নিষিদ্ধ হোক দলীয় ছাত্ররাজনীতি

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৪, ১২:৪১ এএম

আজকের বাংলাদেশ নামক এই ভূখণ্ডে ছাত্ররাজনীতির ইতিহাস ও ঐতিহ্য অত্যন্ত উজ্জ্বল। আমাদের সব অর্জনের পেছনে ছাত্ররাজনীতির ছিল গৌরবজনক ভূমিকা। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬২ সালের শিক্ষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফার আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ১৯৭১-এর মহান স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ১৯৯০ সালে স্বৈরাচারবিরোধী গণ-অভ্যুত্থানে রাজনৈতিক ছাত্ররাই ছিল মূল শক্তি। ছাত্র অবস্থায় এরশাদবিরোধী আন্দোলনে অংশ নিয়ে অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হয়েছিলাম। বরণ করতে হয়েছিল কারাভোগ। গৌরবমণ্ডিত ইতিহাস আর ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা ও অবদানের কথা মাথায় রেখেই ছাত্ররাজনীতির রাশ টেনে ধরার পক্ষে অবস্থান নিয়েছি।

নব্বইয়ের স্বৈরশাসনবিরোধী আন্দোলনে বিজয়ের পর যে প্রত্যাশা ও স্বপ্ন বুকে লালন করেছিলাম, তা বছর না ঘুরতেই ভেঙে চুরমার হয়েছিল। ছাত্ররাজনীতিতে কলুষতা ঢুকে যায় তখন থেকেই। এই কদর্যতা বাড়তে বাড়তে আজ চব্বিশে এসে বর্তমানে কুৎসিত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে। মূলত ১৯৯১ সালের পর থেকেই ছাত্ররাজনীতি মূল সংগঠনগুলোর লেজুড়বৃত্তিতে মনোযোগী হয়। যে দল ক্ষমতায় এলো তারা নিজের ছাত্র সংগঠন ছাড়া আর কোনো ছাত্র সংগঠনকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কার্যক্রম চালাতে প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করল। শুধু তাই নয়, এর পর থেকে যত সরকার ক্ষমতায় এসেছে তাদের কেউই গঠনমূলক ছাত্ররাজনীতি ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের দিকে যায়নি। অথচ ছাত্র সংসদ নির্বাচনই ছাত্র রাজনীতির চালিকাশক্তি। ভবিষ্যৎ নেতা তৈরির পাঠশালা। ক্ষমতার পালাবদলে ২০০৯ সাল থেকে জগদ্দল পাথরের মতো আওয়ামী লীগ দেশের ঘাড়ে জোর করে চেপে বসল। এদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে একক কর্র্তৃত্ববাদিতা প্রতিষ্ঠা করল। বিরোধী রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোকে দেশের সবগুলো ক্যাম্পাস থেকে বিতাড়ন করল। এই আগস্টের ৫ তারিখ পর্যন্ত অর্থাৎ ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী হাসিনা সরকারের পতনের দিন পর্যন্ত ছাত্রলীগের হিংস্র ও দানবীয় মূর্তি দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে।

সুস্থ ছাত্ররাজনীতি মানে সব সংগঠনের সমান উপস্থিতি ও কর্মসূচি পালনের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। ছাত্রদের অধিকার ও দাবি নিয়ে মাঠে থাকা, আলোচনা করা। ছাত্রদের সমস্যা, শিক্ষাঙ্গনের পরিবেশ উন্নয়ন ও অন্যবিধ কমন চাহিদা নিয়ে আন্তঃদলীয় আলোচনা করে সবার মতামতকে একটি কণ্ঠে উচ্চকিত করাই হওয়া উচিত ছাত্ররাজনীতির মূল উদ্দেশ্য। এতে দাবিও আদায় হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও বিঘ্ন ঘটে না সদ্ভাব, সম্প্রীতি ও হারমোনি। বায়ান্ন, একাত্তর ও নব্বইতে এই হারমোনি ছিল বলেই ছাত্ররা বিজয়ী হয়েছিল। গত ৩৪ বছর এই হারমোনির দেখা মেলেনি। ছাত্ররাজনীতি কি শুধু ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের একক কর্র্তৃত্বের জায়গা? বিশেষ করে গত পনেরো বছরের ছাত্ররাজনীতির দিকে চোখ ফেরালে এর বাইরে অন্যকিছু ভাবার অবকাশ নেই। আমরা দেখেছি, দলীয় লেজুড়বৃত্তির কারণে কীভাবে শিক্ষার্থীরা অধঃপতনের শেষ সীমায় পৌঁছে গেল।

আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক গত পনেরো বছরে বহুবার বলেছেন, বিরোধীদের দমাতে ছাত্রলীগই যথেষ্ট। তিনি ছাত্রলীগকে সরাসরি নির্দেশ দিয়েছেন যাতে কোনো বিরোধী পক্ষই মাঠে নামতে না পারে। মূল দলের এই প্রশ্রয়ে দানব হয়ে উঠেছিল ছাত্রলীগ। শিক্ষাঙ্গনের বাইরে এসে এরা পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো। অস্ত্রবাজি, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, তদবির, হত্যা, খুন, গুম, দখল, অত্যাচার, নির্যাতন হেন কাজ নেই যা এই সংগঠন করেনি। পাতি নেতাও কোটি কোটি টাকার ধনসম্পদের মালিক বনে গেছে। নতুন প্রজন্ম ছাত্ররাজনীতি বলতে ছাত্রলীগের দস্যুবৃত্তি ছাড়া আর কিছু জানেনি। এর বাইরে আর কিছু তাদের অভিজ্ঞতায় নেই। কথাটা অবশ্য সর্বাংশে ঠিক না। ভিন্ন রকমের কিছু ছাত্র আন্দোলন এর মধ্যেই দানা বেঁধে উঠেছিল। নতুন প্রজন্ম সেই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছিল। যেমন কোটা সংস্কার আন্দোলন, নিরাপদ সড়ক আন্দোলন। কোনো দলের লেজুড়বৃত্তি ছিল না, ছিল না অভিভাবকত্ব। ছাত্রলীগ বাদে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব ছাত্র সেই আন্দোলনে মাঠে নেমেছিল। এটাই ছাত্ররাজনীতি। ছাত্ররা নিজেদের ন্যায্যতা ও ন্যায়ের জন্য আন্দোলন করবে। এমন কর্মসূচি নিয়ে লড়াই করবে যা সব শিক্ষার্থীর দাবি ও প্রত্যাশা। দুঃখজনকভাবে ছাত্রসমাজের সেই ন্যায্য দাবির প্রতিও একাত্ম হয়নি ছাত্রলীগ বরং সরকারের নির্দেশ ও পৃষ্ঠপোষকতায় সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর বর্বরোচিতভাবে হামলে পড়েছিল। প্রকৃত ছাত্ররাজনীতির চর্চা করলে ছাত্রলীগ বরং ছাত্রদের পক্ষেই অবস্থান নিত।

কোটা নিয়ে সরকারের নতুন ষড়যন্ত্র ঠেকাতে গত ১ জুলাই সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিয়ে গড়ে ওঠে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন। এর পরের ইতিহাস আমাদের জানা। কীভাবে একটি সর্বজনীন আন্দোলন স্ফুলিঙ্গের মতো জ্বলে উঠল, তার সাক্ষী হলো দেশবাসী। চাকরিতে বৈষম্য না চাওয়া এই শিক্ষার্থীদের রাজাকারের নাতি-পুতি বলে দমনের নির্দেশ দিলেন শেখ হাসিনা। ওবায়দুল কাদেরসহ অন্য নেতারা ছাত্রলীগকে মাঠে নেমে আন্দোলনকারীদের দমন-পীড়নের নির্দেশ দিলেন। নির্দেশ মোতাবেক পুলিশের সঙ্গে জোট বেঁধে সশস্ত্র ছাত্রলীগ সারা দেশে ম্যাসাকার করল। শত শত শিক্ষার্থী শহীদ হলেন। পিছপা না হয়ে শোক থেকে শক্তি জোগাল শিক্ষার্থীরা। রক্ত ছুঁয়ে শপথ নিল। অবরোধ থেকে অসহযোগ। তারপর কমপ্লিট শাটডাউন। সরকার কারফিউ দিল। হত্যাযজ্ঞে মেতে উঠল। এবার ঘোষণা এলো সরকার পতনের এক দফার। ৩ আগস্টের ঘটনা। কারফিউ ভেঙে ছাত্রজনতা রাস্তায় নেমে এলো। এই বিপ্লব রুখে দেওয়ার ক্ষমতা তখন সাধ্যের বাইরে। ৫ আগস্ট এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষণ। অবসান হলো অপশাসনের। গণরোষে ভারতে পালিয়ে গেলেন হাসিনা। বাংলাদেশ স্বাধীন হলো দ্বিতীয়বারের মতো।

জানা ঘটনাগুলো বলার কারণ একটাই। দলের লেজুড়বৃত্তি না করে ছাত্ররা যখন নিজেদের স্বার্থ, উন্নয়ন ও ন্যায্য দাবি নিয়ে মাঠে নামে তখন সেসব দাবি সাধারণ জনগোষ্ঠীরও সমর্থন পায় এবং সফলতাও আসে। এটাই ছাত্ররাজনীতি। এই যে এই অকল্পনীয় উত্থান, এই ব্যাপক বিস্তৃত বিপ্লব, এই দুনিয়া কাঁপানো জুলাই তা অবশ্য ছাত্ররাজনীতির চেয়েও বড় কিছু। এই ধারা স্থায়ী হয় না। অব্যাহতও থাকে না। বিপ্লবে সংগঠিত পক্ষগুলো বিজয় শেষে যার যার ঘরে ফিরে যায়। বিপ্লব ও জাগরণের চেতনা সঙ্গে নিয়ে যার যার নিজস্ব কর্মসূচিতে ফিরে যায়। এটাই অভ্যুত্থানের চরিত্র। হয়তো কোনো একদিন নতুন কোনো দানব হটাতে দলমত নির্বিশেষে আবারও ছাত্রজনতা এক হয়ে মাঠে নামবে।

স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলে যাবে সহসাই। হল-হোস্টেলগুলোও খুলবে। প্রথাগত ছাত্ররাজনীতি বহাল থাকলে আবারও দখলদারি, আধিপত্যের লড়াই ও হানাহানি শুরু হবে। যে দৃষ্টান্ত ছাত্রলীগ রেখে গেছে তা অনুসরণ করবে অন্য কোনো দলীয় ছাত্র সংগঠন। আমরা আর এই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে চাই না। শিক্ষাঙ্গনে ছাত্ররাজনীতি চর্চার নতুন রূপরেখা ঘোষণা করতে হবে যেখানে রাজনীতি হবে ছাত্রদের নিজস্ব মতাদর্শভিত্তিক, অবস্থান হবে ন্যায়পরায়ণতায়। নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচনের আয়োজন করতে হবে। ভবিষ্যতের লিডারশিপ এভাবেই গড়ে উঠবে। নিষিদ্ধের কথা যদি ওঠে নিষিদ্ধ করতে হবে দলীয় লেজুড়বৃত্তিক রাজনীতি, যেন ছাত্রসমাজ মূল দলের অনৈতিক ও গণস্বার্থবিরোধী নির্দেশ মানতে বাধ্য না হয়। তারা যেন দলের ডাণ্ডাবাহিনী হিসেবে ব্যবহৃত না হয়। আর ছাত্ররাজনীতি পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার বিপদ অনেক। এটি মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় সরাসরি হস্তক্ষেপ। সবচেয়ে বড় কথা, ছাত্ররা একতাবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ না করলে প্রশাসন ও কর্র্তৃপক্ষ দানব হয়ে উঠবে। সরকার শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের ওপর নিজেদের সুবিধামতো যা ইচ্ছা তা চাপিয়ে দেবে। সুতরাং রাজনীতি বন্ধ করা যাবে না। রাজনীতি থাকবে ছকে বাঁধা। দলীয় আজ্ঞাবাহী নয়। সেটা কেউ করলে শিক্ষাঙ্গনের বাইরে গিয়ে করুক।

লেখক: কবি ও সাংবাদিক। স্টকহোম, সুইডেন

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত