১৯৪৭ সালে ছাত্রাবস্থায় তিনি ‘দৈনিক আজাদ’-এ সাংবাদিকতা শুরু করেন এবং পরে বার্তা সম্পাদক হন। ১৯৫৪ সালে ‘আজাদ’-এর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন হওয়ার পর সেই বছরই ‘ইত্তেফাক’-এর বার্তা সম্পাদক পদে নিযুক্ত হন। ১৯৭০ সালে হন নির্বাহী সম্পাদক। ১৯৬৯-৭০ সালে ‘অনামী’ ছদ্মনামে লেখা অনবদ্য উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’ কলামে উঠে এসেছে তৎকালীন রাজনীতির তীক্ষè পর্যবেক্ষণ এবং বিচার-বিশ্লেষণ। ১৯৭১ সালের ১০ ডিসেম্বর তাকে শান্তিনগর, চামেলীবাগের বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সৈন্য ও আলবদর-রাজাকাররা। এরপর এই সাংবাদিকের আর খোঁজ পাওয়া যায়নি। অতীতের সঙ্গে অধুনার সংযোগ ঘটাতে ছাপা হলো, পূর্ব পাকিস্তান সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং পাকিস্তান ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহীদ বুদ্ধিজীবী সাংবাদিক সিরাজুদ্দীন হোসেনের জনপ্রিয় উপসম্পাদকীয় ‘মঞ্চে-নেপথ্যে’
যে দিবস উদ্যাপনের জন্য গত এক দশক যাবৎ প্রতি বৎসর জৌলুস আর ঘটার অন্ত ছিল না এমনকি যার ধাক্কায় পাকিস্তানের জন্মদিবস ১৪ই আগস্ট উদ্যাপনের রেওয়াজটিও একরূপ উঠিয়া যাইতেই বসিয়াছিল, ডিকেডি আমলের সেই ‘বিপ্লব দিবস’ অতঃপর আর এদেশের মানুষ উদ্যাপন করিবে না। আজ হইতে এগারো বৎসর আগে রাতের অন্ধকারে যেদিন পার্লামেন্টারি শাসনের মূলোৎপাটন করিয়া এদেশের ১২ কোটি মানুষের সকল অধিকার ছিনাইয়া লওয়া হইয়াছিল, ইচ্ছার বিরুদ্ধে হইলেও গত ১ যুগ যাবৎ সেই দিনটিকেই এদেশের মানুষকে ‘বিপ্লব দিবস’ হিসাবে উদ্যাপন করিতে বাধ্য করা হইয়াছে। ঢক্কানিনাদে ডিকেডি সরকারের মাহাত্ম্য প্রচারের আটঘাট বাঁধা শত ব্যবস্থা সত্ত্বেও দোর্দ-প্রতাপ আইয়ুবশাহির পতন রোধ করা সেই আমলের ‘লৌহ মানবদের’ পক্ষে শেষ পর্যন্ত আর সম্ভব হয় নাই। সেদিনের ক্ষমতাসীনদের উদ্দেশে সতর্কবাণী উচ্চারণ করিয়া শ্রদ্ধেয় ‘মোসাফির’ প্রায়শই বলিতেন, ক্ষমতার দাপট কখনও চিরস্থায়ী হইতে পারে না-একদিন আসিবে যেদিন অহংকারীর অহংকার, ক্ষমতাগর্বীর সব দাপট হাওয়ায় উবিয়া যাইবে। মূলত হইয়াছেও তাহাই। মানুষের অধিকার ছিনাইয়া লওয়া, তথাকথিত মৌলিক গণতন্ত্রের জাঁতাকলে সমগ্র জাতিকে নিষ্পিষ্ট করিয়া বিকৃত-বিবেকের সে ধুরন্ধররা দীর্ঘ দশটি বছর যে অনাচার-অবিচার চালাইয়া গেলেন, সারা জাতিকেই আজ তার কাফফারা দিতে হইতেছে! তাঁহাদের ‘সুশাসনের’ ধাক্কায় দেশকে আজ চরমতম এক শাসনতান্ত্রিক সংকটে নিঃপতিত হইতে হইয়াছে। সীমাহীন শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধান করিয়া দেশকে আবার গণতান্ত্রিক শাসনকাঠামোতে ফিরাইয়া আনিবার প্রশ্নে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে আজ নূতন করিয়া মাথা ঘামাইতে হইতেছে, প্রকৃত প্রস্তাবে হিমশিমই খাইতে হইতেছে।
নিয়তির অমোঘ বিধান খন্ডাইবার নয়। তাই, সেদিনের সে ক্ষমতাদর্পী শাসকের দল আজ আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত। জাতীয় জীবনে তাঁহাদের যা-কিছু ব্যবস্থাপত্র ছিল, সবই আজ এক-এক করিয়া বর্জিত। অধুনা ইয়াহিয়া সরকার ডিকেডি শাসকদের বিপ্লব দিবস উদ্যাপনের ব্যবস্থাপত্রটিও বাতিল করিয়া দিয়াছেন। সারা জাতি যে দিবসটিকে মনেপ্রাণে ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ বলিয়া বিশ্বাস করিয়া আসিয়াছে, তবু ডান্ডার শাসনের মুখে সব আকুতি চাপা দিয়া ফি বছর সেই আইয়ুবীয় ‘বিপ্লব দিবসের’ ফরমাবরদারি করিতে বাধ্য হইয়াছে, সে দিবস উদ্যাপনের হাত হইতে জাতিকে রেহাই দিয়া ইয়াহিয়া সরকার দেশবাসীর একটি চাপা মনোবাঞ্ছাই পূরণ করিলেন। আজ হইতে ২৭শে অক্টোবর এদেশের মানুষের কাছে আর বিপ্লব দিবস হিসাবে নয়, গণতন্ত্র হত্যা দিবস হিসাবেই অভিহিত হইতে থাকিবে।
বিগত সরকারের অবিবেকী শাসনের জের হিসাবে সারা জাতিকে আজ যখন শাসনতান্ত্রিক সমস্যার প্রশ্নে মাথা ঘামাইতে হইতেছে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ও দেশের রাজনৈতিক দলসমূহ যখন এই প্রশ্নে স্ব স্ব চিন্তাধারা অনুযায়ী মত ও পথ নির্দেশনায় রত ঠিক তখনই দেশের সামগ্রিক চিন্তাধারাকে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার একটি সুসংগঠিত প্রচেষ্টাদৃষ্টে দেশের শুভবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষমাত্রেই উদ্বিগ্ন না হইয়া পারে না। প্রস্তাবিত শিক্ষানীতির উপর সরকার সর্বমহলের মতামত চাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজের আয়োজিত আলোচনাসভায় একটি দুঃখজনক ঘটনার মধ্য দিয়া একটি ছাত্রের মৃত্যু হওয়ায় প্রদেশবাসীমাত্রেই ব্যথিত। ছাত্রটির এই দুঃখজনক মৃত্যুকে কেন্দ্র করিয়া একটি মামলাও রুজু হইয়াছে। দেশে সরকার আছেন, আইনও আছে। আইনের বিচারে এই মৃত্যুর জন্য কেহ অপরাধী সাব্যস্ত হইলে আইন অনুযায়ী তাহার দ-ও হইবে। আমরা গভীর দুঃখের সহিত লক্ষ করিতেছি যে, ছাত্রসমাজের শোভন সুন্দর বোধোদয় সত্ত্বেও কেহ কেহ এই দুঃখজনক ঘটনার সুযোগ গ্রহণ করিয়া রাজনৈতিক মতলব হাসিলের জন্য তৎপর হইয়া উঠিয়াছেন। অবশ্য এ তৎপরতা তাহাদের নতুন নয়। ইসলামি আদর্শে বিশ্বাসী এ দেশের সরলপ্রাণ মানুষকে বিপথে পরিচালিত করার প্রচেষ্টা ও ধর্মের নামে জিগির তোলার ঘটনা এদেশে নতুন নয়। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠাকালে যাহারা কংগ্রেসের সহিত হাত মিলাইয়া আদা জল খাইয়া পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করিয়াছেন, উত্তরকালে এদেশের মাটিতে তাহাদিগকে ইসলামের নামে জিগির তুলিয়া কম অনর্থ ঘটাইতে দেখা যায় নাই। ইসলামের ন্যায়বিচার ও সাম্যনীতির বাস্তব রূপায়ণের মাধ্যমে বিশ্বের বুকে পাকিস্তানকে একটি আদর্শ রাষ্ট্র হিসাবে উপস্থাপিত করাই যেখানে দেশের প্রত্যেকটি মুসলমানের কর্তব্য হওয়া উচিত ছিল, সেখানে ইসলামের দোহাই দিয়া এদেশেরই একশ্রেণির আলেম প্রকাশ্য ফতোয়া জারি করিয়া ১৯৫৩ সালে পাঞ্জাবের বুকে কী অঘটন ঘটাইয়াছিলেন তাহা কাহারও অজানা নহে। অদৃষ্টের নির্মম পরিহাস এই যে, একদিন যিনি বা যাঁহারা ধর্মের নামে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার বিরোধিতা করিয়াছিলেন, উত্তরকালে তাহারাই আবার পাকিস্তানে আসিয়া সেই ধর্মেরই নামে ফতোয়া দিয়া পাকিস্তানের পাক মাটিকে দশ হাজার আহমদিয়া মুসলমানের রক্তে রঞ্জিত করিয়াছিলেন। অবিভক্ত ভারতে ধর্মের কারণে মুসলমানগণকে দাঙ্গায় প্রাণ দিতে হইয়াছে। নিজস্ব আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার পর স্বদেশেও আবার যদি মুসলমানের হাতে মুসলমানদেরই এইভাবে প্রাণ দিতে হয়, তাহা হইলে দুঃখ রাখার স্থান কোথায়? অথচ ’৫৩ সালে এই পাকিস্তানের বুকে আমরা দশ সহস্র স্বধর্মীকেই স্বধর্মীর হাতে নিহত হইতে দেখিয়াছি। তাহাও আবার ইসলামেরই নামে। ধর্মের নামে এবং বিবিধ কান্ডকারখানার দ্বারা বিশ্বের দরবারে শান্তির ধর্ম ইসলামের কী চেহারা তাহারা তুলিয়া ধরিতে চান? শান্তি, সাম্য, মৈত্রী ও ন্যায়বিচারের বাণী বহন করিয়া যে ইসলাম দুনিয়ার বুকে কায়েম হইয়াছিল, সামাজিক অনাচার, মানুষে মানুষে ভেদবৈষম্যের প্রশ্নে নীরব থাকিয়া সেই ইসলামের নামেই সমাজের বুকে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও মানুষে মানুষে হানাহানির যারা উসকানি দেন বা কারণ ঘটান, তারা কোন ইসলামের সেবক? রাজনৈতিক উদ্দেশ্য বা অভিসন্ধি চরিতার্থ করিতে ধর্মের বিকৃত ব্যাখ্যা বা অপব্যবহার সত্যিকারের কোনো ইসলামদরদি প্রশ্রয় দিতে পারে বলিয়া আমরা জানি না। বহু ফেরকায় বিভক্ত মুসলিম-সমাজে ইসলামের ব্যাখ্যার প্রশ্নে আলেমরাও একমত নহেন। এমতাবস্থায় কথায় কথায় ধর্মকে টানিয়া আনিয়া সমস্যার সমাধান সম্ভব নহে। অতীতে পবিত্র কোরানের নামে একশ্রেণির আলেমকে ইংরাজি পড়াকে হারাম ঘোষণা করত মুসলমানদের গন্ডমূর্খে পরিণত করিয়া ‘কাঠ কাটা, পানি টানার’ জাতিতে যেমন পরিণত করিতে দেখিয়াছি, তেমনি আবার আরেক শ্রেণির আলেম ও আরবি শিক্ষায় শিক্ষিত মনীষীদের ইংরাজি পড়ার দিকে আকৃষ্ট করিয়া অধঃপতিত মুসলমান সমাজকে আমরা আগাইয়া লইতেও দেখিয়াছি। অতীতে পাকিস্তানের যে শাসক সম্প্রদায় গণদাবিকে দাবাইয়া রাখিতে চাহিয়াছে, সেই শাসকগোষ্ঠীকেও একশ্রেণির আলেম কোরান ও হাদিসের নামে সমর্থনও জোগাইয়াছিলেন।
এই অবস্থার আলোকে বিচার করিলে আমরা কী পাই? সরকারি শিক্ষানীতির প্রশ্নে যে অবস্থাতেই হোক একটি দুঃখজনক ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। তজ্জন্য সারা দেশ আজ ব্যথিত, লজ্জিতও বটে। আইনের নিয়মের আইনেই তাহার বিচার হইবে। ছাত্রসমাজের এই ব্যাপারটিতে ছাত্রসমাজও যেখানে আজ শুভবুদ্ধির আবেদন লইয়া দেশবাসীর দরবারে হাজির হইয়াছে, সেক্ষেত্রে ধর্মের নামে একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উক্ত ঘটনাটিকে কেন্দ্র করিয়া দেশকে আজ কোন পথে লইয়া যাইতে চান? একদিকে ঘটনা বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে অপরাধীর ফাঁসির দাবিতে সরকারের নিকট আর্জি পেশ, আবার পরক্ষণে ‘যাহারা পাকিস্তানে ইসলামি জীবন-পদ্ধতি প্রতিষ্ঠার প্রয়াসী, তাহারা কখনও সরকারের উপর নির্ভর করেন নাই এবং করিবেনও না’ বলিয়া প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়া তাহারা কী বোঝাইতে চাহিয়াছেন?
মওলানা কওসর নিয়াজির ভাষায় বলিতে গেলে ‘এইসব রাজনীতিক-মওলানা একজন যুবকের মৃত্যুকে রাজনৈতিক চালে পরিণত করিয়া শান্তি স্থাপনের চেষ্টার পরিবর্তে অগ্নিতেই ইন্ধন জোগাইতেছেন’। দেশে ঘৃণা ও বিদ্বেষ সৃষ্টি, অথবা শান্তিভঙ্গের উসকানির প্রশ্নে ক্ষমতাসীন সামরিক সরকারের যে নীতি, তাহার আলোকে অবস্থাটি বিচার করিবার জন্য আমরা সরকারের প্রতি আবেদন জানানো প্রয়োজন মনে করিতেছি।
আমরা আগেও বলিয়াছি, এখনও বলি, কোনো ধর্মান্ধ জিগির বা ‘ইজমে’র নামে বাড়াবাড়ি এদেশের মানুষ চাহে না। ইসলাম বা ইসলামের আদর্শের প্রতি কোনো পক্ষের কটাক্ষ যেমন এদেশের মানুষ বরদাশত করিবে না, তেমনি ইসলামের নাম কলঙ্কিত হয়, এমন উগ্র আচার-আচরণেরও তাহারা বিরোধিতা করিবে ইসলামেরই স্বার্থে।
পরিশেষে এদেশের প্রকৃত ইসলামদরদি আলেম সম্প্রদায় ও আপামর জনসাধারণের উদ্দেশে আমাদের বক্তব্য, ইসলামের সত্যিকার আবেদনের প্রতি খেয়াল রাখিয়া মতলবি রাজনীতিক আলেমদের দুরভিসন্ধিমূলক প্রচারণার মুখোশ উন্মোচন করুন। স্মরণ রাখিতে হইবে, জাতীয় জীবনের বর্তমান ক্রান্তিকালে শাসনতান্ত্রিক সমস্যার সমাধানের জন্য গভীর অভিনিবেশ সহকারে চিন্তাভাবনার যে প্রয়োজন, তজ্জন্য দেশে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখা অপরিহার্য। দেশের অমুসলিম জনসংখ্যার কথা বাদ দিলেও পাকিস্তানের বৃহত্তর স্বার্থে-বিশেষ করিয়া দুনিয়ার সঙ্গে তাল মিলাইয়া চলিবার জন্য ধর্মীয়, না ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা জাতির জন্য সর্বাপেক্ষা কল্যাণকর হইবে, তাহার মীমাংসা একাডেমিক পর্যায়েই হইতে পারে-রাজনীতির পাকচক্রে জড়িত করিলে সমস্যা সমাধানের পরিবর্তে কেবল অনর্থেরই সৃষ্টি হইবে, এ কথা কাহারও বিস্মৃত হইলে চলিবে না। ‘২৭শে অক্টোবর’-এর সেই কৃষ্ণ দিনটি যদি জাতির ভাগ্যে না আসিত, তাহা হইলে আজিকার এই অবস্থার উদ্ভবই হইত না।
লেখক: সিরাজুদ্দীন হোসেন আগস্ট ২৩, ১৯৬৯
