দেশে আবার লোডশেডিং বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে তো বটেই, খোদ ঢাকা শহরের অনেক জায়গাতে চলতি সপ্তাহে লম্বা সময়ের লোডশেডিং দেখা গেছে। পল্লীবিদ্যুৎ এলাকায় চাহিদার চেয়ে ৩০-৪০ শতাংশ কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে। এ সবের ফলে কলকারখানায় উৎপাদন কমে গেছে, ব্যবসায় ক্ষতি হচ্ছে, ভোগান্তি বেড়েছে সাধারণ মানুষের। আওয়ামী লীগের আমলে বিপুল লুটপাটের মধ্যে অন্যতম ছিল বিদ্যুৎক্ষেত্র। অভিযোগ আছে, রাজনৈতিক ও আর্থিক ফায়দা হাসিলের জন্য নির্দিষ্ট কিছু গ্রুপকে বাড়তি সুবিধা দিয়ে লাখো-কোটি ডলার মুনাফার সুযোগ দিয়েছিল বিগত সরকার। নতুন সরকার আসার পর এসব প্রতিষ্ঠান অবস্থার সুযোগ নিচ্ছে বলেই প্রতীয়মান হয়।
দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, প্রায় সাড়ে তিন মাস ধরে সামিটের তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল বন্ধের কারণে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় প্রতিদিন গড়ে ১২০০ মেগাওয়াটের মতো কম বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। অন্যদিকে বকেয়ার কারণে ভারতের আদানি গ্রুপ প্রায় ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ কমিয়েছে। এর সঙ্গে কারিগরি কারণে বড়পুকুরিয়া কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যাওয়া এবং মাতারবাড়ী ও এস আলমের বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় দেশে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়েছে কয়েক দিন ধরে।
ভারতীয় গণমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের উদ্ধৃতি দিয়ে সে দেশের ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের ঝাড়খ-ের গড্ডা কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ ক্রয় বাবদ আদানির কাছে বাংলাদেশের বকেয়া ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ডলার হয়েছে। এ পরিস্থিতিকে আদানি গোষ্ঠী ‘টেকসই নয়’ বলে বর্ণনা করেছে। জ্বালানি উপদেষ্টা ফাওজুল কবির খান ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসকে বলেছেন, আদানি বাংলাদেশের কাছে ৮০ কোটি ডলার পায়, তার মধ্যে ৪৯ কোটি ২০ লাখ ডলার পরিশোধ বিলম্বিত হয়েছে।
আদানির পাশাপাশি দেশের অন্যান্য বিদ্যুৎকেন্দ্রেরও বিপুল পরিমাণ অর্থ পাওনা রয়েছে সরকারের কাছে। তবে দেশীয় ওইসব কেন্দ্রের মালিকরা উৎপাদন কমিয়েছে বলে কোনো তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকে দেশে যে ডলার সংকট তৈরি হয়েছে, সে কারণেই মূলত দীর্ঘদিনের বকেয়া জমতে জমতে এখন তা বড় ধরনের বোঝায় পরিণত হয়েছে বলে বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। অন্যদিকে, কারিগরি ত্রুটির কারণে সামিটের এলএনজি টার্মিনালটি গত ২৭ মে থেকে বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে এক্সিলারেটের টার্মিনালের মাধ্যমে সরবরাহ করা হচ্ছে ৫৯ কোটি ঘনফুট গ্যাস। এর ফলে গ্যাস সরবরাহ নেমে এসেছে ২৬০ কোটি ঘনফুটে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রতিদিন ২৩০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা থাকলেও সরবরাহ হচ্ছে ৮৫ কোটি ঘনফুটের নিচে। সামিটের টার্মিনাল বন্ধের আগে ১২০ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত সরবরাহ করা হয়েছিল।
এলএনজি সরবরাহ করতে না পারার কারণে সামিটের আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হলেও চুক্তির শর্ত অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ না করেও তাদের ঠিকই ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হবে সরকারকে। এতে সরকারের যেমন আর্থিক ক্ষতি, অন্যদিকে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতির বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়াও, কারিগরি ত্রুটির কারণে দিনাজপুরের পার্বতীপুরে বড়পুকুরিয়া ৫২৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের তৃতীয় ইউনিটটি চালু হওয়ার চার দিন পর ফের বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে।
বিগত সরকারের সময় লোডশেডিংয়ের সমস্যা দূর করার নামে হরিলুট হয়েছে। রেন্টাল-কুইক রেন্টালের মাধ্যমে মেগা দুর্নীতির কারণে হাজার হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে। জনগণের টাকা গেছে একশ্রেণির দুর্বৃত্তের পকেটে। এমন পরিস্থিতির জন্য যারা দায়ী, তাদের কঠোর শাস্তির মুখোমুখি করা দরকার। তদন্ত কমিটি করে দ্রুততার ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদনে এর কারণ এবং উদ্দেশ্য জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। সন্দেহ নেই, এর পেছনে বিগত সরকারের অসম চুক্তিগুলোর দায় আছে। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব দ্রুত অসম চুক্তি বাতিল করে দেশের ও জনগণের কল্যাণে নতুন ধরনের চুক্তি করা, বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন করার ব্যবস্থা করা।
