একটি পুলিশ ক্লিয়ারেন্স আনতে ঘুরতে হয়েছে তিন থানায়। এই থানা থেকে বলে ওই থানায় যান। সেই থানায় গেলে বলে ওই থানায় যান। পরে শাহবাগ থানায় একটি জিডি করে ছয় হাজার টাকা দিয়ে লাশের সুরতহাল রিপোর্ট করানো হয়। পরে সেই লাশ বাড়ি পর্যন্ত আনতে পদে পদে গুনতে হয়েছে ২৫ হাজার টাকা। এমনটাই বলছিলেন কোটা আন্দোলনের সময় গুলিতে নিহত আবদুল গণির ভাই আবদুর রাজ্জাক।
গত ১৯ জুলাই কোটা আন্দোলন ঘিরে সংঘর্ষের মধ্যে ঢাকার শাহজাদপুর বাঁশখালী এলাকায় মাথায় গুলি লেগে নিহত হন আবদুল গণি (৪৫)। তার গ্রামের বাড়ি রাজবাড়ী সদরের খানখানাপুর ইউনিয়নের নতুন বাজার এলাকার। তিনি ঢাকার একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করতেন। ২১ জুলাই ময়নাতদন্তের পর রাত সাড়ে ৮টার দিকে গ্রামের একটি কবরস্থানে আবদুল গণির দাফন সম্পন্ন হয়।
আবদুর রাজ্জাক বলেন, ‘গত ১৯ জুলাই সকালে আবদুল গণির ফোন থেকে একজন ফোন করে বলেন, এই ফোনের মালিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। তার লাশ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে আছে। এ খবর পাওয়ার পর আমি আর আবদুল গণির ছেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে গিয়ে লাশ শনাক্ত করি। পরে হাসপাতাল থেকে পুলিশ ক্লিয়ারেন্স আনতে বলে। আবদুল গণি মারা যান ঢাকার বাঁশখালী এলাকায়। সেটা গুলশান, বাড্ডা ও ভাটারা থানার সীমানা। প্রথমে বাড্ডা থানায় গেলে বলে এটা এ থানার অধীনে নয়। তারপর যাই ভাটারা থানায়। সেখানেও একই কথা বলে। এরপর যাই গুলশান থানায়। এভাবে ১৯ থেকে ২১ জুলাই পর্যন্ত বাড্ডা থানায় পাঁচবার, গুলশান থানায় তিনবার ও ভাটারা থানায় ছয়বার যাই। তার পরও কোনো থানা ক্লিয়ারেন্স দেয়নি।’
তিনি আরও বলেন, ‘শাহবাগ থানায় রাজবাড়ীর একজন পুলিশ ছিল। তার সাহায্যে শাহবাগ থানায় একটি জিডি করার পর পুলিশ লাশের সুরতহাল করে। এজন্য সেই পুলিশকে দিতে হয় ছয় হাজার টাকা। আমরা বলেছিলাম লাশ ফরেনসিক ওয়ার্ডের ফ্রিজে রাখার জন্য। কিন্তু হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাখে বড় ফ্রিজে। ২১ তারিখ আমাদের আবার লাশ খুঁজতে তিনটি মর্গে ঘুরতে হয়। টাকা না দিলে লাশ দেখায় না। সেখানে তিন মর্গের তিনজনকে ২ হাজার ১০০ টাকা দিতে হয়। এরপর লাশ গোসল করানো, অ্যাম্বুলেন্স ও কফিন মিলে আরও ২০ হাজার টাকা দিতে হয়।’
গত সোমবার আবদুল গণির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, বাড়িতে একটি নতুন ভবন ওঠানো হচ্ছে। ভবনের ছাদের কাজ শেষ হয়েছে। ভবনের সামনে একটি ছোট টিনের ছাপড়া করে সেখানে থাকছে আবদুল গণির পরিবার।
আবদুল গণির স্ত্রী লাকি আক্তার বলেন, ‘আমার পাঁচ বছরের মেয়ে সব সময় বলে বাবাকে এনে দাও। আমার ছেলেটি একটু বড় হয়েছে। ওদের বাবার স্বপ্ন ছিল সন্তানদের লেখাপড়া করিয়ে প্রতিষ্ঠিত করবে। এখন আমার সব শেষ হয়ে গেছে। আমার বাবার দেওয়া জমিতে একটি ঘরের কাজ ধরেছিলাম। প্রায় তিন লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ঘরের কাজ করেছি।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমার স্বামী ছিল সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী। আমার বাবাও নেই। আমি প্রায় তিন লাখ টাকা ঋণে আছি। আমি দুই বাচ্চা নিয়ে কীভাবে যে চলব, তা আমি নিজেই বলতে পারব না। এখন পর্যন্ত সরকারের পক্ষ থেকে কেউ খোঁজ নেয়নি। আমার স্বামী হত্যার বিচার চাই।’ আবদুল গণির কলেজপড়ুয়া ছেলে আলামিন বলেন, ‘আমার বাবা সংসারের ব্যয়ভার বহন করতেন। এখন বাবা নেই, মা আর ছোট বোন আছে। আমি পড়ালেখা করতাম। এখন আর সেটা হবে না। সংসারের হাল আমাকেই ধরতে হবে। এখন আমার একটি কাজের দরকার। দেশে নতুন সরকার এসেছে। যদি আমার একটি কাজের ব্যবস্থা করে দিত। তাহলে পরিবার নিয়ে বেঁচে যেতাম।’
