দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের দায়ে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে বিএনপি। গতকাল সোমবার বিকেলে এই দুই নেতার ঢাকার বাসায় কারণ দর্শানোর নোটিস পৌঁছানো হয়। খায়রুল কবির খোকন তার জবাব দিয়েছেন। আর সালাহউদ্দিন আহমেদ দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলেছেন বলে জানা গেছে। চিঠি পাওয়ার পর অনিচ্ছাকৃত এস আলমের গাড়ি ব্যবহার করার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেছেন সালাহউদ্দিন আহমেদ। গতকাল দুপুরে গুলশানের নিজ বাসভবনে তিনি দুঃখ প্রকাশ করে ক্ষমা চান।
এদিকে এস আলম গ্রুপের ১৪টি বিলাসবহুল গাড়ি নিরাপদে সরিয়ে নিতে সহযোগিতার অভিযোগে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়কসহ তিন প্রভাবশালী নেতার দলের প্রাথমিক সদস্যপদসহ সব ধরনের পদ স্থগিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে বিলুপ্ত করা হয়েছে দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি।
খায়রুল কবির খোকন তার ব্যাখ্যা বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমাকে কেন্দ্র করে যে একটি পোস্ট পাবলিস্ট করে যে সমস্ত ঘটনার অবতারণা করা হয়েছে তা একান্তই সত্যের অপলাপ ছাড়া আর কিছুই না। আমার ছাত্র জীবনের রাজনীতি, লড়াই ইতিহাস এবং জাতীয় রাজনীতিতে আমার ত্যাগ, অবিচলতা, আনুগত্যতা, শৃঙ্খলার প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা ও নৈতিকতার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থানের কথা আমাদের দলের প্রতিটি নেতাকর্মী অবগত।
সালাহউদ্দিন ও খোকনকে কারণ দর্শানোর নোটিস : চিঠি পাওয়ার কথা দেশ রূপান্তরের কাছে স্বীকার করেছেন খায়রুল কবির খোকন। তিনি বলেছেন, ‘চিঠি পেয়েছি। যথোপযুক্ত জবাব দেব।’
খায়রুল কবির খোকনের বিরুদ্ধে অভিযোগ হলো সম্প্রতি তিনি ঢাকার গুলশানের একটি হোটেলে ডায়মন্ড ওয়ার্ল্ড লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় শিল্পবাণিজ্য উপকমিটির সদস্য দিলীপ কুমার আগরওয়ালার সঙ্গে গোপন বৈঠক করেন।
সালাহউদ্দিনের ঘনিষ্ঠ এক নেতা জানান, সালাহউদ্দিন আহমেদ চিঠি পেয়েছেন।
এরপরই সংবাদ সম্মেলন করে দুঃখ প্রকাশ করেন। এখন নিয়ম অনুযায়ী চিঠির জবাব দেবেন।
সালাহউদ্দিনের দুঃখ প্রকাশ : ‘১০ বছর পর আমার নিজ নির্বাচনী জেলায় সংবর্ধনায় অংশ নিয়েছিলাম। আমি বিমানবন্দর থেকে নেমে কোন গাড়িতে করে যাব, সেটা তো আমি ঠিক করতে পারিনি। সংবর্ধনার আয়োজন করেছিলেন চকরিয়া উপজেলা বিএনপির সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক। তারা এটা ঠিক করে দিয়েছিলেন। বিমানবন্দরে নামার পর আমাদের নেতাকর্মীরা বলেছেন, এই গাড়িতে ওঠেন। এখন সেই গাড়িটি কার তা খোঁজ নেওয়া সম্ভব ছিল না। ১০ বছর পর নিজ জেলায় যাচ্ছি, তাই আবেগপ্লুত ছিলাম। মনের মধ্যে বাসনা ছিল কখন মা-বাবার কবর জিয়ারত করব।’
সাবেক এই মন্ত্রী বলেন, ‘পরে জানতে পারি এই গাড়িটি আমার এক ছোট ভাইয়ের, যিনি এস আলম গ্রুপে চাকরি করেন। তিনি কোম্পানির বিভিন্ন জমিজমার বিষয়গুলো দেখে থাকেন। এজন্য তার চলাচলের জন্য গাড়ি দিয়েছে কোম্পানি। আমি এস আলম গ্রুপের গাড়ি ব্যবহার করেছি, এ নিয়ে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন হওয়ার পর দেশবাসীর মধ্যে একটা প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। আমি যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে দেশবাসী ও কারও মনে কোনো কষ্ট দিয়ে থাকি, তার জন্য দুঃখ প্রকাশ ও ক্ষমা চাচ্ছি।’
চট্টগ্রামের এস আলমের মালিকানাধীন গাড়িতে করে গত ২৮ আগস্ট নিজ এলাকায় গিয়ে সংবর্ধনা নিতে যান সালাহউদ্দিন আহমেদ। তিনি কক্সবাজার বিমানবন্দরে পৌঁছান। এরপর দলের নেতাকর্মীদের গাড়িবহরের সঙ্গে পেকুয়ায় পৌঁছান তিনি। কক্সবাজার বিমানবন্দর থেকে সালাহউদ্দিন আহমেদের গাড়িবহর পেকুয়ায় পৌঁছানোর বিভিন্ন ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শেয়ার করেছেন বিএনপি নেতাকর্মীরা। এ রকম একটি ভিডিওতে দেখা যায়, যে গাড়িতে (জিপ) করে সালাহউদ্দিন আহমেদ কক্সবাজার থেকে পেকুয়ায় আসেন, সেটির নম্বর চট্ট মেট্রো ঘ-১১-১৫৩৩। এটি মিতসুবিশির স্টেশন ওয়াগন ব্র্যান্ডের জিপ, যা এস আলম গ্রুপের। তিনি সামনের সিটে বসে হাত নেড়ে আশপাশের লোকজনকে শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন।
এস আলমের গাড়ির এ ঘটনায় কোনো ষড়যন্ত্র দেখছেন কি না প্রশ্ন করা হলে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘বিষয়টা আমি অন্যভাবে ব্যাখ্যা করতে চাই। আমাদের সবার উচিত পতিত স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন তথ্য-সংবলিত সংবাদ প্রকাশ করা। যারা ১৫-১৭ বছরে দেশটাকে বিভিন্নভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে। সব সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, দেশের বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ, শাসন বিভাগসহ এমনকি ফোর্থ স্টেট মিডিয়াসহ সর্বত্র যে পচন ধরেছে, ফ্যাসিবাদের যে স্বাক্ষর রয়েছে, তার বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হওয়া উচিত। আমরা যেন গুম, খুন, অপহরণের সঙ্গে কারা জড়িত, আয়নাঘরের সঙ্গে কারা জড়িত ছিল, সেদিকে মনোযোগ দিই। জড়িতদের কেউ কেউ গ্রেপ্তার হলেও তাদের যথাযথভাবে ইন্টারোগেশন করা হচ্ছে না। ফলে গুমের রহস্য উন্মোচন করা যাচ্ছে না।’
একটি গণমাধ্যমে গাড়িচালক আপনার পরিচিত বলে যে বক্তব্য দিয়েছেন, সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘এই কথা আমি ওই পত্রিকার রিপোর্টারকে বলিনি। এটা কীভাবে লিখেছেন আমি জানি না। এটা মিসকোড করা হয়েছে। ওইখানে একটা মাইক্রোবাস ছিল, যার ড্রাইভারটা আমার এলাকার। আমি মনে হয়, ওই গাড়িতে উঠতে চেয়েছিলাম, যে আমার পরিচিত। মাইক্রোবাসে ওপরে হুটখোলা নেই বলে আমাকে সেই গাড়িতে উঠতে তারা দেননি। হয়তোবা এগুলো বলতে গিয়ে পত্রিকার রিপোর্টার আমার বক্তব্য মিসকোড করেছেন।’
এস আলমের গাড়িকা-ে কপাল পুড়ল তিন বিএনপি নেতার : এস আলম গ্রুপের গাড়িকা-ে আলোচিত-সমালোচিত তিন নেতা হলেন চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক এনাম ও কর্ণফুলী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এসএম মামুন মিয়া। তাদের মধ্যে শেষের দুজন এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলম মাসুদের ঘনিষ্ঠজন বলে আগে থেকেই পরিচিত।
গত রবিবার রাতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত পৃথক দুটি চিঠিতে দক্ষিণ জেলা বিএনপির কমিটি বিলুপ্তি ও তিন নেতার সদস্যপদ স্থগিতের কথা জানানো হয়।
গত বৃহস্পতিবার রাতে কর্ণফুলীর দক্ষিণপাড়ে মইজ্জার টেক এলাকায় অবস্থিত এস আলম গ্রুপের একটি ওয়্যার হাউজ থেকে দক্ষিণ জেলা বিএনপির কয়েকজন প্রভাবশালী নেতার তত্ত্বাবধানে গভীর রাতে ১৪ বিলাসবহুল গাড়ি সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। পরদিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে এ নিয়ে সংবাদ প্রচারিত হলে তা নজরে আসে বিএনপির নীতিনির্ধারণী মহলের। ওইদিনই কেন্দ্র থেকে এ বিষয়ে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে জবাব চেয়ে দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আবু সুফিয়ান, প্রথম যুগ্ম আহ্বায়ক এনামুল হক এনাম ও কর্ণফুলী উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক এসএম মামুন মিয়াকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়া হয়। নোটিস পেয়ে তড়িঘড়ি এক সংবাদ সম্মেলন করে গাড়ি সরিয়ে নিতে সহযোগিতার বিষয়টি সাংবাদিকদের কাছে অস্বীকার করেন তিন নেতা। উল্টো কোন মহলের ইশারায় এ ধরনের পরিবেশন করা হয়েছে বলে গণমাধ্যমের প্রতি আঙুল তোলেন বিএনপি নেতা আবু সুফিয়ান।
দলীয় সূত্র জানায়, নোটিসপ্রাপ্ত তিন নেতা সরাসরি ঢাকায় গিয়ে কেন্দ্রের কাছে আত্মপক্ষ সমর্থন করে নোটিসের জবাব দেন এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা অস্বীকার করেন। জবাবে তারা সংবাদ সম্মেলনে আওড়ানো বুলির পুনরাবৃত্তি করে বলেছেন, মূলত মীর গ্রুপের একটি প্রতিষ্ঠানে বিএনপির নামে চাঁদাবাজির খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। তিন নেতার এই জবাবে সন্তুষ্ট হতে না পেরে হাইকমান্ডের নির্দেশে কেন্দ্র থেকে তাদের সদস্যপদ স্থগিত এবং দক্ষিণ জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটি বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
২০১৯ সালের ২ অক্টোবর আবু সুফিয়ানকে আহ্বায়ক করে চট্টগ্রাম দক্ষিণ জেলা বিএনপির ৬৫ সদস্যের একটি আহ্বায়ক কমিটি ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল কেন্দ্র থেকে। তিন মাসের মধ্যে পূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠনের নির্দেশনা ছিল আহ্বায়ক কমিটির প্রতি। কিন্তু বিগত প্রায় পাঁচ বছরে তারা পূর্ণাঙ্গ কমিটি দিতে পারেনি। এ নিয়ে কেন্দ্র ও তৃণমূলে এক ধরনের অসন্তোষও বিরাজ করছিল আহ্বায়ক কমিটির নেতাদের প্রতি।
