১৯৯৮ সাল। পাকিস্তানের প্রথম পরমাণু অস্ত্র অভিলাষ পূরণের বছর। একদিকে বিশ্বে পরমাণু অস্ত্রধারী হওয়া হাতেগোনা কয়েকটি দেশের একটি হওয়ার গৌরব, অন্যদিকে পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশী ভারতকে মোক্ষম জবাব দেওয়ার উপায়; এমন দ্বৈত উত্তেজনায় পাকিস্তানের ধর্মাশ্রয়ী জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগের তখন পোয়াবারো। পাকিস্তান সে সময় তার প্রথম পরমাণু পরীক্ষার জায়গা নির্বাচন করে দেশের দরিদ্রতম প্রদেশ বালুচিস্তানের পাহাড়ি জনপদ অধ্যুষিত এলাকা চাগাই। সেখানে ইসলামাবাদের পরমাণু অস্ত্রের সফল পরীক্ষার মধ্য দিয়ে ভারত-পাকিস্তানের সামরিক দ্বৈরথ যেন সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দেওয়ার মতো হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু এরপর চাগাই এলাকার কী দশা হয়েছিল, তা কি কেউ খোঁজ নিয়েছিল? উত্তর হলো, ‘না’।
২৬ বছর হতে চলল, চাগাইয়ের কপালে কী হয়েছে, তা পাকিস্তান রাষ্ট্র ফিরে তাকিয়েও দেখেনি। সেখানে শত শত শিশুর শারীরিক অক্ষমতা নিয়ে জন্মলাভ, অসংক্রামক রোগ নিয়ে পৃথিবীতে আসা এবং নানা বিরল প্রজাতির ক্যানসারের প্রাদুর্ভাব যেন স্বাভাবিক ব্যাপার। মোটামুটিভাবে চাগাইয়ে জনজীবন এই বাস্তবতা মেনে নিতে বাধ্য হয়েছে। চাগাই পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের নিজস্ব জাতিবাদী অভিলাষ চরিতার্থ করার অভিশাপ বহন করে চলেছে। মানবসৃষ্ট এই সংকটের খবর তুলে আনা বালুচিস্তান কিংবা পাকিস্তানের কোনো সাংবাদিকের পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ সেখানে সাংবাদিকদের গুম-খুন কার্যত স্বাভাবিক ঘটনা। চাগাই থেকে নিপীড়নের গল্পটি যখন বালুচিস্তান জুড়ে বিস্তৃত হয়, তখন মানুষের গুম, বিচার-বহির্ভূত হত্যা ও ধর্ষণ যেন প্রাত্যহিক ঘটনা। বালুচিস্তানে মানবাধিকার চরমভাবে বিপর্যস্ত। সেখানে মুখ ফুটে কিছু বলা মানে নিজের জীবনকে সেনাদের হাতে সঁপে দেওয়ার মতো।
টিকে থাকতে বালুচিস্তান প্রতি মুহূর্তে লড়াই করছে। পাকিস্তানি রাষ্ট্রযন্ত্রের সামরিক-বেসামরিক মৈত্রীর বিরুদ্ধে তাদের বেঁচে থাকার প্রধান উপায় লড়াই-সংগ্রাম। বালুচিস্তান প্রদেশ সম্প্রতি আরও একবার বড় বিক্ষোভে ফুঁসে উঠেছে। সেখানে চীনা উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে ক্ষোভ এই প্রতিবাদের অন্যতম বড় জায়গা। এই জাগরণের নেতৃত্বে রয়েছেন অঞ্চলটির সংখ্যাগরিষ্ঠ বালুচ জনগোষ্ঠীর নারীরা। বালুচিস্তান জুড়ে অব্যাহত নিপীড়নের প্রতিবাদে তারা আরও একবার রাস্তায় নেমে এসেছেন। বালুচরা পাকিস্তানি শাসকদের বিরুদ্ধে যে অব্যাহত গুম, খুন, নিপীড়নের অভিযোগ করে আসছিলেন; প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফের বর্তমান শাসনে তার বিন্দুমাত্র বদল আসেনি। পাকিস্তানের রাষ্ট্রকাঠামোয় সামরিক-বেসামরিক যেই থাকুক না কেন, বালুচদের দুঃখগাথা ফুরায়নি। বালুচিস্তানকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল থেকে দুর্বলতর করে দিচ্ছেন ইসলামাবাদের শাসকরা, বালুচিস্তানের মানুষ অন্তত তাই মনে করেন। অথচ পাকিস্তানের সর্ববৃহৎ প্রদেশ হচ্ছে বালুচিস্তান। একইসঙ্গে দেশটির অন্য প্রদেশগুলোর চেয়ে খনিজ সম্পদে এগিয়ে তারা। বলাবাহুল্য, দরিদ্র প্রদেশের তালিকায় বালুচিস্তানই প্রথম নাম। এবারের বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান সুর হচ্ছে, বালুচদের সম্পদ লুণ্ঠন করা চলবে না।
দেশের রাজধানী ইসলামাবাদকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা বালুচিস্তানের স্পর্শকাতরতার যুক্তি তুলে ধরে প্রায়শই সামরিক বাহিনীকে সেখানে নিরাপত্তা সামলানোর ভার দিয়ে এসেছে। বালুচদের বিক্ষোভ নানা সময়ই দেখা গেছে; তবে এবার বিক্ষোভের আকার ও তীব্রতা অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় ব্যাপক। আর বিক্ষোভের তীর এবার শুধু ইসলামাবাদ ও পাঞ্জাবের ধনিক শ্রেণির শাসনব্যবস্থা নয়, বরং চীনও এই ক্ষোভের আগুনে পুড়ছে।
চীনের অর্থায়নে নির্মিত গোয়াদর বন্দরটি ঘিরে বেইজিং-কেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যমে গত জুন মাসে বলা হয়, বন্দরটি পাকিস্তানের কাছে হস্তান্তরের জন্য এই বছরই প্রস্তুত হয়ে যাবে। উল্লেখ্য, এটি বিশ্বব্যাপী অবকাঠামো খাতে চীনা বিনিয়োগ প্রকল্প ‘বেল্ট অ্যান্ড ইনিশিয়েটিভস (বিআরআই)’-এর অন্তর্ভুক্ত। পাকিস্তান, আফগানিস্তান, ইরান ও চীনকে যুক্ত করে বড় আঞ্চলিক সংযোগ তৈরি করতে বেইজিং এই বন্দরের দিকে অনেক আগেই নজর দিয়েছিল। এবার তা পুরোপুরি বাস্তবায়নের শেষ ধাপে।
বালুচরা এই তথাকথিত উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে নিজেদের অসন্তোষ জানানোর পাশাপাশি গত কয়েক দশকে বহুবার আওয়াজ উঠিয়েছেন এই মর্মে, ইসলামাবাদ-কেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থার কর্তারা বালুচদের প্রাকৃতিক সম্পদ লুণ্ঠন করছেন। বালুচদের অভিযোগ, ইসলামাবাদের শাসকদের সঙ্গে বেইজিংয়ের শাসকরা হাত মিলিয়ে বালুচিস্তানকে আরও লুণ্ঠন করছেন। বিশেষত, গত কয়েক বছর ধরে বালুচিস্তানের উপকূলীয় এলাকার মৎস্যজীবীরা সমুদ্রে যেতে বাধাপ্রাপ্ত হলে, সেখানে বেশ কয়েকটি আন্দোলন হয়েছে। চীনাদের খবরদারির বিরুদ্ধে মানুষের এই প্রতিবাদ এখন চরমে। আর এই ক্ষোভের লাগাম টানতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী মানুষকে চিরাচরিত কায়দায় নির্যাতন করছে।
বালুচিস্তান জুড়ে মানুষের ক্ষোভ পুরনো। পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে তারা দীর্ঘকাল ধরে ফুঁসছেন। বিশেষ করে বালুচ জাতীয়তাবাদী জাগরণকে রুখতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী সেখানে হেন কোনো অপকর্ম নেই যা করেনি। খুন, ধর্ষণ থেকে শুরু করে নানা মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনায় সেনাবাহিনী অভিযুক্ত। সাবেক সেনাশাসক পারভেজ মুশাররফ বালুচিস্তানের জাতীয়তাবাদী নেতাদের ওপর সম্ভবত সবচেয়ে বেশি নৃশংস নিপীড়ন চালান। পারভেজ মুশাররফের শাসনামলে এক সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ উঠলে তা রীতিমতো ধামাচাপা দেয় সরকার। প্রদেশটির মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও মানবাধিকারকে বারবার পদদলিত করা হয়েছে নানা প্রক্রিয়ায়। পাকিস্তানের ভেতরে ও বাইরে এ নিয়ে নানা সময় আওয়াজ উঠলেও পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী তাতে পিছপা হয়নি। বিশেষ করে পাকিস্তানের যেসব রাজনৈতিক গোষ্ঠী সামরিক বাহিনীর কর্র্তৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করতে গিয়েছে তারা বিচার-বহির্ভূত হত্যা ও গুমের শিকার হয়েছে। বালুচিস্তানের নানা প্রান্ত থেকে জেগে ওঠা সশস্ত্র-অসশস্ত্র গোষ্ঠীকে নির্বিচারে দমন করে চলেছে পাাকিস্তানি সামরিক প্রশাসন। সেখানকার বেশ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতাকে গত দুই দশকে হয় হত্যা, নয়তো গুম করা হয়েছে। এসব ঘটনায় অভিযোগের তীর সেনাবাহিনী দিকে। সেখানে বেসামরিক প্রশাসনের বলার মতো জায়গা নেই; যেমনটি গোটা পাকিস্তানের ক্ষেত্রেই সত্য। বালুচ সংবাদমাধ্যমের ওপরও জারি রয়েছে সীমাহীন নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপ।
এ সবের মধ্যেও বালুচরা কথা বলা থামাননি। বিশেষত তাদের নারীরা এই প্রতিবাদের প্রধান শক্তি। যেমন গত কয়েক বছরে বালুচিস্তানের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আর্থ-সামাজিক অধিকার নিয়ে দাঁড়ানো বালুচ ইয়াকজেহতি কমিটি (বিওয়াইসি) বারবার অস্তিত্বের জানান দিতে পথে নেমেছে। এবারও গোটা বালুচিস্তান জুড়ে বিক্ষোভ করছেন তারা। এবারের বিক্ষোভে নারীদের উপস্থিতি আরও ব্যাপক এবং তারাই এর নেতৃত্বে। এসব নারী তাদের ভাই, স্বামী, চাচা কিংবা বাবার সন্ধান চান; যাদের অনেকের হদিস নেই। বিক্ষোভের নেত্রী মাহরাং বালুচের ভাষায়, ‘‘পাকিস্তান সরকার যেভাবে দিনের পর দিন বিচার-বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটাচ্ছে, তারা সেই ‘বালুচ গণহত্যার’ বিচারের দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন। তারা গুমের মতো অপরাধের অবসান চান।” তিনি অভিযোগ করেন, বালুচিস্তানে বিনিয়োগকারী হিসেবে জাহির করা চীন এই গণহত্যায় সরাসরি জড়িত। চীনা প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মদদে করান উপকূল এবং বিশাল এলাকা জুড়ে মানুষকে গুমের ঘটনা ঘটছে এবং সেখানে অধিবাসীদের বাস্তুচ্যুতিতে বাধ্য করা হচ্ছে। বেইজিং তাদের সম্পদ লুট করছে বলেও অভিযোগ তাদের।
বালুচদের এই প্রতিবাদ-বিক্ষোভকে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী চিরাচরিত কায়দায় অবজ্ঞা করছে। দেশের ক্ষমতাকাঠামোয় প্রভাবশালী ‘এস্টাবলিশমেন্ট’ বালুচিস্তানের বিক্ষোভকারীদের সংগঠন ‘বিওয়াইসি’-কে সন্ত্রাসীদের সহযোগী আখ্যা দিচ্ছে। এমনকি সেনাবাহিনী এই বিক্ষোভে বিদেশি শক্তির মদদ রয়েছে বলে দাবি করছে। অবশ্য, এই আচরণ নতুন কিছু নয়। প্রদেশটিতে সাধারণ রাজনৈতিক দাবি-দাওয়ার কথা উঠলেও তাকে নানাভাবে কালিমা লেপন করেছেন পাকিস্তানি শাসকরা। বরাবরের মতো এই ধরনের বিক্ষোভকে জাতীয়তাবাদী সংকীর্ণ স্বার্থপুষ্ট ‘বিচ্ছিন্নতাবাদ’ হিসেবে দেখেছেন তারা।
বালুচিস্তানবাসী তাদের অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগকে নিয়ে একদিনে রুষ্ট হননি। গত দুই দশকের মতো সময় ধরে গোয়াদর ও এর আশপাশের এলাকা নিয়ে কর্মযজ্ঞ চলছে। কিন্তু সেখানে প্রকল্পের নামে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনধারাকে ব্যাহত করা হচ্ছে। সেনাচৌকি বসিয়ে নিরাপত্তার নাম করে তল্লাশি ও হয়রানি থেমে নেই। কিন্তু এসব আপত্তি ও অবিশ্বাসকে তোয়াক্কা না করে পাকিস্তান বালুচিস্তানকে শুষে নিতে তৎপর। তারা জোর করে হলেও উন্নয়নের জোয়ারে ভাসাবে বালুচদের।
পাকিস্তান হয়ে তার সংযুক্তি মধ্য ও দক্ষিণ এশিয়া পর্যন্ত প্রশস্ত করতে চীন ২০১৫ সালের দিকে ‘চীন পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডর (সিপিইসি)’ প্রকল্প হাতে নেয়। মূলত চীনের পশ্চিমাঞ্চলীয় জিনজিয়াংকে পাকিস্তানের সমুদ্রভাগের সঙ্গে সংযুক্ত করতেই বেইজিং এই উদ্যোগে আগ্রহী হয়। এর মধ্য দিয়ে চীনের বাণিজ্যিক পথের দৈর্ঘ্যও কমে আসে। কারণ এই যোগাযোগব্যবস্থার মধ্য দিয়ে দেশটিকে আর ভারত ও প্রশান্ত মহাসাগর যুক্তকারী মালাক্কা প্রণালি অতিক্রম করতে হবে না। পাকিস্তানও দুই হাজার কিলোমিটারের মতো সংযোগপথ পাচ্ছে, যার পুরোটাই চীনা বিনিয়োগে। পাকিস্তান ও চীনের যাবতীয় এসব কর্মকাণ্ডের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দু এক সময়ের ছোট্ট মৎস্যনগরী গোয়াদর। জায়গাটি হুরমুজ প্রণালী (উপসাগরীয় অঞ্চলের তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ) থেকেও কাছে; যার কারণে ইরানি সীমান্তও অদূরে নয়। ২০০৭ সালে গোয়াদরের গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণের কাজ শেষ হলে ২০১৩ সাল থেকে এটি সিপিইসির কর্মযজ্ঞের কেন্দ্র। মোটা দাগে ইসলামাবাদ ও বেইজিং প্রশাসন গোয়াদরকে ব্যস্ততম বন্দরে রূপান্তরিত করতে কাজ করছে।
লেখক: অনুবাদক ও লেখক
