শ্রাবণের অভ্যুত্থান এবং তারপর

আপডেট : ০৮ আগস্ট ২০২৪, ০৬:৫৪ পিএম

১৯১৭ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের গোড়াপত্তন হয়েছিল যে সফল সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে, সেটির আনুষ্ঠানিক অবলুপ্তি দেখা যায় গত শতকের শেষ দশকের শুরুতে। মস্কোর সেই কমিউনিস্ট বিপ্লবের প্রতি অনুরক্ত অনুসারীরা, বিশেষত ধ্রুপদি মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদীদের কাছে সেই বিপ্লব চোখের মণি। তারা লেনিন থেকে স্তালিন হয়ে একদম শেষতক সোভিয়েত শাসকদের ইতিহাসকে সমাজতন্ত্রের গৌরব বলেই পূজা করেন। কিন্তু ১৯১৭ সালে ভøাদিমির লেনিনের নেতৃত্বে সেই বিপ্লবের এক দশক যেতে না যেতেই প্রশ্ন উঠেছিল। বলশেভিক বিপ্লবের প্রাণপুরুষ লেনিনের মৃত্যুর পর সেই প্রশ্ন নিয়ে ক্ষুরধার কলম ধরেন স্বয়ং লেনিনের সহযোগী লিওন ট্রটস্কি। নির্বাসিত জীবন থেকে তিনি লেনিন-পরবর্তী শাসক জোসেফ স্তালিনকে লেখনির মাধ্যমে আক্রমণ করে গেছেন। তিনি তৎকালের সোভিয়েত শাসনকে কড়া সমালোচনা করেন। ট্রটস্কি যা বলতেন, তার মর্মকথার একাংশ এ রকম জার শাসনের পতনের পর রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির কমরেডদের বিপ্লব বেহাত হয়েছে। অর্থাৎ সমাজতন্ত্রের আবেদন প্রত্যাখ্যাত হচ্ছে স্তালিনের হাত ধরে।

দুনিয়ার ইতিহাসে নানা সময়ে বিপ্লব, জাগরণ আর অভ্যুত্থানের ফল ঘরে না তুলতে পারার আক্ষেপের উদাহরণ বহু রয়েছে। রুশ বিপ্লব কতদিনে বেহাত হয়েছে বা সংকটাপন্ন হয়েছিল, তা বিতর্কের বিষয়। তবে জাগরণ বা অভ্যুত্থানের যাবতীয় ঘটনাগুলোর বিরাট অংশকে আতশ কাচের নিচে ফেললে দেখা যাবে, মানুষের অভূতপূর্ব জাগরণগুলো যেভাবে শাসককে ওপরে ফেলে দিয়েছে; একই কায়দায় তারা প্রতিবিপ্লব বা সুযোগসন্ধানী গোষ্ঠীর আঘাত রুখতে পারেনি। আর এভাবে ক্ষমতার মসনদে পুনর্বাসন ঘটেছে প্রতিক্রিয়াশীল, দক্ষিণপন্থি ও তাঁবেদার গোষ্ঠীর।

তবে হ্যাঁ। দুনিয়াব্যাপী বিপ্লবী আকাক্সক্ষার অপমৃত্যু হলেও মানুষ এই দুরন্ত দুর্গম পথে পা বাড়িয়ে বারবার অকাতরে প্রাণ সঁপে দেয়। এই বেহাত হওয়ার এমন শঙ্কা আর ভীতির কথা যখন লিখছি তখন বাংলাদেশে অভূতপূর্ব অভ্যুত্থানের একটা ধাপ অতিক্রম করেছে। প্রায় নিশ্চিত যে, নোবেল পুরস্কারজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস হতে চলেছেন শেখ হাসিনা-পরবর্তী অন্তর্বর্তী শাসনের প্রধান মুখ। এতে বাংলাদেশের জনআকাক্সক্ষা কতটা মিটবে তাতে চোখ সবার। কারণ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারে তিন দশক আগে নেতৃত্ব দেওয়া শেখ হাসিনা স্বৈরাচারী নেতা হিসেবে দেশ থেকে যখন পালালেন, তখন দেশে অবধারিতভাবে নির্বাচন আয়োজন করতে হবে। আওয়ামী লীগের মতো দলকে ও দলের নেতাকর্মীদের একাকী ফেলে যেভাবে তিনি পালালেন, তা বেসামরিক শাসনের যেকোনো নেতার জন্য বিরল। কারণ, কোনো উর্দিধারীর আশীর্বাদে তিনি ক্ষমতায় আসেননি, তার দলের রয়েছে উজ্জ্বল ইতিহাস এবং তিনি দলের প্রাণভোমরা।

৫ আগস্ট সোমবার, ঠিক বেলা ১টার পর পটপরিবর্তনের সূচনা। রাজধানী ঢাকার অলিগলি থেকে মানুষ তুমুল হর্ষধ্বনি দিয়ে বের হয়ে আসেন উচ্ছ্বাসে। কোটা সংস্কারের দাবি থেকে হাসিনার চূড়ান্ত পতনের আন্দোলনে ছাত্র নেতৃত্বের কারফিউ ভাঙার আহ্বান যেন জনবিস্ফোরণ ঘটায়। নিমিষেই কর্পূরের মতো উবে যায় তার ১৫ বছরের পোক্ত কর্তৃত্ববাদী শাসন। ঢাকাসহ সারা দেশে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সম্মিলিত আক্রমণে শত শত মানুষের প্রাণ হারানোর শোক যেন আনন্দের অশ্রুতে পরিণত হয়। হাসিনার বিরুদ্ধে ক্ষোভ যেন শতগুণ ঘৃণায় নিঃসৃত হচ্ছিল তখন। কিন্তু এরপর যা হবে তা কোন দিকে নিয়ে যাবে বাংলাদেশকে? দেশের জাগরণের দাবি কি ভেসে যাবে নাকি মান্যতা পাবে?

এসব প্রশ্নে ভয়টা মনের মধ্যে উঁকি দেয়। কারণ, বলশেভিক বিপ্লবের কক্ষচ্যুতি বিতর্কিত হলেও চোখের সামনে ইরানি বিপ্লব ও আরব বসন্তের ইতিহাস স্পষ্ট। হাল আমলে শ্রীলঙ্কার স্মৃতিও তাজা। নেপাল রাজতন্ত্র-পরবর্তী ব্যবস্থার নানা ঝুঁকিপূর্ণ সংকট থেকে বের হতে পারেনি। এর বাইরে আফ্রিকার দেশে দেশে নানা  বৈদেশিক শক্তির মদদে সরকার ভাঙা-গড়ার খেলা দেখা গেছে। বাংলাদেশকে ঘিরে চীন ও মার্কিন অক্ষের বিদ্যমান কৌশলের প্রভাবের পাশাপাশি প্রতিবেশী ভারতের অবস্থান আগামীর চালচিত্রকে সরলরৈখিক হিসেবে তুলে ধরছে না। এখানে পরাশক্তিদের জারিজুরি বড় জায়গা দখল করতে পারে। বিশেষ করে হাসিনার পতনের পর  বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের গতিপ্রকৃতি বাংলাদেশের সামনে জটিল ভূরাজনৈতিক খেলার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এখানে চীনের অবকাঠামোগত বিনিয়োগ, ভারতের দীর্ঘদিনের প্রভাব এবং আসন্ন সরকারের নতুন কোনো বৈদেশিক অংশীদারত্ব এই ত্রয়ীর হিসাব-নিকাশ রয়েছে।

এ অবস্থায় একটি সুস্থ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সব শ্রেণি-ধর্মের মানুষের মর্যাদাপূর্ণ জীবন, সব ক্ষেত্রে সুযোগের সমতাসহ সাংবিধানিক ক্ষমতার ভারসাম্যপূর্ণ বন্দোবস্ত তৈরির পথ এবারে হারালে তা হবে চূড়ান্ত পরিতাপের। পৃথিবীতে গণআন্দোলনে পতিত স্বৈরাচারের যত ইতিহাস দেখা যায়, সেগুলোর অনেক কিছুই শেষ অবধি মানুষের সাধ-স্বপ্ন মেটাতে পারেনি। সবচেয়ে শঙ্কার হলো, ইরানে ১৯৭৯ সালে বিপ্লবের পর ইসলামপন্থি শিয়া মতাবলম্বী শাসকরা যেভাবে ক্ষমতাশালী হয়েছেন, সেভাবে একপাক্ষিক লাভবান হওয়ার সম্ভাবনা এখানেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। আর সে রকমটা হলে ছাত্র-জনতার অভিপ্রায় মার খাবে।

শ্রীলঙ্কায় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের দরুন ২০২২ সালে যে রাজনৈতিক জাগরণ ঘটেছিল, সেটিও মানুষের মনে পূর্ণ স্বস্তি দিতে পারেনি। দ্বীপদেশটির প্রভাবশালী রাজাপাকসে পরিবারের হাত থেকে শাসনক্ষমতা ছিনিয়ে আনা এবং একচ্ছত্র ক্ষমতাচর্চার অভিযোগে তাদের বিচারের মুখোমুখি করার কোনো দাবি পূরণ হয়নি। সেখানে পুনর্বাসিত হয়েছে রাজাপক্ষদেরই স্বজন রনিল বিক্রমাসিংহে, যিনি ক্ষমতায় এসেই অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া ছাত্রনেতৃত্বকে কারারুদ্ধ করেছেন। রাজাপাকসেদের বিচারের দাবি অগ্রাহ্যই থেকে গেছে।

গত দশকের গোড়ায় তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসক জাইন-এল-আবিদিনের শাসনের বিরুদ্ধে এক তরুণ গায়ে আগুন দিয়ে যে বিদ্রোহের সূচনা করেছিলেন সেটির ইতিহাসও মানুষ ভুলে যায়নি। পরে তিউনিসিয়া থেকে উত্থিত ‘আরব বসন্তের’ বাতাস লাগে মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে। কিন্তু অনেক দেশে গণবিরোধী শাসকের জায়গাগুলোতে পরে যারা এসেছে তারা কেউই আরব জাগরণে জনতার চাওয়াটাকে শ্রদ্ধা করতে পারেননি। বিশেষত মিসরের সাবেক স্বৈরশাসক হোসনি মোবারকের পর গত এক দশকের রাজনৈতিক অভিযাত্রার পরিণতি হলো, সেখানে আব্দেল ফাত্তাল আল-সিসির মতো নতুন এক স্বৈরাচারী কর্তৃত্ববাদী শাসকের উত্থান। গত বছরের শেষ নাগাদ সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণমূলক এক নির্বাচনের মধ্য দিয়ে নিজেকে প্রেসিডেন্ট ঘোষণা করেন এক সময়ের উর্দিধারী এই জেনারেল। আরব বসন্তের জোয়ারে লিবিয়ায় মুয়াম্মার হোসেন গাদ্দাফির বিরুদ্ধে গণজাগরণ এবং পরবর্তীকালে মার্কিন নেতৃত্বাধীন ন্যাটোর হস্তক্ষেপ এখনো লিবিয়াকে বিপর্যস্ত করে রেখেছে। দেশটির ঐক্যবদ্ধ কোনো সরকার আজও তৈরি হয়নি। একইভাবে ইয়েমেনে আলি আব্দুলশ সালেহ জনবিক্ষোভে ক্ষমতাহারা হওয়ার পর দেশটি এই শতকের সবচেয়ে দীর্ঘ ও প্রাণঘাতী এক গৃহযুদ্ধ পার করছে। সিরিয়া এখনো জ¦লছে। সেখানে আরব বসন্তের বিক্ষোভ যেন মানুষকে নরকের দুয়ার চিনিয়েছে। দেশটিতে এখনো টিকে রয়েছে বাসার আল আসাদের সরকার। সিরিয়া এখন দুনিয়ার বড় বড় শক্তি আর অস্ত্রধারীদের যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশে এই গণজাগরণে পরিপূর্ণ সাম্য ও ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থার দিকে যাত্রা করবে তার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে নিশ্চয়তা নেই। কিন্তু মানুষের চাওয়া এটুকুই দেশটা যেন ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি স্থায়ী উপায় বেছে নেয়, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো সঠিক দিশা পায় এবং নিদেনপক্ষে বুর্জোয়া অর্থনীতির প্রকৃত বিকাশটুকু হয়। অভ্যুত্থানের পর আওয়ামী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে লড়াই করা অনেক বিদ্বজ্জনকে মঞ্চে দেখা যাচ্ছে না। আবার দৃশ্যপটে সব দলের প্রতিনিধিকেও দেখা যাচ্ছে না। সব মতের উপস্থিতির পরিবর্তে মধ্যডান ও চরম ডান শক্তিগুলোর শক্ত অবস্থান দেখা যাচ্ছে ঘটনাপ্রবাহের পরতে পরতে। বিশেষত, সারা দেশে আওয়ামী লীগের শাসনকালের কর্মকা-ের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেশা দেখা যাচ্ছে। শ্রাবণে নেমে আসা বসন্তের তরুণদের আহ্বান ও নিষেধ সত্ত্বেও উন্মত্ততা থামেনি। সত্যিকারের প্রতিনিধিত্বপূর্ণ একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার হাতে স্বচ্ছ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন না হলে অকালে উদ্ভূত জাগরণ পরাভূত হবে।

নব্বইয়ে স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর আমরা যে স্থায়ী গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিলাম, তার কী দশা হয়েছে তা মানুষের সামনে স্পষ্ট। সেই ভগ্নদশার স্বপ্ন এবার যেন আর ফিরে না আসে। লুটপাটের চক্রের বিদায়ের পর আরেক সংঘবদ্ধ লুটেরার আবির্ভাব যেন না ঘটে। আদিবাসী-বাঙালির বেঁচে থাকার গ্যারান্টিটুকু যাতে পাওয়া যায়। কথা বলার জন্য যাতে ভয় না পেতে হয়।

যতটা অনুমান করা যাচ্ছে, সম্ভাব্য অন্তর্বর্তী সরকারের চেহারা যতটা সামনে আসছে তা পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে উষ্ণ সম্পর্কের ইঙ্গিত বহন করে। এই সরকারের সামনে নির্বাচন আয়োজনটি বড় চ্যালেঞ্জ। কিন্তু নির্বাচিত নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতার লাগাম ছাড়ার আগে যেসব গণতান্ত্রিক সংস্কারের কথা এতকাল শুনতাম, সেসব সংস্কারের পদক্ষেপ দৃশ্যমান হতে হবে। একই সঙ্গে দেশটা বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পরামর্শে যেন একটা উদারবাদী অর্থনীতির বল্গাহারা উপত্যকা হওয়ার চক্রব্যূহে যেন না পড়ে।

লেখক: অনুবাদক ও লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত