প্রাইম ব্যাংক ক্রিকেট ক্লাবের চেয়ারম্যান তানজিল চৌধুরী। তিনি প্রাইম ব্যাংক পিএলসির চেয়ারম্যান। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের স্কুল ক্রিকেট কার্যক্রমের পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছে এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানটি, সম্পৃক্ত ছিল বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগের একটি ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গেও। ফারুক আহমেদের নেতৃত্বে বিসিবির নবযাত্রা ও সংস্কার প্রসঙ্গে দেশ রূপান্তরের সামীউর রহমানের সঙ্গে তার আলাপ।
প্রশ্ন : বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের শীর্ষ পর্যায়ে পরিবর্তন এলো, নাজমুল হাসান পাপন পদত্যাগ করেছেন এবং নতুন প্রেসিডেন্ট হয়েছেন ফারুক আহমেদ। এই পরিবর্তনটাকে কীভাবে দেখেন?
তানজিল চৌধুরী : এই পরিবর্তনটাকে খুব ইতিবাচকভাবেই দেখছি। আমরা তো ফারুক ভাইয়ের সঙ্গে আগেও কাজ করেছি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপারটা হচ্ছে, তিনি বাংলাদেশের ক্রিকেটের পুরো বাস্তুসংস্থানটা ভালো করে বোঝেন। এই ভূমিকাটা যিনি নেবেন, তাকে আসলে একদম তৃণমূল থেকে ক্রিকেটটা বুঝতে হবে। এই বোধশক্তিটা ফারুক ভাইয়ের মধ্যে আছে। আরেকটা ব্যাপার যেটা আমরা পছন্দ করি, যে কারণে এই পদে ওনার আসাটাকে আমরা আহ্বান জানাই; সেটা হচ্ছে ওনার মধ্যে দুর্নীতি সহ্য করতে না পারার একটা সহজাত বৈশিষ্ট্য আছে। যেটা অপ্রিয় সত্য বা দেশের উন্নয়নের স্বার্থে যে কঠিন পদক্ষেপটা নেওয়া দরকার, সেটা বাস্তবায়ন করার মতো ওনার সক্ষমতা আছে। এই অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আসার পর যে পদায়নগুলো হয়েছে, বেশিরভাগই খুব যৌক্তিক হয়েছে। এটাও একটা দৃষ্টান্তমূলক ব্যাপার।
প্রশ্ন : বিসিবি সভাপতির পদটা তো মূলত একটি প্রশাসনিক পদ। আমরা দেখেছি একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে বিসিবির বিরুদ্ধে অনেক দুর্নীতির অভিযোগ উঠে এসেছে বিভিন্ন সময়ে। আপনার কাছে কি মনে হয়, বিসিবিতে প্রশাসনিক সংস্কার দরকার, নাকি এমন কাউকে দরকার, যার ক্রিকেট সম্পর্কে জানা-বোঝা ভালো?
তানজিল : একজনকে নেতার ভূমিকায় দরকার। সংস্থার প্রধান নিজেই সবকিছু করবেন কিংবা তাকেই সবকিছুর সঙ্গে সর্বময়ভাবে যুক্ত থাকতে হবে, সেটা প্রত্যাশিত নয়। তবে ওনার সেই পরিকল্পনাটা থাকতে হবে, যে রূপরেখাটা উনি প্রণয়ন করবেন, সেটা বাস্তবায়নে তো লোক লাগবে। এখানে প্রশাসনিক সংস্কার খুব গুরুত্বপূর্ণ। কারণ বোর্ড পরিচালক যতই ভালো নেন না কেন প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই তো সবকিছু বাস্তবায়ন করতে হবে। এখনো প্রশাসনে যারা আছে, তাদের মেধাভিত্তিক পদায়ন করা দরকার। এখানে কোনো বৈষম্য থাকা উচিত না, রাজনৈতিক পদগুলো শূন্য করতে হবে, একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে, নাহলে কিন্তু আবার সেই আগের জায়গায় ফেরত যেতে হবে। ওনার সঙ্গে যারা থাকবে, তাদের এ ব্যাপারে সহযোগিতা করতে হবে। বিসিবির সামনে এখন বড় একটা সমস্যা হবে ঢাকার লিগ। কারণ বেশিরভাগ স্পনসর পলাতক। বেক্সিমকো গ্রুপের হাতে ৬-৭টি দল, তারা কোনো রকম তহবিল পাবে না। এখন লিগ কি থামিয়ে দেবেন? বছরের সূচি অনুযায়ী যেসব কাজ, সেই সব তো চলমান রাখতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি কিছু চ্যালেঞ্জের পাশাপাশি তাৎক্ষণিকভাবেই কিছু সমস্যা আসবে, যার দ্রুত কার্যকর সমাধান করতে হবে। অতীতে আমরা অনেক সাবেক ক্রিকেটারকে বোর্ডে দেখেছি কিন্তু তাদের কাছ থেকে আমরা কল্যাণকর কিছু পাইনি। ফারুক ভাইই প্রথম সাবেক ক্রিকেটার হিসেবে বোর্ড প্রেসিডেন্ট হয়েছেন। আগের বোর্ডে যেটা হয়েছে, উনি (পাপন) কিছু পাশর্^চর রেখেছিলেন, যারা সিদ্ধান্ত নিত বাংলাদেশের ক্রিকেটে কি হবে না হবে। কোথায় কেনাকাটা হবে, কোথায় স্থাপনা হবে সব তারা নিয়ন্ত্রণ করত। প্রতিটি বিষয়েই তারা সম্পৃক্ত ছিল। সেই জায়গাটায় আমরা ভরসা পাচ্ছি যে ফারুক ভাই এসব হতে দেবেন না।
প্রশ্ন : ফারুক আহমেদ এবং নাজমুল আবেদীন ফাহিম যাদের পরিবর্তে বোর্ড পরিচালক হয়েছেন, তারা কিন্তু অপেক্ষাকৃত ক্লিন ইমেজের মানুষ। আপনি যেসব পরগাছার কথা বললেন, তারা কিন্তু কাগজে-কলমে এখনো পরিচালক পদে আছেন, কিংবা আরও অনেকেই আছেন, যাদের বিরুদ্ধে নিজস্ব সিন্ডিকেট গড়ে তোলার অভিযোগ আছে; কিংবা নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পর্যায়েও আগের মানুষরাই আছেন। এতে করে নতুন সভাপতির পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সম্ভব?
তানজিল : আগে যারা ছিলেন, তারা একটা সুযোগ পেয়েছিলেন, ক্রিকেটকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার সেই কাজে তারা ব্যর্থ হয়েছেন। যারা ব্যর্থ হয়েছেন, তাদের নিয়ে কি আপনি সংস্কার করতে পারবেন? এই প্রশ্ন তো সব সময় থেকে যায়। তাদের বাদ দেওয়াই উচিত। তবে রাতারানি সেটা প্রত্যাশা করতে পারি না, সেটা নানান কারণেই। ধাপে ধাপে সতর্কভাবে এসব করতে হবে। ক্রিকেট বোর্ডে সাংবিধানিক সংস্কার লাগবে। আগের রেজিম কিছু নিয়মকানুন পরিবর্তন করেছে, যাতে করে কিছু গোষ্ঠীকে অন্যায়ভাবে সুযোগ-সুবিধা দেওয়া যায়। প্রিমিয়ার লিগের শীর্ষ ৬ ক্লাবকে দুইটা করে কাউন্সিলরশিপ ভোট দেওয়া হচ্ছে, কোনো নীতিমালা নেই যে একটা গ্রুপ কতগুলো ক্লাব নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, এই সবই আঁতাত এবং সিন্ডিকেট করার সুস্পষ্ট চিহ্ন। ক্রিকেটে জুয়া আমাদের দেশে ঢুকে গেছে, ক্রিকেটাররা জড়িয়ে গেছে, জুয়ার অ্যাপগুলো প্রকাশ্যে বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছে। যারা এসবের পেছনে আছে, তারা এখনো ক্রিকেট বোর্ডে আছে বা ক্রিকেটের সঙ্গে আছে। এসব দূর করতে হলে স্বচ্ছতা আনতে হবে। আমাদের ছেলেমেয়েরা যারা সংগ্রাম করেছে, তারা তো চায় এখানে (বোর্ডে) নতুনত্ব আসুক। তরুণ কেউ আসুক। আমি তরুণ কাউকে দেখলাম না, এটা দুঃখজনক। যারা সংস্কারে কাজ করে করতে চায়, তাদের নিয়ে আসেন, আইনি বিষয়ের জন্য আইন বিশেষজ্ঞ নিয়ে আসেন সাব-কমিটিতে, এখানে তো বাধা নেই। আমাদের ক্রিকেট বোর্ডে নারীদের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই, এটা খুব দুঃখজনক।
প্রশ্ন : অনেক পরিচালক হয়তো দেশে নেই, অনেকেই আত্মগোপনে আছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা সবশেষ জরুরি সভায় আসেননি। পাপন পদত্যাগ করলেও তারা থেকে গেছেন কেন?
তানজিল : এতটুকু লজ্জা-শরম আমাদের নেই যে যখন পদত্যাগ করে ফেলার কথা, তখন পদত্যাগ করে ফেলুক! তারা দুইটা সভায় পরপর অনুপস্থিত থাকবে, এরপর নিয়মতান্ত্রিকভাবে তাদের পদচ্যুত করতে হবে, কেন? এগুলো একধরনের গুটিবাজি, যাতে পরে সুযোগ পেলে তারা বলতে পারে যে আমরা পদত্যাগ করিনি, আমাদের জোর করে করানো হয়েছে। আমরা তো খেলা নিয়ে কথা বলছি। সেই খেলোয়াড়ি চেতনা থেকেই তো তাদের সরে আসা উচিত ছিল। (পাপন সাহেবের সঙ্গে) যারা ছিলেন, তারা করে ফেললেই হতো, এটা খুবই বাজে নিদর্শন হলো।
প্রশ্ন : অনেক সময়ই অভিযোগ আসে যে বিসিবিতে শ্রীলঙ্কান সিন্ডিকেট, বেক্সিমকো সিন্ডিকেট, গাজী সিন্ডিকেট এসব কাজ করে? অনেক পরিচালক অনুপস্থিত, তবে তারা কি আড়ালে থেকে কলকাঠি নাড়তেই পদত্যাগ করেননি?
তানজিল : আমাদের ক্রিকেটটা আহত। এখন আহতকে চিকিৎসা দেবেন না তার ঘায়ের ওপর ব্যান্ডেজ লাগাবেন, সেটাই হচ্ছে ব্যাপার। মলম-ব্যান্ডেজ লাগালে সাময়িক উপশম হবে আর চিকিৎসা করালে রোগ ভালো হবে। বোর্ডের নীতিগত সংস্কার করতে হবে, কেউ যদি বাধা দেয় তাহলে তাকে দেশের স্বার্থেই সরিয়ে দিতে হবে। এক্সট্রা অর্ডিনারি জেনারেল মিটিং ডেকে অনেক কিছুই পাস করিয়ে নেওয়া সম্ভব। অনেকেই নতুন বিসিবি প্রধান, ক্রীড়া উপদেষ্টাকে বিপথে পরিচালিত করছে, বিভিন্ন আইনের ভয় দেখিয়ে। অথচ যে আইনের বা গঠনতন্ত্রের দোহাই দিয়ে কথাগুলো বলা হচ্ছে, সেটাই তো বিতর্কিত।
প্রশ্ন : আপনি আগে দুই মেয়াদে বিসিবিতে ছিলেন। সামনে সুযোগ হলে কি বিসিবিতে আবারও সম্পৃক্ত হওয়ার ইচ্ছা আছে?
তানজিল : আমি ক্রিকেট বোর্ডে আগে ছিলাম, দুটা বিভাগ চালিয়েছি, অনেক কিছু দেখেছি। প্রাইম ব্যাংক বহু বছর ধরেই ক্রিকেটের উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। এখনো জড়িত থাকতে চাই। বিপিএলে আমরা একবারই এসেছিলাম, খুবই দৃশ্যমান কিছু কারণে আমরা বিপিএলে সম্পৃক্ত থাকিনি। কারণ সেখানে সব সময় একটা নির্দিষ্ট দলের বা গোষ্ঠীর অনুকূলে সবকিছু হতো। আমরা যদি স্বচ্ছতা দেখি তাহলে আমরা আরও সম্পৃক্ত হতে চাই, বিনিময়ে কিছুই পাওয়ার নেই। প্রাইম ব্যাংকের কোনো কর্মীকে আপনি বিসিবিতে দেখবেন না বসে আছি। ক্রিকেট ভালোবাসি। এখনো ক্রিকেট খেলি। ক্রিকেটের সঙ্গে পথচলা বহুদিনের। তবে কোনো নির্বাহী ভূমিকা নেব কি না, সে ব্যাপারে এখনো আমাকে একটু ভাবতে হবে। ওরকম কোনো ইচ্ছা এই মুহূর্তে নেই।
