প্রায় প্রতি বছরই কোনো না কোনো দুর্যোগ এ দেশের মানুষের ওপর দানবের মতো আঘাত করে। অর্থনৈতিক, সামাজিকভাবে বিপদাপন্ন বেশিরভাগ মানুষকে প্রতিনিয়ত দুর্বিষহ দারিদ্র্যের পাশাপাশি ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগকে মোকাবিলা করে বাঁচতে হয়। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানামুখী মডিউল/ম্যানুয়াল থাকলেও দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ব্যবস্থাপনা নিয়ে পূর্ণাঙ্গ মডিউল/ম্যানুয়াল এখন পর্যন্ত খুব বেশি নেই। ফলে আকস্মিক বন্যার ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন। দেশের উত্তর-পূর্ব, পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলের বন্যায় পানি বেড়েছে মধ্যাঞ্চলীয় নদীতেও। নদীর পাশাপাশি খালেও বেড়েছে পানি। তবে ঢাকা ও এর আশপাশের কোনো নদীর পানি বিপদসীমা অতিক্রমের সম্ভাবনা নেই। এমনকি বিপদসীমার কাছাকাছি যাওয়ারও সম্ভাবনা নেই।
প্রচুর বৃষ্টিপাতই হচ্ছে বন্যার অন্যতম কারণ। দেখা যায়, নিয়মিত বিরতি দিয়ে বন্যা হচ্ছে। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র বলছে, বৃষ্টি কমে আসবে এবং বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হবে। উজানে বৃষ্টি কমছে এবং সেখানে পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে। ভারতে পানি কমছে। এর প্রভাব আমাদের দেশেও পড়বে। বিশে^র অধিকাংশ দেশেই বন্যার পূর্ব সংকেত রয়েছে। যে কারণে সেই দেশগুলো, আগাম প্রতিরোধব্যবস্থা নিতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, আমাদের দেশে বন্যার আগাম সংকেত নেই কেন? এক্ষেত্রে মূল সমস্যা কি যান্ত্রিক দুর্বলতা নাকি গাফিলতি? এ বিষয়ে দেশ রূপান্তরে শনিবার একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
বাংলাদেশ বিভিন্ন সময় মারাত্মক বন্যার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে। সেই বন্যা থেকে পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রও অনেক শিক্ষা অর্জন করেছে। বর্তমানে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের আওতায় পঞ্চাশোর্ধ্ব বৃষ্টির পানি পরিমাপ কেন্দ্র এবং প্রায় ১০০ পানি পরিমাপ কেন্দ্র রয়েছে যেখানে পানির স্তর, প্রবাহ, পানির গুণাগুণ পরিমাপ করা যায়। বিশ্বের অনেক দেশ রেড ও অরেঞ্জ সিগন্যাল দিলেও আমাদের দেশে আবহাওয়া অধিদপ্তর দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাস ও বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র শুধু নদীর পানিবৃদ্ধির সিগন্যাল দিচ্ছে ওয়েবসাইট-ভিত্তিক। কিন্তু এসব সিগন্যাল কি জনমুখী? এর ফলে আমরা কি কোনো সুফল পাচ্ছি? এ বিষয়ে আবহাওয়া অধিদপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক সাদেকুল আলম জানাচ্ছেন ‘বিশ্বের অনেক দেশে এমন সিগন্যালিং সিস্টেম থাকলেও আমাদের নেই। এজন্য আরও আধুনিক ইকুইপমেন্ট যুক্ত করতে হবে।’ কিন্তু এতদিনেও কেন এই সিস্টেম স্থাপন সম্ভব হলো না? যেখানে বন্যা নিয়ে ত্রিপুরা সিগন্যাল দিচ্ছে লাল, দিল্লিতে অরেঞ্জ সেখানে আমরা কী করছি? আমাদের কেউ সিগন্যাল দিয়ে সহযোগিতা করবে সেই আশায় রয়েছি? এই যে প্রযুক্তির পরনির্ভরশীলতার কারণে এত বড় একটি বন্যার মুখোমুখি হলো বাংলাদেশ, হয়তো আরও হবে তার দায় কার? এই মৃত্যু, ধ্বংস আর ক্ষয়ক্ষতির ভার কে নেবে? এখনো কি বন্যা সিস্টেমের আধুনিকায়নের সময় আসেনি! অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে ও বাইরে থেকে আসা নদীগুলোর পানির আগাম তথ্য পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্রের নির্বাহী প্রকৌশলী সর্দার উদয় রায়হান। তিনি বলেন, ‘আমরা কিন্তু প্রায় ৩ দিন আগেই জানতে পারি, কোন নদীর পানি কী পরিমাণ বাড়তে পারে। সে হিসেবে আমরা নদীর নাম উল্লেখ করে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি বন্যার পূর্বাভাস দিয়ে থাকি। তবে এসব পূর্বাভাস জোন আকারে দেওয়া হয় না। কিন্তু আমরা চাইলে জোন আকারে দিয়ে তা জনবান্ধব আকারে প্রকাশ করতে পারি। এজন্য দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সঙ্গে আমরা কাজ করছি।’
তাহলে কি আবহাওয়া অধিদপ্তর, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বন্যা সতর্কীকরণ কেন্দ্র এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের সঙ্গে তথ্যের কোনো আদান-প্রদান নেই? তথ্যশূন্যের বিষয়টি দ্রুত তদন্ত করে, প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। বন্যা-ধ্বংস-প্রাণহানি আরও হতে পারে। আমরা কি সেই মৃত্যু-ধ্বংসের অপেক্ষায় থাকব নাকি দ্রুততার ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেব?
