তারুণ্যের উতল হাওয়ায় বদলে যাক ক্রীড়াঙ্গন

আপডেট : ১০ আগস্ট ২০২৪, ১২:৩৪ এএম

কবি সুকান্ত ভট্টাচার্য লিখেছিলেন ‘আঠারো বছর বয়স ভয়ংকর’। সেই আঠারো বছরের দুর্বার তারুণ্যই রাজপথ রাঙিয়ে বদলে দিল বাংলাদেশের ইতিহাস। দিকে দিকে শোনা গেল মাভৈঃ মাভৈঃ। আওয়াজ উঠল পরিবর্তনের। জীর্ণ-পুরাতনকে আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করে বাংলাদেশের রাষ্ট্রযন্ত্রেও উড়ল নতুনের বিজয় কেতন। নজরুলের ভাষায়, ‘যে সিন্ধু জলে ডাকিয়াছে বান, তাহারি তরে এ চন্দ্রোদয়’। তারই আলোর অপেক্ষায় দিন গুনছে নোংরা রাজনীতি আর দুর্নীতি-অনিয়মে বিপর্যস্ত বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গন। আর যাকে ঘিরে এত স্বপ্ন, তিনি যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া।

দেশে অর্ধশতাধিক ক্রীড়া ফেডারেশন থাকলেও ক্রিকেট আর ফুটবলই সবচেয়ে জনপ্রিয়। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে এই দুটি খেলায়ও বাংলাদেশ যে খুব উঁচুতে আছে তা কিন্তু নয়; বিশেষ করে কাজী সালাউদ্দিনের শাসনামলে ফুটবল শুধু পিছিয়েই গেছে। শুধু তা-ই নয়, দুর্নীতির দায়ে ফিফার শাস্তিও পেয়েছেন বাফুফের সাবেক ও বর্তমান একাধিক কর্মকর্তা। আস্থা হারিয়ে স্পনসররাও মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন। এমনকি চুক্তিবদ্ধ নারী ফুটবলারদের বেতন পর্যন্ত দিতেও তাদের অনীহা। তৃণমূল পর্যায়ে ফুটবল আয়োজন কিংবা নতুন প্রতিভা খুঁজে আনায় বাফুফের বর্তমান কমিটির খুব একটা গরজ পরিলক্ষিত হয়নি। যা হয়েছে এবং হচ্ছে, সবই যেন রুটিনওয়ার্ক।

ক্রিকেটে মাঝেমধ্যে আন্তর্জাতিক সাফল্য এলেও এর ভিত মোটেও শক্তিশালী নয়। বোর্ড কর্তারা খেলার চেয়ে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারেই ছিলেন অধিক মনোযোগী। সিনিয়র ক্রিকেটারদের কেউ কেউ রাজনৈতিক ফায়দা নিয়ে স্বেচ্ছাচারিতার সর্বোচ্চটা দেখিয়েছেন। দলে সৃষ্টি হয়েছে অবিশ্বাস, বিশৃঙ্খলা। সদ্য সাবেক ক্রীড়ামন্ত্রী এবং বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপনের দীর্ঘ শাসনামলে ক্রিকেট যেন একটা জায়গায় গিয়ে আটকে ছিল। বিপুল জনপ্রিয়তা এবং অর্থ থাকলেও দেশজুড়ে গড়ে ওঠেনি প্রয়োজনীয় অবকাঠামো। নেই পর্যাপ্ত ক্রিকেট একাডেমি। একজন ক্রিকেটারের বেড়ে ওঠা থেকে শুরু করে জাতীয় দল পর্যন্ত যাত্রাপথটি এখনো মসৃণ নয়। ঘরোয়া ক্রিকেটের মান তো নেই-ই; বরং পাতানো ম্যাচের অভিযোগ ওঠে প্রতি মৌসুমেই।

এই দুটি খেলার বাইরে বাকিগুলোর অবস্থা তথৈবচ। অলিম্পিকে বাংলাদেশ কখনো কোনো পদক পায়নি। বিশেষ বিবেচনায় অংশগ্রহণ আর অভিজ্ঞতা অর্জন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ। পাশের দেশ ভারত অনেকদিন ধরেই অলিম্পিককে লক্ষ্য করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করে আসছে। প্রচলিত এবং অপ্রচলিত এই খেলাগুলোর পেছনে তারা প্রচুর বিনিয়োগ করেছে। খেলোয়াড়দের আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। এই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ফলে নিয়মিতই অলিম্পিকে আসছে সাফল্য। ভারত যেখানে শুটিংয়ের পেছনে বছরে ৫০ থেকে ৬০ কোটি রুপি খরচ করছে, সেখানে বাংলাদেশে মাত্র ১১ লাখ টাকা! এই একটি উদাহরণেই পরিষ্কার পার্থক্যটা আকাশ-পাতাল। শুধু অর্থই নয়, সঠিক নেতৃত্ব এবং সংগঠকেরও অভাব আছে বিস্তর। দলীয়করণের কারণে ফেডারেশনগুলো এখনো অযোগ্যদের দখলে। একজন অ্যাথলেটকে গড়ে তুলতে নেই কোনো সুষ্ঠু পরিকল্পনা কিংবা সুনির্দিষ্ট রোডম্যাপ; বরং কিছু কিছু ফেডারেশন আছে স্রেফ নামেমাত্র। বেটিং আর ফান্ড কালেকশন করাই যেন তাদের প্রধান কাজ!

ক্রীড়াঙ্গনের তরুণ অভিভাবক আসিফ মাহমুদের সামনে তাই অপেক্ষা করছে কঠিন চ্যালেঞ্জ। একটি ভঙ্গুর সিস্টেমকে ঠিক করতে হবে। রাজপথের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া এই তরুণের কাছে দেশবাসী এবং ক্রীড়া ব্যক্তিত্বরা রাজনীতিমুক্ত ক্রীড়াঙ্গনের দাবি জানাচ্ছেন। নবীন প্রতিভার চলার পথটি মসৃণ করার প্রত্যাশা ২৬ বছর বয়সী ক্রীড়া উপদেষ্টার কাছে। সেই সঙ্গে প্রয়োজন সঠিক নীতিমালা, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহির। সবগুলো ফেডারেশনে তিনি সরাসরি হস্তক্ষেপ করতেও পারবেন না। কারণ, আইসিসি কিংবা বাফুফের মতো বৈশি^ক সংস্থাগুলো কিছু বিধিনিষেধ দিয়ে রেখেছে। এসব নিয়মের ফাঁক গলে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে আর যেন কোনো দানব তৈরি না হয়, সেদিকেও নিশ্চয়ই তার কৌশলী নজর থাকবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘সবুজের অভিযান’-এর মতো দেশের ‘আধমরা’ ক্রীড়াঙ্গনকে ‘ঘা মেরে’ বাঁচানোর দায়িত্ব এখন আসিফ মাহমুদের কাঁধে। উপদেষ্টা হিসেবে শপথ নেওয়ার পর ফেসবুকে তিনি সেই ইঙ্গিতও দিয়ে রেখেছেন, ‘ব্যক্তিগত লাভের আশায় আবদার, তদবির করা থেকে বিরত থাকুন। এতে করে আমার সঙ্গে আপনার সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। দেশ গঠনে পরামর্শ থাকলে জানাবেন।’ সেই আসিফ মাহমুদের হাত ধরে দেশের ক্রীড়াঙ্গনে এবার হোক ‘নতুনেরই জয়’।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত