফুফে সাধারণ সম্পাদক বলেন, ‘আসলে দেশের সার্বিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করে ফিফা থেকেই আমাদের বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করতে বলা হয়েছে। ফিফা পরিস্থিতি বুঝে শনিবার অফিস খোলার পরামর্শ দিয়েছে। তবে আমরা ভাবছি আগামীকাল (বুধবার) থেকে অফিস খুলে দেওয়ার ব্যাপারে।’
এদিকে মেয়েদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে সকাল থেকেই বাফুফে ভবনে উপস্থিত ছিলেন ম্যানেজার আমিরুল ইসলাম বাবু। তিনি বলেন, ‘আমাকে বাফুফের ওমেন্স কমিটি থেকে কিছু বলা হয়নি। নিজের তাগিদেই সকালে এখানে উপস্থিত হয়েছিলাম মেয়েগুলোর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে। সময়টা এখন ভালো না। তাই মনের তাগিদে বাসা থেকে বের হয়ে এসেছি।’
বিকেলে সমর্থকরা অবশ্য শান্তিপূর্ণভাবে মানববন্ধন করে তাদের দাবি তুলে ধরেন। বাফুফে ভবনে তালা দেওয়ার পূর্বপরিকল্পনা থাকলেও ফিফার নিষেধাজ্ঞার কথা চিন্তা করে তারা শক্ত অবস্থান থেকে সরে আসেন। তবে দেয়াল লিখনের মাধ্যমে বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, সিনিয়র সহ-সভাপতি সালাম মুর্শেদী ও নারী ফুটবল কমিটির চেয়ারম্যান মাহফুজা আক্তারে স্বেচ্ছায় সরে যাওয়ার অথবা সেটা না করলেও ভবিষ্যতে যাতে বাফুফের নির্বাচনে অংশ না নেন, সেই নিশ্চয়তা প্রদানের আহ্বান জানান। পাশাপাশি আসছে অক্টোবরে একটি সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টির আহ্বানও জানানো হয় সমর্থকদের পক্ষ থেকে। এই দাবি না মানলে তারা প্রয়োজনে কঠোর অবস্থানে যেতে বাধ্য হবেন বলে হুঁশিয়ারি দেন উপস্থিত সমর্থকরা।
