আশঙ্কার গোবরে অনিন্দ্যসুন্দর পদ্মফুল

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৪, ১১:১৩ এএম

আমার কলেজ বন্ধু, নটর ডেম কলেজের লাস্ট বেঞ্চের চিরসাথি জুনায়েদ রব্বানীর ছবি একবার দেখি পত্রিকার প্রথম পাতায় চলে এলো। আমাদের যে বয়স তাতে জঙ্গি হামলা-টামলা করলে সে সময় ছবি ছাপা হয়, কিন্তু আমার বন্ধুর ছবি এলো অসহায় মানুষকে সাহায্য করার কারণে। অসহায় মানুষকে তো কতজনই সাহায্য করে, ছবি ছাপার কী হলো? কারণ হচ্ছে আমার বন্ধু সাহায্য পাঠিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রে ঘূর্ণিঝড় আক্রান্ত মানুষকে। পৃথিবীর সবচেয়ে ধনী ও ক্ষমতাসীন রাষ্ট্রে অনাকাক্সিক্ষত বিপর্যয় হলে কী হতে পারে সেবারই জেনেছিলাম। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়া পত্রিকার সংবাদগুলো জানিয়েছিল যে, সাইক্লোনের ফলে বিদ্যুৎ সংযোগে ক্ষতি হয় আর সেই সুযোগে বেশুমার লুটপাট, অরাজকতা চলে। আরেকটু বড় হয়ে শুনতে পাই, স্বপ্নের যুক্তরাষ্ট্রে কোনো কারণে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকলে নাকি খুন, ধর্ষণ আর লুট বেড়ে যায় বহুগুণে।

বাংলাদেশের টালমাটাল অবস্থায় গল্পটা মনে পড়ল। গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার শেখ হাসিনার অকস্মাৎ দেশত্যাগে দেশের সব আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে। এর আগে তিন সপ্তাহ শত শত আন্দোলনরত ছাত্র-জনতাকে হত্যা করা হয় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে। পুলিশের কিছু সদস্যও সহিংসতায় প্রাণ হারান। ফলে গোটা দেশে এমনিতেই একটা গৃহযুদ্ধের মতো অবস্থা তৈরি হয়েছিল; যার দুপক্ষ একদিকে ছাত্র-জনতা, অন্যদিকে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মী এবং পেটোয়া রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কিছু সদস্য। ফলে হাসিনার পদত্যাগ ও বিদায়ে ক্ষুব্ধ জনতা দেশের থানাগুলোর ওপর চড়াও হয়। এ সময় তেমন কোনো প্রতিরোধ না করায়, লুটপাট হতে থাকে অবাধে।

দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে স্বৈরাচারী শাসক ও শাসক দলের ওপর জনতার ক্ষোভ ছিল। আওয়ামী লীগ দেশে একদলীয় শাসন কায়েম করেছিল। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা দমন করতে ডিএসএর মতো কালাকানুন করেছিল। দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠানসহ সব রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যেগুলো জনতার রক্ষাকবচ ও ভরসা, সেগুলোকে দলীয়করণ করা হয়। দুর্নীতি আর দমনের ফলে জনগণের প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়। একদিকে দেশের অর্থনীতি ডুবছিল, সাধারণ মানুষ গরিব হচ্ছিল, অন্যদিকে দুর্নীতি করে কিছু মানুষ ফুলে ফেঁপে উঠছিল। বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করে দেশের বাইরে বেগমপাড়া প্রতিষ্ঠা করছিল। র‌্যাবসহ নানা বাহিনী দিয়ে গুম-খুনের হাজার হাজার অভিযোগ ছিল। ফলে জনগণ প্রচন্ড রকম ক্ষুব্ধ ছিল। যেই মুহূর্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দৃশ্যপট থেকে উধাও হয়ে গেল সে সময় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেল।

বাংলাদেশ পৃথিবীর অন্যতম জনঘনত্বের দেশ। ফলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভেঙে পড়লে এ দেশে যে অরাজকতা হয় তার ফল অকল্পনীয় হতে পারে। হাসিনার পতনে দেশবাসী উল্লাস করলেও অরাজকতার ভয়াবহ শঙ্কা নেমে আসে। ইতিমধ্যেই খবর পাওয়া যায় উন্মত্ত জনতা সব ভেঙেচুরে দিচ্ছে। লুটপাট করছে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আড়ালে নিজেদের অপকর্ম ঢাকায় আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধ নিয়েই লোকজনের বিবমিষা তৈরি হয়। ফলে, বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যগুলো সেই উগড়ে ওঠা রাগের শিকার হয়।

সন্দেহাতীতভাবে, উন্মত্ত জনতার ভিড়ে সুযোগসন্ধানীরা ছিল। তারা লুটপাট ও ধ্বংস করেছে। কেউ কেউ ব্যক্তিগত হিংসার সুযোগ নিয়েছে। কেউ কেউ হয়তো সাম্প্রদায়িক বিষদাঁত মেলে ধরেছে। তবে এই অবস্থা একেবারেই অপত্যাশিত ছিল না। বিশেষত ক্ষমতার পালাবদল অকস্মাৎ হওয়ায় আশঙ্কা অনেক বেশি ছিল।

যার যায় সেই বোঝে। মানুষ তো সংখ্যা না। আমরা হয়তো পরিসংখ্যান বা বিশ্লেষণের কারণে সংখ্যায় পরিমাপ করি। বলে বসি যে, কোটিতে একজন মারা গেছে। কিন্তু যার গেছে, তার কাছে সেই গোটা দুনিয়া। যে প্রিয় মানুষকে হারিয়ে অসহায় হলো, ধনসম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হলো তার তো গোটা দুনিয়াই গেল। তবে সেই অবস্থা মাথায় রেখেও বলতে হয়, প্রায় সপ্তাহখানেক দেশে কোনোরকম নিয়মিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সরকার না থাকার পরও খুন, লুটপাট অকল্পনীয় মাত্রা ছাড়ায়নি।

এগুলোর বড় অংশই আবার সদ্য ক্ষমতাহারা দলের নেতাকর্মীদের ওপর। খবরে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং কিছু ক্ষেত্রে সংখ্যালঘুরাই অরাজকতায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতির স্বীকার হন। এই দুঃখজনক ঘটনাকে আমলে নিয়েই বলতে হচ্ছে যে, সাধারণ মানুষ এর বাইরেই ছিলেন। শতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং বিপুল সম্পদহানী ও ভাঙচুর হলেও, বলতেই হয় যে, চরম অস্বাভাবিক অবস্থাতেও মাত্রা ছাড়ায়নি। পৃথিবীতে যদি রায়টের ইতিহাসগুলো দেখা যায়, তবে দেখা যাবে, অনেক কম জনঘনত্বের দেশেও এর চেয়ে ভয়াবহ ঘটনা ঘটে।

প্রাথমিক অরাজকতার পর, দেশে অন্তর্বর্তী সরকার প্রতিষ্ঠার পর শুরু হয় ডাকাতের হামলা। সদ্য বিদায়ী আওয়ামী লীগের কর্মী, বিরোধী দলের কর্মী এবং দেশ জুড়ে ছিনতাই রাহাজানিতে যারা লিপ্ত ছিল তারাই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে পুলিশবিহীন অবস্থায় এসব ঘটনা ঘটিয়েছে। শুরুর ধাক্কায়, অরক্ষিত, অসহায়, প্রতিবিপ্লব ও অরাজকতার শঙ্কায় থাকা নাগরিকরা আবারও প্রচন্ড উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। কিন্তু এরপরই দেখা যায় অভাবনীয় দৃশ্য। যেই ঢাকা শহরের মানুষ পাশের ফ্ল্যাটের মানুষকে চেনেন না বলে দুর্নাম আছে, তারাই একজোট হয়ে যায়।

কিন্তু আশঙ্কার গোবরে ফুটে ওঠে অনিন্দ্যসুন্দর পদ্মফুল। যেভাবে ছাত্র-জনতা কিছুদিন আগে নিরস্ত্র অবস্থায়, কেবল ঐক্যের জোরে অস্ত্রধারীদের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছিল, সেভাবে একজোট হয়ে পড়ে নাগরিকরা। সামাজিক মাধ্যমে দেখা যায়, ছেলে-বুড়ো, নারী ও বয়স্ক মানুষ পর্যন্ত প্রতিরোধের দারুণ স্পৃহায় জ্বলজ্বল করে ওঠে ঐক্যের শক্তিতে। ডাকাত দলকে ঝেটিয়ে বিদায় করা হয়। পুলিশবিহীন রাষ্ট্রে জনতা নিজেই নিজের রক্ষক হয়ে ওঠে সমষ্টির শক্তিতে।

এ যেন এক রোমান্টিক কল্পনার সমাজ, নৈরাজ্যবাদের স্বাপ্নিক ফুল। মার্ক্সিস্ট দার্শনিক আলথুসার রাষ্ট্র যে আদতে একটা নিপীড়নের যন্ত্র তা বিশ্লেষণ করে দেখান, এর আগে গ্রামসি দেখান কীভাবে আধিপত্য শাসকের জন্য সম্মতি ও ভীতি উৎপাদন করে। সেই প্রবল রাষ্ট্রযন্ত্রের অনুপস্থিতিতে জনগণ এক হয়ে ওঠে। রীতিমতো প্রশ্ন ছুড়ে যায় ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের জন্য। বার্তা দেয় হে রাষ্ট্র, তুমি নাগরিকের হও। আমরা একজোট হতে জানি।

আর তরুণরা, তাদের জীবনের সবচেয়ে দারুণ মুহূর্তে গৌরবের পারদ আরও উঠাতে থাকে। ট্রাফিকবিহীন দেশে আপামর তরুণ সমাজ রাস্তায় নেমে আসে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে। দিশাহীন দেশকে দিশা দেওয়ার বাতিঘরেরা আবারও দৃশ্যমান হয়। প্রতিবিপ্লবের শঙ্কা, ভয়াবহতম ভবিষ্যতের মধ্যেও আশার তীব্র বিন্দু জ্বলে ওঠে। তলিয়ে যাওয়ার বদলে বাংলাদেশ তার প্রাণশক্তি, তার মানুষের সামষ্টিক শক্তিতে উজ্জ্বল হয়।

এক সপ্তাহের মাথায় যখন ট্রাফিক জ্যাম বেড়ে গেল, প্রায় সব দোকানপাট খুলে গেল, বিস্মিত হয়ে ভাবছিলাম, একটা দেশে পুলিশ নেই, তবু সহনাগরিকের ওপর কতটা আস্থা থাকলে এমনটা হয়। শাহবাগের মোড়ে আমরা কয়েকজন তরুণ যখন ‘চা আর টা’ পান করলাম, চা বিক্রেতার কোনো আশঙ্কা ছিল না যে, এরা বিল না দিয়ে চলে যাবে, যারা দামি দামি দোকান খুলেছেন, তারা আস্থা রাখেন, সহনাগরিকরা লুটপাট করবে না। অল্প কিছু দুষ্ট লোককে জনতাই ঢাল হয়ে ফেরাবে। তরুণরা দিশা দেবে। অস্থির সময়ে বাংলাদেশ এক দারুণ ঐক্যের চেতনায় যেন উদ্বুদ্ধ।

আমার বন্ধু জুনায়েদের যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের সাহায্য দিয়ে শুরু করেছিলাম। দুর্যোগে তথাকথিত আধুনিকতম মানুষেরা কীভাবে আচরণ করে সেই উদাহরণ বলেছিলাম। শেষ করব আরেক বন্ধু, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী স্কলার নাজমুল আরেফিনের কথায়। এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে নাজমুল বলেন।

‘ডিয়ার স্ল্যাভো জিজেক, আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে যে আপনি বলেছিলেন : ‘আমি আমার মাকে দাসী হিসেবে বেচে দিতে রাজি আছি V for Vendetta  সিনেমার পার্ট-২ দেখার জন্য। খুব ভালো কথা যে (পার্ট ওয়ানের শেষে) জনগণ ক্ষমতা ছিনিয়ে নিল। [আমার জানতে ইচ্ছে করে] ঠিক তার পরের দিন তারা কী করল? কীভাবে ক্ষমতাকে নতুন করে সাজাল?’

আশা করি আপনি বাংলাদেশের ওপর চোখ রাখছেন। V for Vendetta-part 2  লাইভ টেলিকাস্ট চলছে এখন বাংলাদেশ থেকে। প্রতিদিন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সিনেমার প্রোটাগনিস্ট ছাত্র-জনতার সামনে। রিলে রিলে দেশি-বিদেশি প্রতিবিপ্লব। প্রতি রাতে ক্লাইম্যাক্স। সেগুলো ঠেকাতে রিয়েল সাররিয়েল পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে একটার পর একটা। কিন্তু ছাত্র-জনতা হারেনি। দেশ বিনির্মাণের কাজটা করে যাচ্ছে।

উফ! জিজেক, আপনি দেখছেন কী! একটা পুলিশি রাষ্ট্র থেকে পুলিশহীন রাষ্ট্রে এই ছাত্র-জনতা দেশটাকে আগলে রাখার কীভাবে প্রাণপণে চেষ্টা করে যাচ্ছে? ক্ষমতাকে নতুন করে সাজাতে গিয়ে একটু ভুলভ্রান্তি হলেই ফেসবুক বুদ্ধিজীবীরা নতুন বাকস্বাধীনতা ফিরে পেয়ে তাদেরও গালি দিচ্ছে। মানুষ কিবোর্ডে ব্যাকস্পেস না দিয়ে সমালোচনা করছে। প্রশংসা করছে। পুরো দেশের মানুষ ১৫ বছরের রিপ্রেসড করে রাখা হাজার হাজার ডিজায়ার ১৫ ঘণ্টার মধ্যে তাদের ওপর চাপিয়ে দিচ্ছে বাস্তবায়নের জন্য। কিন্তু ছাত্র-জনতা এখনো ইস্পাত দৃঢ়তা নিয়ে বাংলাদেশকে আগলে রেখেছে ক্ষমতাকে নতুন করে সাজাতে।

প্রিয় জিজেক, আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন? এই ‘পোস্ট-ট্রুথ’ দুনিয়ায় বিপ্লবের আগে এবং পরের দিন থেকে বাংলাদেশের ছাত্র-জনতা কী নিরলসভাবে বুলেটের পর এখন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক গুজবকে মোকাবিলা করে যাচ্ছে?

গত কয়েক দিনের বাংলাদেশে এমন অবস্থা যে ‘Everybody is special. Everybody. Everybody is a hero, a lover, a fool, a villain. Everybody. Everybody has their story to tell.’

আপনি মিস কইরেন না কিন্তু! দেখতে থাকুন। গল্পগুলো থেকে চোখ সরাইয়েন না। কারণ দুনিয়ার কোনো সিনেম্যাটিক স্ক্রিনপ্লে ইধহমষধফবংয ২.০-এর এই মহাকাব্যিক রূপকথাকে ধারণ করতে পারবে না।

বাংলাদেশ এ মুহূর্তে যেন আশঙ্কার গোবরে এক অনিন্দ্যসুন্দর পদ্মফুল।

লেখক: সাংবাদিক ও অনুবাদক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত