আসিয়ান সদস্য হতে মালয়েশিয়ার সমর্থন চান ড. ইউনূস

আপডেট : ২৯ আগস্ট ২০২৪, ০৩:০৬ এএম

অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস আসিয়ানের সদস্যপদ পেতে মালয়েশিয়ার সমর্থন চেয়েছেন। গতকাল বুধবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাজনা মো. হাশিম প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এলে তিনি এ সমর্থন চান।

এ সময় প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ আসিয়ান ও সার্কের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে।

কুয়ালালামপুর আসিয়ানের পরবর্তী চেয়ার হতে যাচ্ছে উল্লেখ করে মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাশিম বলেন, আসিয়ান সদস্যপদের বিষয়ে অধ্যাপক ইউনূসের বার্তা মালয়েশিয়া কর্র্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছে দেবেন। মালয়েশিয়া অধ্যাপক ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে কাজ করবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমরা আপনাকে বিশ^াস করি। আপনার জন্য শুভকামনা।’

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার অত্যন্ত চমৎকার সম্পর্ক এবং তিনি প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মাহাথির মোহাম্মদসহ মালয়েশিয়ার নেতাদের সঙ্গে তার বন্ধুত্বের কথা স্মরণ করেন। অধ্যাপক ইউনূস মালয়েশিয়ার হাইকমিশনারের উদ্দেশে বলেন, ‘চলুন আমরা সম্পর্ক উন্নয়নে আমাদের সর্বোচ্চ চেস্টা করি।’ মালয়েশিয়ার অন্তত সাতটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউনূস সেন্টার রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, এ সেন্টারগুলো থেকে সামাজিক ব্যবসায়িক ধারণা এবং থ্রি জিরো ধারণা প্রচার করা হচ্ছে।

মালয়েশিয়ার হাইকমিশনার হাশিম বাংলাদেশে তার চার বছরের মেয়াদ শেষ করতে যাচ্ছেন। তিনি মোবাইল ফোন কোম্পানি রবি আজিয়াটাসহ অন্যান্য মালয়েশিয়ান কোম্পানির ক্ষেত্রে ট্যাক্স জটিলতার বিষয় তুলে ধরে বলেন, রবির আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ কর হিসাবে জমা দিতে হয়। তিনি বলেন, সভরেন তহবিলে গঠিত কোম্পানিসহ মালয়েশিয়ার বেশ কয়েকটি কোম্পানি বাংলাদেশে ৫ বিলিয়নেরও বেশি মার্কিন ডলার বিনিয়োগ করেছে এবং শিক্ষাসহ অন্যান্য খাতে আরও বিনিয়োগে আগ্রহী।

হাইকমিশনার জানান, মালয়েশিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চট্টগ্রামভিত্তিক একটি কোম্পানি গাড়ি বাজারজাতকরণ এবং সংযোজনের জন্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। এ ছাড়া কুয়ালালামপুর চিকিৎসা পর্যটনের জন্য একটি পছন্দের গন্তব্য হতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশিরা এখানে সাশ্রয়ীমূল্যে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা নিতে পারে।

সংস্কারে ইউএনডিপির সহায়তায় চাইলেন প্রধান উপদেষ্টা : দেশের বিচার বিভাগ, পুলিশ, নির্বাচন কমিশন, কর প্রশাসন এবং ভূমি নিবন্ধনের মতো বিস্তৃত ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি ইউএনডিপির সহায়তা চেয়েছেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস। গতকাল বুধবার ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি স্টেফান লিলার প্রধান উপদেষ্টার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, অন্তর্র্বর্তী সরকার একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রয়াসে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। ছাত্র নেতৃত্বাধীন বিপ্লবের ফল সত্যিকার অর্থে জনগণকে উপভোগ করতে সহায়তা করার জন্য বাংলাদেশের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার করতে হবে।

বাংলাদেশে অবিলম্বে সুদূরপ্রসারী ডিজিটালাইজেশন করা দরকার উল্লেখ করে অধ্যাপক ইউনূস বলেন, যাতে কোনো ঝামেলা ছাড়াই সহজেই একজন নাগরিক তার ট্যাক্স এবং ভূমি কর পরিশোধের পাশাপাশি তাদের জমি ও সম্পত্তি বিক্রয় নিবন্ধন করতে পারে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘আমাদের ট্যাক্স অফিসে যেতে হবে কেন? ট্যাক্স রিটার্ন দাখিল করতে কাউকে ট্যাক্স অফিসে যেতে হবে না।’

অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, দেশে আইনের শাসন নিশ্চিত করতে একটি আধুনিক পুলিশ বাহিনী গড়ে তুলতে হবে। সেজন্য গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার প্রয়োজন।

তিনি বলেন, ‘আমরা একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচনের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এজন্য তার সরকার দেশের বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশনের সংস্কারের জন্য ইউএনডিপির সহায়তা চায়।’

ছাত্র-জনতার বিপ্লবের কথা উল্লেখ করে প্রধান উপদেষ্টা বলেন, ‘সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার এখন উপযুক্ত সময়। এগুলো হলো সুযোগ। কীভাবে সিস্টেমগুলো পুনর্গঠন করা যায় তা আমাদের খুঁজে বের করতে হবে।’

বৈঠকে বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যাপক সংস্কারের জন্য জাতিসংঘ পূর্ণ সহায়তা করবে বলে আশ্বাস দেন ইউএনডিপির আবাসিক প্রতিনিধি লিলার। তিনি বলেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ইউএনডিপির সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। কিন্তু এ দেশের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার কারণে তাদের অর্থায়ন অনেকটাই ধীর হয়ে গেছে।

বৈঠকে উপস্থিত ইউএনডিপি কর্মকর্তারা বলেছেন, সংস্থাটি বাংলাদেশের রপ্তানি বহুমুখীকরণ প্রচেষ্টা, সবুজ রূপান্তর (গ্রিন ট্রানজিশন), ব্যবসা-বাণিজ্য সহজীকরণ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে সহায়তা করতে প্রস্তুত।

বাংলাদেশের মূল সীমাবদ্ধতাগুলো শনাক্ত করে তারা জলবায়ু খাতে বিনিয়োগ পুনর্মূল্যায়ন করারও আশ্বাস দেন।

দেশ পুনর্গঠন প্রচেষ্টায় অন্তর্র্বর্তী সরকারকে সহায়তা করবে ফ্রান্স : বাংলাদেশের পুনর্গঠনের প্রচেষ্টায় প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং অন্তর্র্বর্তী সরকারকে সহায়তা করতে প্রস্তুত রয়েছে ফ্রান্স। গতকাল বিকেলে বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত মেরি মাসদুপুই ঢাকায় রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎকালে এ মন্তব্য করেন।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ফরাসি প্রেসিডেন্ট ইমানুয়েল মাখোঁ তাকে সুবিধাজনক সময়ে ফ্রান্স সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। তিনি জুলাই-আগস্ট বিপ্লবে নিহত ছাত্র-জনতার মৃত্যুতেও শোক প্রকাশ করেন।

অধ্যাপক ইউনূস বলেন, ‘ছাত্র-নেতৃত্বাধীন বিপ্লব অন্তর্র্বর্তী সরকারকে দেশ পুনর্গঠনের সুযোগ দিয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি। এটি একটি বড় কাজ। তবে আমরা এটিকে একটি বড় সুযোগ হিসেবে দেখছি। আমরা যদি সুযোগটি কাজে না লাগাই, তাহলে এটি একটি বড় ব্যর্থতা হবে।’

দেশে জনগণকে ‘বড় পরিবারের’ অংশ হিসেবে দেখার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কখনো কখনো আমরা খুব জোরালোভাবে দ্বিমত পোষণ করি। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমরা শত্রু। সরকার প্রতিটি নাগরিকের অধিকার রক্ষায় অঙ্গীকারাবদ্ধ। আসুন মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করি। আমাদের কাজ হলো সংবিধানকে কার্যকর করা।’

বাংলাদেশকে সহযোগিতা করতে চায় সুইজারল্যান্ড : বর্তমান প্রেক্ষাপটে সুইজারল্যান্ড বাংলাদেশকে আন্তরিকভাবে সহযোগিতা করতে চায় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত রেতো রিংলি। তিনি বলেছেন, সুইজারল্যান্ড এবং বাংলাদেশের ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক বিদ্যমান। সুইজারল্যান্ডের সঙ্গে বাংলাদেশের এই সম্পর্ক এবং সমর্থন অব্যাহত থাকবে।

গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের সঙ্গে এক বৈঠকে সুইজারল্যান্ডের রাষ্ট্রদূত এই অভিমত প্রকাশ করেন। সকাল ১০টায় সচিবালয়ে স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কার্যালয়ে এ বৈঠক হয়।

বৈঠকে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা রাষ্ট্রদূতকে বলেন, ‘সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানে অনেক ছাত্র জনতা আহত হয়েছেন। অনেকে দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ববরণ করেছেন। আহতদের যথাযথ চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য খাতের সংস্কার এবং বিকেন্দ্রিকরণে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে।’

বৈঠকে সাম্প্রতিক বন্যা পরিস্থিতিতে স্বাস্থ্য বিভাগের কাজ নিয়ে রাষ্ট্রদূতকে অবহিত করা হয়।

এ সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব নার্গিস খানম উপস্থিত ছিলেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত