সদ্য বিলুপ্ত দ্বাদশ জাতীয় সংসদের স্পিকারের পদ থেকে ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর পদত্যাগের চিঠি গ্রহণ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। গতকাল সোমবার পদত্যাগপত্র পাওয়ার পর বিকেলেই তা গ্রহণ করে এ বিষয়ে রাষ্ট্রপতির কার্যালয় থেকে গেজেট প্রকাশ করা হয়।
এদিকে স্পিকারের পদত্যাগ গ্রহণ করে গেজেট তৈরি হওয়ায় সাংবিধানিক সংকট বা স্পিকার পদে শূন্যতা তৈরি হলো কি না এবং আগামী নির্বাচনের পর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য কে পড়াবেন তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সরকারপ্রধান অর্থাৎ প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করলে মন্ত্রিসভার সদস্যদের পদত্যাগ হয়ে যায় সংবিধানে এমন বিধান রয়েছে। সংসদ ভেঙে গেলে সংসদ সদস্যদের পদও শূন্য হয়ে যায়। এ ক্ষেত্রে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের সংসদ সদস্য পদ বাতিল হলেও তাদের পদ বহাল থাকে নতুন সংসদ গঠন হওয়া পর্যন্ত। স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার নতুন সদস্যদের শপথ পাঠ করিয়ে থাকেন। এ ছাড়া সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করেন। ফলে গতকাল স্পিকারের পদত্যাগ ও পদ শূন্য করে গেজেট প্রকাশ হওয়ায় নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
সংবিধান বিশ্লেষক ও আইনজ্ঞরা বলছেন, বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্পিকারের পদত্যাগের সুযোগ নেই। তবে বিকল্প ব্যবস্থা রয়েছে।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারের পদ কীভাবে শূন্য হবে সে বিষয়ে বলা আছে। সেখানে সংসদ সদস্যপদ না থাকা ও পদত্যাগ করাসহ পাঁচটি কারণে স্পিকারের পদ শূন্য হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, স্পিকারের পদ শূন্য হবে, যদি তিনি সংসদ সদস্যপদে না থাকেন, মন্ত্রী হন, অপসারণের প্রস্তাব সংসদে গৃহীত হয়, পদত্যাগ করেন অথবা কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর অন্য কোনো সদস্য তার কার্যভার গ্রহণ করলে। সেই অনুচ্ছেদে আরও বলা আছে, এসব বিধান সত্ত্বেও ক্ষেত্রমতে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার তার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্বীয় পদে বহাল রয়েছেন বলে গণ্য হবে।
সংবিধানের এ ধারা অনুসারে পদত্যাগের পরও নতুন স্পিকার দায়িত্ব নেওয়ার আগপর্যন্ত শিরীন শারমিন চৌধুরীই পদে থাকছেন বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ ত্রয়োদশ সংসদের নির্বাচিত স্পিকার দায়িত্ব না নেওয়া পর্যন্ত শিরীন শারমিনই স্পিকার হিসেবে গণ্য হবেন। তিনিই নতুন সংসদের সদস্যদের শপথ পড়াবেন।
সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদের স্পিকার হলো রাষ্ট্রের তৃতীয় সর্বোচ্চ পদ। সংবিধানে বলা আছে, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে কিংবা অনুপস্থিতি, অসুস্থতা বা অন্য কোনো কারণে রাষ্ট্রপতি দায়িত্ব পালনে অসমর্থ হলে ক্ষেত্রমত রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত না হওয়া পর্যন্ত কিংবা রাষ্ট্রপতি পুনরায় স্বীয় কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত স্পিকার রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করবেন।
সংবিধানের ৭৪ অনুচ্ছেদে সংসদে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার নির্বাচনের বিষয়ে বলা আছে। সংবিধান বলছে, কোনো সাধারণ নির্বাচনের পর সংসদের প্রথম বৈঠকে সংসদ সদস্যদের মধ্য থেকে সংসদ একজন স্পিকার ও একজন ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করবে। অন্যদিকে সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদে বলা আছে, ‘স্পিকারের উদ্দেশ্যে স্বাক্ষরযুক্ত পত্রযোগে রাষ্ট্রপতি স্বীয় পদ ত্যাগ করিতে পারিবেন।’
এখানে উল্লেখ্য যে, রাষ্ট্রপতির পদের ক্ষেত্রেও সরকারের মেয়াদ ও বিলুপ্তির কোনো সম্পর্ক নেই। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদের মেয়াদ শেষ হলেও তার উত্তরাধিকারী কার্যভার গ্রহণ না করা পর্যন্ত তিনি নিজ পদে বহাল থাকবেন।
অধ্যাপক ও সংসদবিষয়ক গবেষক নিজাম উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘শিরীন শারমিন চৌধুরীর পদত্যাগের ফলে স্পিকার পদে কী হবে, সেটা সংবিধানে স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে। নতুন কেউ দায়িত্ব নেওয়া পর্যন্ত তিনিই স্পিকার রয়েছেন বলে গণ্য হবে।’ তিনি আরও বলেন, নতুন নির্বাচন ছাড়া স্পিকার নির্বাচনের সুযোগ সংবিধানে নেই। সংবিধান বাতিল হলে সেটা ভিন্ন কথা। অথবা সংবিধান স্থগিত করে তা করা যেতে পারে। সে ক্ষেত্রে বিকল্প রয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ব্যারিস্টার তানজীব-উল আলম বলেন, ‘স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের মেয়াদের বিষয়টি সংবিধানে স্পষ্ট উল্লেখ আছে। সংবিধান অনুযায়ী নতুন স্পিকার না আসা পর্যন্ত তাদের পদ শূন্য হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আইন অনুযায়ী সংসদ ভেঙে গেলেও আমাদের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার তাদের পদে আছেন, এখানে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই। সংসদ ভেঙে যাওয়ার কারণে তারা এই মুহূর্তে সংসদ সদস্য নন। তবে স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকারের পদে তারা বহাল আছেন। তাদের পদ শূন্য করতে হলে সংবিধান বা সংবিধানের সংশ্লিষ্ট ধারা বাতিল বা স্থগিত করতে হবে।’
এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘তবে এটাও সত্য যে, যদি কোনো কারণে স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকার মারা যান কিংবা এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটে তাহলে কি শূন্যতা থাকবে? কখনোই কোনো সাংবিধানিক জায়গায় শূন্যতা রাখা হয় না। শূন্যতা পূরণ হবেই। সংবিধান বলে স্পিকার যদি না থাকেন তাহলে রাষ্ট্রপতির অনুপস্থিতিতে প্রধান বিচারপতি সেই দায়িত্বভার নেবেন। আর প্রধান বিচারপতি শপথ পড়াতে পারবেন। ডেপুটি স্পিকার যেহেতু এখনো পদত্যাগ করেননি তিনি নতুন সংসদের এমপিদের শপথ পাঠ করাতে পারবেন।’
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেন, ‘পরবর্তী সংসদ না আসা পর্যন্ত স্পিকার তার পদে বহাল থাকেন। এখন যে পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, স্পিকার পদত্যাগ করেছেন, ডেপুটি স্পিকার বন্দি, তাতে সংবিধান মেনে চলা হলে দেখা যায়, এতে এক ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।’
গণআন্দোলনের মুখে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে চলে যান। এরপর রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙে দেন। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার গঠন করা হয়। শেখ হাসিনার সরকারের পতনের ২৭ দিনের মাথায় পদত্যাগ করলেন স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী।
২০০৮ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে স্পিকার নির্বাচিত হন আবদুল হামিদ। পরে তিনি রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হলে ২০১৩ সালের ৩০ এপ্রিল স্পিকার নির্বাচিত হন শিরীন শারমিন চৌধুরী। এরপর থেকে তিনিই এ দায়িত্বে ছিলেন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের কর্মসূচি চলাকালে ছাত্র-জনতা নিহতের ঘটনায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে। শিরীন শারমিন চৌধুরীর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে। রংপুরে গুলিবিদ্ধ হয়ে স্বর্ণশ্রমিক মুসলিম উদ্দিন (৩৮) নিহত হওয়ার ঘটনায় ২৭ আগস্ট শিরীন শারমিন ও সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশিসহ ১৭ জনের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করা হয়।
দ্বাদশ সংসদে ডেপুটি স্পিকার শামসুল হককে (টুকু) গত ১৫ আগস্ট গ্রেপ্তার করা হয়। তখন পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, খিলক্ষেত থানার নিকুঞ্জ আবাসিক এলাকায় আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। একটি হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তিনি এখন পুলিশ হেফাজতে আছেন।
