কবি শামসুর রাহমানের ‘তোমাকে পাওয়ার জন্যে, হে স্বাধীনতা’ কবিতাটি ঘুরিয়ে ‘তোমাকে পাওয়ার জন্য, হে সিট’ যদি বলি তাহলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বোধহয় ভুল হবে না। কেননা, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলের একটি সিটের কাছেই জিম্মি ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সব স্বপ্ন। নামমাত্র প্রশাসন থাকলেও হলের নিয়ন্ত্রণ ছিল ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের হাতে। হলে কে থাকবে, না থাকবে তা ঠিক করতেন নেতারাই। তাদের নিয়মকানুন ছিল, বিচারের ব্যবস্থাও ছিল। সে নিয়মের বাইরে গেলেই নির্যাতনের শিকার হতেন শিক্ষার্থীরা। তবে এবার সে দিন কাটছে, আবাসিক হলে ফিরছে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। উচ্ছেদ হচ্ছে টর্চার সেলখ্যাত ‘গেস্টরুম’ এবং শিক্ষার্থীদের মানবেতর জীবন কাটানোর গণরুম।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ক্যাম্পাসে যে দখলদারিত্ব আর ক্ষমতা চর্চার ছাত্ররাজনীতি চালু ছিল, এর অন্যতম লাইফলাইন ছিল সিট পলিটিকস। ছাত্রনেতারা হলে সিট বরাদ্দ নিয়ন্ত্রণ করতেন, ফলে সাধারণ ছাত্রদের নিজস্ব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিয়ে যেতে পারতেন। হলে থাকতে দেওয়ার বিনিময়ে ছাত্রনেতারা কোনো ধরনের জবাবদিহি এবং বিচারের সম্মুখীন না হয়েই সাধারণ ছাত্রদের শারীরিক নির্যাতন করতে পারতেন। ফলে কেউ তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে না গেলে বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী হলে নির্মম নির্যাতনের শিকার হতো।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৮টি হলের মধ্যে ৫টি মেয়েদের, ১৩টি ছেলেদের। মেয়েদের হলগুলোতে প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণ থাকলেও ছেলেদের হলগুলোর নিয়ন্ত্রণ কার্যত ছিল ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠনের হাতে। জেলা, উপজেলা ও গ্রাম থেকে আসা বহু সীমিত আয়ের পরিবারের সন্তানদের পক্ষে ঢাকায় বাসা ভাড়া করে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া ছিল কঠিন। সে সুযোগটাই নিতেন ছাত্রনেতারা। তাদের হাত ধরে হলে ওঠার সুযোগ পাওয়ার পর তার স্থান হয় গণরুমে। গণরুমে প্রথম বর্ষের অনেক শিক্ষার্থীকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়। কোনো কোনো গণরুমে এককক্ষে ৪০ থেকে ৫০ জন শিক্ষার্থী থাকেন। এরপর শিক্ষার্থীদের বাধ্যতামূলক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশ নিতে হতো। এর ব্যত্যয় ঘটলেই নির্যাতন এবং হল থেকে বের হয়ে যেতে হতো। একটি সিটের জন্যই এসব সহ্য করতে হতো শিক্ষার্থীদের। ফলে যে স্বপ্ন নিয়ে একজন শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতো, সে স্বপ্ন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে যেত।
এটি শুধু আওয়ামী লীগ সরকারের টানা তিন মেয়াদের চিত্র নয়, বিএনপি ক্ষমতায় থাকার সময়ও ঘটত একই ঘটনা। তবে আওয়ামী সরকারের আমলে নির্যাতনের সীমা ছাড়িয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, বিগত আওয়ামী সরকারের আমলে তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হাতে কয়েক হাজার শিক্ষার্থী নির্যাতনের শিকার হয়েছে। কেউ হারিয়েছে হাত, কেউ পা, কেউবা চোখ। এ ছাড়া নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। অনেকে নির্যাতন সইতে না পেরে হল ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ফাইয়াজ মুরসালিন। ছাত্রলীগের নিয়ম মেনে সিটে না ওঠায় তাকে শুধু হলেই ছাড়তে হয়নি, ছাত্রলীগ সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের নির্দেশে দুই মাসের বেশি সময় ধরে মিথ্যা মামলায় জেলও খাটতে হয়েছে। এ ছাড়া মিথ্যা অভিযোগে তাকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকেও সাময়িক বহিষ্কার করতে বাধ্য করেন ছাত্রলীগের এই নেতা। সম্প্রতি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের আগে ঘটে এ ঘটনা।
এ বিষয়ে ফাইয়াজ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি যেখানে ছিলামই না, সেখানের একটা মামলায় আমাকে জড়িয়ে দেওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নোটিস পেয়ে আমি জানতে পারি এ ঘটনায় আমি জড়িত এবং আমার নামে মামলা হয়েছে। পরে খবর নিয়ে জানতে পারি হলের সিট সমস্যাকে কেন্দ্র করে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাধারণ শেখ ইনান আমাকে এ মামলায় ঢুকিয়ে দিয়েছেন। মামলার বাদী আমাকে নির্দোষ দাবি করলেও আমাকে জেল খাটতে হয়েছে তার প্রভাবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। আমার শিক্ষাজীবন এখনো হুমকির মুখে। একটি বছর ইতিমধ্যে হারিয়ে ফেলেছি।’
শুধু ফাইয়াজ নয়, এমন অসংখ্য শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের অন্যায় অত্যাচারের শিকার হয়েছে। প্রত্যেক হলেই ছিল টর্চার সেল। মতের অমিল হলেই শিবির ট্যাগসহ নানান ট্যাগ দিয়ে নির্যাতন করা হতো। ২০২০ সালে ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা শিবির তকমা দিয়ে বুয়েটের আবরার স্টাইলে চারজন মেধাবী ছাত্রকে হলের গেস্টরুমে রাতভর পিটিয়ে রক্তাক্ত করেছেন। অথচ হলের আবাসিক শিক্ষক ও হল প্রশাসন নীরব দর্শকের মতোই সে নির্যাতনের পৈশাচিক দৃশ্য দেখেছেন। তারপর তাদের থানা পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হলে পুলিশ নির্যাতিত ছাত্রদের হাসপাতালে নেয়। এ ধরনের অসংখ্য ঘটনা ঘটলেও বিচার হতো না।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্বধর্ম ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী সৌরভ বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আকাশসমান স্বপ্ন নিয়ে ভর্তি হলেও তা প্রায় কবরস্থ হয়েছিল গণরুমে থাকার ফলে। নিজের স্বাধীনতা বিক্রি করে দিয়ে পড়াশোনা বাদ দিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের প্রটোকল দিতে হতো শুধু হলে একটু জায়গা পেতে। আমি গণরুমে দুই বছর ধরে থেকেছি। আমার জন্য যতটুকু জায়গা বরাদ্দ ছিল, তা একজন কয়েদির জন্য বরাদ্দকৃত জায়গার চেয়েও কম। হলে থাকতে হলে আগে ছাত্রলীগ, তারপর ছাত্র হতে হতো।’
তবে গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর বিশ্ববিদ্যালয়ের এই পরিবেশে সুবাতাস বইছে। নবনিযুক্ত উপাচার্য দায়িত্ব গ্রহণ করার পর আবাসিক হলগুলোতে ফিরেছে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ। হলের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রভোস্টরাই বণ্টন করছেন সিট। গত সোমবার প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির এক সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক হলে গণরুম বিলুপ্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে কবি জসীমউদদীন হল এবং বিজয় একাত্তর হলে গণরুম বিলুপ্ত হয়েছে। হলগুলোতে প্রথম বর্ষ থেকেই মেধার ভিত্তিতে সিট বণ্টনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কোনো ধরনের গেস্টরুম প্রথাও চলবে না বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এমন কার্যকর সিদ্ধান্তে খুশির আমেজ বইছে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের মধ্যে। সাবেক শিক্ষার্থীরাও বলছেন, ঠিক এমন ক্যাম্পাসেই তারা দেখতে চেয়েছিলেন। বিজয় একাত্তর হলের মাস্টার্সের শিক্ষার্থী নাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর থেকেই আমরা এমন পরিবেশ প্রত্যাশা করেছিলাম। কিন্তু আমাদের এ স্বপ্ন জিম্মি ছিল এতদিন। দেরিতে হলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের স্বপ্নপূরণ করেছে। হল দখল, মারামারি আর নির্যাতনের কালচার যেন আর ফিরে না আসে।’
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভোস্ট স্ট্যান্ডিং কমিটির আহ্বায়ক ও সলিমুল্লাহ মুসলিম হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ বিশ্ববিদ্যালয় মূলত শিক্ষার্থীদের জন্য। তাদের জন্য যা যা দরকার আমরা সবই করব। ইতিমধ্যে হলগুলোতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ফিরেছে। সিট নিয়ে আর কোনো ধরনের রাজনীতি হবে না। প্রাথমিকভাবে আমাদের হলে রাজনীতি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। গণরুম গেস্টরুম প্রথা আর থাকবে না এ ক্যাম্পাসে। শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ ফিরিয়ে দিতে আমরা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমেদ খান বলেন, ‘আমরা চেষ্টা করছি বিশ্ববিদ্যালয়টাকে শিক্ষার্থীবান্ধব হিসেবে গড়ে তুলতে। শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় সব সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে। হলগুলোতে স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরতে শুরু করেছে। শিক্ষার্থীরা নিজেদের অধিকার ফিরে পাচ্ছে। সব ধরনের গণরুম বিলুপ্ত করা হয়েছে। হলে কোনো পক্ষের কোনো আধিপত্য থাকবে না আর। খুব দ্রুত আমরা অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমও শুরু করব।’
