বিজয় মিছিল দেখে সবার জন্য মিষ্টি নিয়ে বাসায় আসবেন বলে বের হন শামচু মোল্লা (৫৯)। শামচু মিষ্টি নিয়ে বাসায় ফিরতে পারেননি। তবে তিনি বাসায় ফিরেছেন লাশ হয়ে। শহরের কোতোয়ালি থানার সামনে গুলিতে নিহত হয় সে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনে ফরিদপুরের একমাত্র নিহত শামচু মোল্লা। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে হারিয়ে দুই মেয়ে নিয়ে কীভাবে সংসার চালাবেন এ দুশ্চিন্তায় পড়েছেন শামচুর স্ত্রী মেঘলা বেগম।
ফরিদপুর শহরের পূর্বখাবাসপুর মহল্লার বাসিন্দা ছিলেন শামচু মোল্লা। পেশায় ছিলেন পরিবহনের চালক। দুই মেয়ে জুই (১২), শাম্মী (৬) এবং স্ত্রী মেঘলা বেগমকে নিয়ে ৩ শতাংশ জমির ওপর একটি আধাপাকা ঘরে বসবাস করতে তিনি। বাসচালক হিসেবে যা আয় করতেন তা দিয়েই কোনোরকম দিন কেটে যেত তাদের।
এর আগে ৫ আগস্ট বিকেলে পরিবারের সবাইকে নিয়ে টেলিভিশনে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের খবর দেখছিলেন শামচু। হঠাৎ শুনতে পান চারিদিক থেকে আনন্দ মিছিল আসছে। এরপর শামচু মোল্লা আনন্দ মিছিল দেখতে বাসা থেকে বের হন।
স্থানীয়রা জানান, সরকার পতনের দিন বিকেলে শামচুু বিজয় মিছিল দেখতে বাসা থেকে বের হয়। বিকেলে কোতোয়ালি থানায় হামলা চালায় দুর্বৃত্তরা। তখন পুলিশ আত্মরক্ষার্থে টিয়ারশেল নিক্ষেপ ও গুলি চালায়। এ সময় একটি গুলি শামচুর নাক ও ঠোঁটের মধ্য দিয়ে ঢুকে মাথার পেছন দিয়ে বের হয়ে যায়। দীর্ঘক্ষণ শামচুর লাশটি বাদামপট্টির সামনে পড়ে ছিল। পুলিশ চলে যাওয়ার পর স্থানীয়রা শামচুকে উদ্ধার করে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শামচু নিহত হওয়ার পর পরিবারটি পড়েছে চরম অর্থ সংকটে। আশপাশের মানুষ তাদের খাবার দিয়ে সহযোগিতা করছে। কিন্তু তাদের সংসার চালানোর নেই কোনো অর্থ। কষ্টের মধ্যে পড়লেও মুখ ফুঁটে কাউকে কিছুই বলতে পারছেন না।
শামচু মোল্লার বড় মেয়ে জুঁই কান্নাজড়িত কণ্ঠে জানান, তার বাবা যাওয়ার সময় বলে যান মিছিল দেখে বিজয়ের মিষ্টি নিয়ে আসবে। বাবা ঠিকই এলেন তবে মিষ্টি নিয়ে নয়, লাশ হয়ে। আমার বাবাকে যারা মেরেছে তাদের বিচার চাই।
শামচুর স্ত্রী মেঘলা কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘আমার সবকিছু শেষ হয়ে গেল, এখন আমি কী নিয়ে বাঁচব। আমার দুটি মেয়েকে এখন কে দেখবে, কীভাবে তাদের মুখে দু-মুঠো ভাত তুলে দেব। আমি তো এখন সবকিছু অন্ধকার দেখছি।
তিনি আরও বলেন, বড় মেয়ে সপ্তম শ্রেণিতে এবং ছোট মেয়ে প্রথম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছে। যেখানে সংসার চালানো মতো কোনো ব্যবস্থা নেই, সেখানে মেয়েদের কীভাবে লেখাপড়া করাব।
স্থানীয় বাসিন্দা কিবরিয়া স্বপন জানান, শামচু মোল্লা বাস চালিয়ে যা আয় করতেন তা দিয়েই সংসার চালানোর পাশাপাশি দুই মেয়েকে পড়ালেখা করাতেন। তিনি সব সময় বলতেন মেয়ে দুজন পড়ালেখা করে বড় হয়ে তাদের দুঃখ ঘোচাবে। কিন্তু শামচুর সেই স্বপ্ন এখন ফিকে হওয়ার পথে। দুটি নাবালিকা মেয়ের পড়ালেখাসহ পরিবারটিকে বাঁচাতে বিত্তবান ও সরকারের সহযোগিতা কামনা করেন তিনি।
