পালাবদলে স্বেচ্ছাবন্দি সালাউদ্দিন

আপডেট : ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০২:০৭ এএম

৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকেই স্বেচ্ছায় গৃহবন্দি হয়ে আছেন বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন। হাসিনা ও তার পরিবারের ঘনিষ্ঠজন সালাউদ্দিনের বিরুদ্ধে সম্প্রতি মতিঝিল থানায় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়াকে হত্যা চেষ্টার মামলা হয়েছে। তাছাড়া ফুটবলের বিভিন্ন পর্যায় থেকে তার পদত্যাগের দাবিতে চলছে আন্দোলন। এ অবস্থায় বাফুফে সভাপতি ঘরে বসেই ফুটবল পরিচালনার কাজ সারছেন। এমনকি খেলোয়াড়রা পর্যন্ত তার বাসায় গিয়ে দেখা করে আসছেন। আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা থাকায় সালাউদ্দিনের মতো বাফুফের আরও অনেক কর্মকর্তা এড়িয়ে চলছেন মতিঝিলের বাফুফে ভবন। তাই নির্বাহী কমিটির সভাও সালাউদ্দিন করেছেন ভার্চুয়ালি।

২০০৮ সালে প্রথমবারের মতো বাফুফের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন সালাউদ্দিন। সে বছরই দেশের ক্ষমতায় আসে শেখ হাসিনা নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের বড় ছেলে, আবাহনী ক্রীড়াচক্রের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি শেখ কামালের বন্ধু পরিচয়ে সালাউদ্দিন আরও বেশি ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন এর পর থেকে। প্রথম মেয়াদে ঢাকার ফুটবলকে নিয়মিত করে বাহবা কুড়িয়েছিলেন তিনি। তবে এর পর থেকে শুরু হয় সালাউদ্দিনের উল্টোরথে যাত্রা। তার কাছে গুরুত্ব হারায় ফুটবলের সত্যিকারের উন্নতি। বরং বাফুফের সভাপতি পদ টিকিয়ে রেখে তিনি গড়ে তোলেন এক অনিয়মের রাজত্ব। নির্বাহী কমিটির নির্বাচিতদের তোয়াক্কা না করে বেতনভুক্ত সাধারণ সম্পাদক আবু নাঈম সোহাগকে দিয়ে তিনি পরিচালনা করাতে থাকেন ফুটবল প্রশাসন। ফুটবলকে এগিয়ে নেওয়া সভাপতির অগ্রাধিকার তালিকায় নেই, বুঝতে পেরে সোহাগ বাফুফেতে কায়েম করেন অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতির রাজত্ব। আর সালাউদ্দিন ব্যস্ত হয়ে পড়েন ‘কাছের মানুষ’ মাহফুজা আক্তার কিরণের উত্থানের সোপান তৈরিতে। কিরণকে তিনি পৌঁছে দেন ফিফা-এএফসির আঙিনায়। ছেলেদের ফুটবলকে অবহেলায় ঠেলে দিয়ে সালাউদ্দিন নারী ফুটবলে দেন জোর। বয়সভিত্তিক পর্যায়ে মেয়েদের সস্তা সব সাফল্য পুঁজি করে সালাউদ্দিন-কিরণ গং বারবার ছুটে গেছেন তৎকালীন সরকারপ্রধান শেখ হাসিনার কাছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাহবা কুড়িয়ে এনেছেন। পাশাপাশি নিজের নানা ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন রাষ্ট্রযন্ত্রকে।

শেখ হাসিনার ১৫ বছরের ক্ষমতার পতন ঘটার পর থেকেই কোণঠাসা হয়ে পড়েন সালাউদ্দিন। ফুটবল অঙ্গনে জোরেশোরে ওঠে তার পদত্যাগের দাবি। সাবেক খেলোয়াড়, কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সমর্থকগোষ্ঠীও নানা কর্মসূচির মাধ্যমে সালাউদ্দিনের পতন চেয়ে আসছে। অনেকেই বাফুফে ভবনের সামনে মানববন্ধন, অবস্থান ধর্মঘট, মিছিল করছেন। একটা সময় নিয়মিত বাফুফে ভবনে অফিস করা সালাউদ্দিন তাই ৫ আগস্টের পর থেকে আর সে মুখো হননি। নিজেকে বন্দি করে ফেলেন বারিধারা ডিওএইচএস-এর ভাড়া বাসায়। যদিও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন চতুর্থ মেয়াদপূর্তির আগে পদত্যাগ করবেন না সালাউদ্দিন। পাশাপাশি ২৬ অক্টোবর আসন্ন নির্বাচনে পঞ্চমবারের মতো সভাপতি পদে নির্বাচনেরও ঘোষণা দিয়েছেন সালাউদ্দিন! বাফুফে ভবনে না গেলেও মাঝেসাঝে প্রশাসনিক কর্তাদের বাসায় ডেকে সেরে নেন দাপ্তরিক কাজকর্ম। নির্বাহী কর্তারাও কখনো কখনো দেখা করে আসেন সভাপতির সঙ্গে। সালাউদ্দিনের মতো কিরণও বাফুফে ভবনে যান না এখন। বাফুফে ভবনের চতুর্থ তলায় মেয়েদের আবাসিক ক্যাম্পের ডাক-খোঁজ তিনি করছেন দূর থেকে।

১৬ বছরে ফুটবলকে খাদের কিনারে পৌঁছে দেওয়া, সারা দেশের ফুটবল ছড়িয়ে দিতে না পারার ব্যর্থতার কারণে পদত্যাগের চতুর্মুখী চাপ, পটপরিবর্তনের পর খালেদা জিয়ার বিপক্ষে মতিঝিল থানায় হত্যা মামলা, এ রকম নানা কারণে বাফুফে ভবনে আসা বন্ধ করার পাশাপাশি সালাউদ্দিন কূটনৈতিক পাড়ার ভাড়া বাসাকেই বেশি নিরাপদ মনে করছেন। আবার ঘরে বসেই ছক কষছেন আরও চার বছরের জন্য সভাপতির মসনদ আঁকড়ে রাখার। সেটা কতটা হবে তা সময়ই বলবে। তবে আগের দুই নির্বাচনের মতো রাষ্ট্রযন্ত্র-প্রশাসন ব্যবহার করে যে নির্বাচনে জেতার সুযোগ সালাউদ্দিনের নেই, সেটা বলে দেওয়াই যায়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত