গণতন্ত্র প্রসারে সামাজিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতা

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৪৯ এএম

বিশ শতকে গণতন্ত্রের জোয়ার বয়ে গিয়েছিল বিশ্ব ব্যবস্থায়। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা ছিল উন্নয়ন মডেলের একটি মৌলিক উপাদান। এর মধ্যেই জনগণের প্রকৃত মৌলিক অধিকারের বিষয়টি খোঁজা হয়েছিল। ফলে দেশে দেশে শুরু হয় গণতন্ত্রের জয়জয়কার। তবে একুশ শতকে গণতন্ত্রের বিপরীতে কর্র্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থাকে একটি উন্নয়ন মডেল হিসেবে দাঁড় করানোর চেষ্টা করা হলেও, তা বিশে^র বিভিন্ন দেশে হোঁচট খাচ্ছে। স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির আগে সামরিক শাসন ছিল বিশ্বরাজনীতিতে একটি অনিবার্য বাস্তবতা। এরপর সামরিক হস্তক্ষেপের প্রবণতা অনেকটা কমে গেলেও তা একেবারে নিঃশেষ হয়নি। এখনো আফ্রো-এশিয়ার অনেক দেশেই সামরিক শাসনের উপস্থিতি দেখা যায়। যদিও সামরিক বাহিনীর প্রভাব স্নায়ুযুদ্ধকালীন থেকে দুর্বল হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।

নিজেকে নিয়ে ব্যস্ত থাকলে সমাজের পরিবর্তন আসবে না। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে পিছিয়ে পড়া মানুষের দিকে। সামাজিক মূল্যবোধই পারে সমাজের রূপ বদলে দিতে। কয়েক মাস আগেই ফ্রান্সের আগাম নির্বাচনে অতি ডানপন্থিরা পার্লামেন্ট নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পথে ছিল। যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্পবাদী বিচারকরা ভালোয় ভালোয় সাবেক প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের আইনি সমস্যাগুলোর সমাধান করছিলেন এবং টিভি বিতর্কে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের বিপর্যয়কর পরাজয়ের পর ট্রাম্প জয়ের একেবারে দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছেন বলে মনে হচ্ছিল। অন্যদিকে যুক্তরাজ্যে উদারপন্থি দল লেবার পার্টি যখন সরকার গড়ছিল, তখন সেখানে অভিবাসনবিরোধী আন্দোলন ও ব্রেক্সিট আন্দোলনের নেতা নাইজেল ফারাজের নতুন একটি দল অভূতপূর্ব ফল করেছে। এসব দেখে বৈশ্বিক রাজনীতিবিষয়ক পণ্ডিতেরা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, প্রচলিত ও প্রতিষ্ঠিত ধারা ও মূল্যবোধকে চ্যালেঞ্জ করে এমন জনতুষ্টিবাদী ক্রোধের একটি ঢেউ বিশ্বব্যাপী গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে আছড়ে পড়ছে। বর্তমানে জনতুষ্টিবাদী ঢেউয়ের প্রমাণ এখন যা আছে, তাকে যৎসামান্য বলা যায়। সাম্প্রতিক অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, এ ধরনের শক্তিকে মোকাবিলার জন্য কার্যকর কৌশলও আছে। গত কয়েক মাসের অভিজ্ঞতা থেকে আমরা যা জানতে পারছি, তা থেকে পাওয়া শিক্ষাটি স্বতঃসিদ্ধ সত্যের মতো প্রতিভাত হচ্ছে। সেটি হলো গণতন্ত্রকে মূল্য দিয়ে থাকে, এমন সব দলকে গণতন্ত্রবিরোধী হুমকি মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ফ্রান্সে আমরা এমনটিই ঘটতে দেখেছি, যা অনেক পণ্ডিতকে অবাক করে দিয়েছে। সেই স্মৃতিকে পুনরুজ্জীবিত করে ফ্রান্সে সম্প্রতি বামপন্থি দলগুলো এক হয়ে নিউ পপুলার ফ্রন্ট নামের একটি জোট গঠন করেছে।

সবচেয়ে বড় কথা, নিউ পপুলার ফ্রন্ট কেবল গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতিই জোর দেয়নি, তারা বারবার অতি ডানপন্থিদের ব্যবসাবান্ধব পরিকল্পনাকেও জনগণের কাছে ব্যাখ্যা করে দেখিয়েছে, ন্যাশনাল র‌্যালি যেভাবে নিজেদের শ্রমিকবান্ধব বলে প্রচার করে থাকে, আসলে তারা তা নয়। দক্ষিণপন্থিদের মোকাবিলায় গণতন্ত্রপন্থিদের আশাবহ অগ্রগতিমূলক দ্বিতীয় পাঠটি আমরা পাচ্ছি যুক্তরাষ্ট্র থেকে। সেখানে ডেমোক্রেটিক পার্টির নতুন প্রার্থী যে এতটা উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দ বয়ে নিয়ে আসবেন তা খুব কম লোকই প্রত্যাশা করেছিল। কমলা হ্যারিস নিজেকে পরিবর্তনের প্রতিনিধি হিসেবে এতটা বিচক্ষণতার সঙ্গে উপস্থাপন করেছেন যে, সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, এমনকি বর্তমান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের ভাবমূর্তিও তার ঔজ্জ্বল্যের সামনে ম্লান হতে শুরু করেছে। ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে কমলার মিনেসোটার গভর্নর টিম ওয়ালজকে বেছে নেওয়াকে ট্রাম্পের ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে জেডি ভ্যান্সকে বেছে নেওয়াকে মোকাবিলা করার অংশ বলে মনে হচ্ছে। কারণ, ট্রাম্পের একসময়ের কড়া সমালোচক জেডি ভ্যান্সকে ট্রাম্পের রানিংমেট করাটা যেমন অপ্রত্যাশিত ছিল, টিম ওয়ালজকে কমলা হ্যারিসের রানিংমেট করাটাও তেমনি অবিশ্বাস্য ছিল। এটি দেখে মনে হচ্ছে, অবশেষে রিপাবলিকানদের কৌশল মোকাবিলায় ডেমোক্র্যাটরা অধিকতর কৌশলী হয়ে উঠেছে। জনতুষ্টিবাদীরা এই ধারণা প্রতিষ্ঠিত করতে চায় যে, সাধারণ মানুষ খারাপ অভিজাত এবং বিপজ্জনক বহিরাগতদের কারণে হুমকির মুখে আছেন। এভাবে তারা আগে থেকেই অরক্ষিত অবস্থায় থাকা সংখ্যালঘুদের মূলধারার জনগোষ্ঠীর জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখাতে থাকে। উগ্র ডানপন্থি জনতুষ্টিবাদীরা নীরব সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে কথা বলার দাবি করলেও প্রকৃতপক্ষে তারা উচ্চকিত সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব করে। এতে দোষের কিছু নেই; অনেক প্রগতিশীল আন্দোলনের শুরুটা এভাবেই হয়েছিল। কিন্তু যে আন্দোলনগুলো সংখ্যাগরিষ্ঠের পক্ষে কথা বলার ভান করে এবং এর মধ্য দিয়ে অন্য সবাইকে অপমান করে, তা শেষ পর্যন্ত গণতন্ত্রের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

জনতুষ্টিবাদবিরোধীদের মনে রাখা দরকার, সংখ্যাগরিষ্ঠরা আসলে উগ্র ডানপন্থি জনতাবাদী শক্তিকে সমর্থন করে না। যুক্তরাজ্যের নতুন লেবার সরকারের ক্ষমতা নেওয়ার প্রথম কয়েক সপ্তাহ এই অভিনব অন্তর্দৃষ্টিকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছে। দেশটি এক দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে নীরব দাঙ্গার সম্মুখীন হয়েছে, কারণ ডানপন্থিদের ছড়ানো বিভ্রান্তি বর্ণবাদী সহিংসতাকে উসকে দিয়েছে। জার্মানিতে জনতুষ্টিবাদবিরোধী বিক্ষোভকারীদের  স্লোগান দিন দিন জোরালো হচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের প্রসারের জন্য একটি ইতিবাচক দিক। যুক্তরাষ্ট্রে এই প্রবণতা সঞ্চারিত হচ্ছে, সেটিও একটি আশার কথা। এখনকার সভ্যতার বিকশিত সময় ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অগ্রগতির যুগেও মনুষ্য সমাজে সহিংসতা, রক্তপাত, হানাহানি, বিদ্বেষ, প্রতিহিংসাপরায়ণতা আর উন্মাদনার যে চিত্র প্রায় নিত্য ফুটে উঠছে, এতে মানবতা আজ বিপন্ন। পৃথিবীতে মানুষের যা কিছু উদ্যোগ-উদ্যম, সবকিছুই শান্তিতে বেঁচে থাকার লক্ষ্যকে ঘিরে আবর্তিত হয়। পৃথিবী সুখময় না দুঃখময় এ নিয়ে তাত্ত্বিক বিতর্ক হতে পারে।  কিন্তু এ কথা সন্দেহাতীতভাবে প্রতিষ্ঠিত যে, বিশ্বে নিরাপদে বেঁচে থাকার সাধনাতেই মানুষ নিজেকে ব্যস্ত রাখে। করোনা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা কতটা মানবিকতা ধারণ করতে পারছি। কতটা অন্যের স্বার্থরক্ষা করতে পারছি। তবে হতাশ হলে চলবে না। চিরকালের মানবিক মূল্যবোধ ও নীতিনৈতিকতার দিকে তাকাতে হবে। এখনো মানুষের মধ্যে মানবিকতা রয়েছে। প্রয়োজন শুধু তা জাগিয়ে তোলা।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত