শ্রীলঙ্কার নির্বাচন, বেহাত বিপ্লবের পরের কথা

অনন্যা উইপুলাসেনা ও হান্না এলিস-পিটারসেন

আপডেট : ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৫৫ এএম

মাত্র দুবছর আগে, শ্রীলঙ্কা আশা-নিরাশার দোলাচলে ছিল। ভারত মহাসাগরীয় দ্বীপরাষ্ট্রটি, যার মাত্র দুই কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যা-ইতিহাসের ভয়াবহতম অর্থনৈতিক দুর্বিপাকের অংশ হিসেবে ক্ষুধায় দিন কাটানোর পাশাপাশি ওষুধ সংকট আর কর্মহীনতার মধ্যে পড়ে। আবার উল্টো দিকে আশার প্রদীপটিও জ্বলজ্বল করছিল। তরুণ-যুবাদের ‘আরাগালায়া (সংগ্রাম)’-এর মধ্য দিয়ে কর্র্তৃত্ববাদী প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে ও তার প্রভাবশালী পারিবারিক শাসন উৎখাত হয়। পরিবারটি দুর্নীতিপূর্ণ নীতি ও চুক্তির মাধ্যমে দেশকে দেউলিয়া বানিয়ে ফেলে। প্রতিবাদের ঢেউ আছড়ে পড়ে রাজাপাকসের প্রেসিডেন্টের প্রাসাদে। বিক্ষুব্ধ লোকজন প্রাসাদের বিছানায় উঠে পড়ে, সুইমিং পুলে সাঁতার কাটে এবং ব্যায়ামকক্ষে পর্যন্ত ঢুকে পড়ে।

রাজাপাকসে পরিবারের পতনের পর শ্রীলঙ্কায় প্রথমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হচ্ছে। অনেকে বলছেন, অর্থনৈতিক সংকটে দুর্বিষহ জীবনের ধারাবাহিকতা চলছে। অনেকের ভাষ্য, আরাগালায়ার আশার বাণী ধূসর হয়ে পড়েছে। ২৬ বছরের গৃহযুদ্ধ পার করে আসা দেশটি নৃতাত্ত্বিকভাবে বিভক্ত এবং দ্বীপরাষ্ট্রটির অতীত নির্বাচনগুলো সবসময়ই যুদ্ধ, বর্ণ ও ধর্ম দ্বারা প্রভাবিত। দেশটির ক্ষমতা কাঠামো ও সম্পদের ওপর কর্র্তৃত্ব সিংহলীয় বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদীদের। আর সংখ্যালঘু তামিল জনগোষ্ঠী নিপীড়িত এবং রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা।

নির্বাচনটির প্রচার-প্রচারণা অর্থনৈতিক কর্মসূচিকে সামনে রেখে হয়েছে। রাজধানী কলম্বোর শহরতলীতে বন্ধ খাবারের দোকানের সামনে ৪২ বছর বয়সী সিলাভাথি নোনা বলেন, তার পরিবার বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করে যাচ্ছে এবং তার দুই শিশুর খাবারের সংস্থানের জন্য ক্ষুদ্রঋণের ওপর নির্ভর করতে হয়। দিনের শেষে তার নিজের উপার্জিত অর্থ ঋণ শোধ করতে ব্যয় করতে হয়, আর এতে বাড়িতে নেওয়ার মতো কোনো অর্থই আর হাতে থাকে না। এই নারীর ভাষ্য, ‘আরাগালায়া আন্দোলন ততটা সফল হয়নি। তারা শুধু রাজাপাকসেকে সরিয়ে দেওয়ার কাজটি করেছে। এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবসা নেই এবং সবই ব্যয়বহুল।’

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইতিহাসে এই প্রথম প্রথাগত রাজনীতির প্রতি মানুষের অসন্তোষ দেখা যাচ্ছে, যার প্রভাবে শনিবারের নির্বাচনে একক কোনো প্রার্থীর ব্যাপক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়াার সম্ভাবনা নেই। সম্মুখসমরে লড়াইরত তিন প্রার্থীর প্রভাব বেশি দেখা যাচ্ছে। এর মধ্যে একজন ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহে, যিনি রাজাপাকসে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর আসেন। অন্যতম আরও দুজন হলেন আইনসভার বিরোধী নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা এবং আরেকজন বামপন্থি জোটের প্রার্থী অরুণা কুমারা দিশানায়েকে, যিনি ক্রমে ক্রমে জনপ্রিয়তার ভিত তৈরি করেছেন। বেসরকারি সংস্থা ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ পরামর্শক অ্যালান কেনান বলেন, ‘যে জিতবে তাকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে। শিগগিরই ভালো কিছুর সম্ভাবনা নেই। শক্তিশালী সমর্থন ছাড়া ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্টকে জটিল পরিস্থিতির মুখে পড়তে হবে।’

ছয়বারের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বিক্রমাসিংহে দুবছর প্রেসিডেন্টের দায়িত্বকালে নিজেকে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার মুখ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তিনি আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকে ২৯০ কোটি বেইলআউট কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা করেছেন। এখন বৈদেশিক মুদ্রার মজুদ স্থিতিশীল করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছেন। পেট্রোল স্টেশনের বাইরে দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে না। আমদানির প্রধান প্রধান খাত সমৃদ্ধ হয়েছে। এর মধ্যে গত দুই বছরে দরিদ্রতা দ্বিগুণ হয়েছে, যার প্রভাব পড়েছে দেশের ২৫ শতাংশ মানুষের ওপর। বিক্রমাসিংহের অজনপ্রিয় নীতিকে এর জন্য দায়ী করা হচ্ছে এবং দেশের দরিদ্রতম মানুষকে সবচেয়ে বেশি আঘাত করেছে তার শাসনের নীতিগুলো। অনেকে উচ্চ করসহ আইএমএফের ঋণের কঠিন শর্তের সমালোচনা করছেন।

কেনান বলেন, ‘এখন যা অবস্থা তার ওপর দাঁড়িয়ে সর্বোত্তম চিত্রটি কল্পনা করলেও দেখা যাবে, শ্রীলঙ্কা স্পষ্টত আইএমএফের চাওয়া অনুযায়ী সবই করে কঠোর নীতি গ্রহণ থেকে শুরু করে কাঠামোগত সংস্কার, সবই। কিন্তু এরপরও নাগরিকরা ব্যাপক চাপের মধ্যে থাকবে। ফলে একটি অনিশ্চিত পরিস্থিতি থেকেই যাবে।’

আরাগালায়া শুরু হওয়ার পর পরিবর্তনের ডাক আসছিল। দশকের পর দশক ধরে শ্রীলঙ্কা যে পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির আবর্তে ঘুরপাক খাচ্ছিল, তা থেকে নিষ্কৃতি চাইছিল মানুষ। অনেকে মনে করেন, বিক্রমাসিংহে হলেন সেই ব্যক্তি, যিনি রাজাপাকসে পরিবারের পুরনো ও চতুর একজন রক্ষাকর্তা। একজন অনির্বাচিত রাষ্ট্রপ্রধান, যার জনপ্রিয়তাও নেই, আবার আইনসভার সমর্থনও পক্ষে নেই। তিনি কার্যভার সামলানোর জন্য পুরোপুরি রাজাপাকসের দলের সমর্থনের ওপর নির্ভর করেন। বিক্রমাসিংহের প্রশাসন রাজাপাকসেদের কাউকেই তদন্তের আওতায় আনেননি। অথচ তাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের মতো গুরুতর অভিযোগ ছিল। পরিবর্তন যতটুকু দেখা যাচ্ছে তা হলো গোতাবায়া রাজাপাকসের ভাইপো নামাল রাজাপাকসে, যার বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে, নির্বাচনে প্রার্থী হয়েছেন।

৭২ বছর বয়সী এক নাগরিক আথথাটাগে লালিথা বলেন, ‘অতি আকাক্সিক্ষত রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল দেখা যাবে এই নির্বাচনে। আমরা ব্যবস্থার মধ্যে একটি বদল দেখার জন্য মুখিয়ে রয়েছি। কিন্তু আমরা কীভাবে বাঁচতে পারি? জিনিসপত্রের দাম আকাশচুম্বী।’ তিনি সাজিথ প্রেমাদাসার সমর্থক। সাজিথ পাঁচ বছর বিরোধী নেতার দায়িত্ব পালনকালে নিজেকে দরিদ্রে শ্রেণির মানুষের নেতা হিসেবে তুলে ধরেছেন। জনবান্ধব কর্মসূচি সামনে নিয়ে রাজনীতি করেছেন। লালিথা নামের এই বয়ঃবৃদ্ধ নারী মনে করেন, ‘অন্তত তিনি (সাজিথ) গরিবের কথা ভাবেন।’

বামপন্থি নেতা দিশানায়েকে মার্কসবাদী ‘ন্যশানাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি)’ জোটের প্রার্থী। তার দল ২০১৯ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে মাত্র ৩ শতাংশ ভোট পায়। কিন্তু এবার তারা তৃণমূল থেকে ব্যাপক সমর্থন পাবে বলে মনে করা হচ্ছে। তার প্রচারণায় বিপুল মানুষের উপস্থিতি দেখা গিয়েছে। দেশের সম্পদ লুটপাটকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ, পদ্ধতি আমূল পরিবর্তন ও দুর্নীতির রাশ টেনে ধরার কথা বলছেন তিনি। তিনি আরাগালায়ার মূল আবেদনের ওপর জোর দিচ্ছেন।

এনপিপির নির্বাহী কমিটির সদস্য চতুরাঙ্গা আবিসিংহে বলেন, ২০২২ সালের অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে জাগরণ ঘটেছে। এনপিপি একমাত্র দল, যারা আরাগালায়ার চেতনা ও দাবিকে সবচেয়ে ভালোভাবে ধারণ করেছে। আবিসিংহে আরও বলেন, দেশে গত কয়েক দশকে প্রতিনিয়ত যে সরকারগুলো এসেছে তারা বারবার প্রতিশ্রুতির অপব্যবহার করেছে। পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতি নিয়ে মানুষ বিরক্ত। দেশের সম্পদ কোথায় গেছে, তারা তা জানতে চায়। তারা একটি উন্নততর অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি চায়। আমাদের দলই শুধু এই দাবিনামা নিয়ে কথা বলছে।’

এনপিপির এই নেতা জানান, তারা ক্ষমতায় এলে অতীতের নেতাদের জবাবদিহিতার আওতায় আনবে। রাজাপাকসেসহ দুর্নীতির অভিযোগে বিদ্ধ সবাইকে আইনের আওতায় আনা হবে। অনেকে অবশ্য দিশানায়েকের দলের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়ে শঙ্কিতও হচ্ছেন। দলটি আশির দশকে রক্তাক্ত সশস্ত্র লড়াই চালিয়েছিল। দলটির মার্কসবাদী গেরিলা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে অনেকেই ভাবছেন। এ নিয়ে আবিসিংহে বলেন, ‘দলের অভ্যন্তরে নানা বিবর্তন ঘটেছে এবং এটি যেকোনো সংঘাত-সহিংসতা থেকে দূরে থাকছে। গত ৩০ বছরে দলের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই। মানুষ জানে, আমরা বদলে গেছি। আমরা প্রগতিশীল গণতন্ত্রের কথা বলছি।’

আরাগালায়ায় দুবছর আগে যেসব দাবিগুলো উচ্চারিত হচ্ছিল, সেসব এই নির্বাচনে গুরুত্ব পাচ্ছে কিনা; তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। আন্দোলনের কথা এলেই জাতিগত পুনর্মিলন ও তামিল সংখ্যালঘুদের প্রতিনিধিত্ব নিয়ে আলোচনা সামনে আসছে। মানুষ মনে করছে, খুব কম লোকই তাদের সন্দেহ-উদ্বেগ লাঘব করতে পারে।

আন্দোলনকর্মী চানু নিমাশা বলেন, এই আন্দোলনের ফল এরই মধ্যে বেহাত হয়েছে। ক্ষমতা ও প্রভাবলিপ্সু রাজনৈতিক দলগুলোই এই ফল ছিনিয়ে নিয়েছে। আরাগালায়া তার যথেষ্ট ফল ঘরে তুলতে পারেনি। গোতাবায়াকে যখন মানুষ বাড়ি পাঠিয়েছিল, তারা নিজেদের শক্তি বুঝতে পেরেছিল। কিন্তু যা ঘটছে তা মানুষ আগে প্রত্যাশা করেনি। সংকট এখন নতুন দিক খুঁজে পেয়েছে এবং অর্থনৈতিক দুর্দশা নতুন রূপ লাভ করেছে।

গার্ডিয়ান অনলাইন থেকে ভাষান্তর মুজাহিদ অনীক

লেখক: অনন্যা উইপুলাসেনা : শ্রীলঙ্কাভিত্তিক আন্তর্জাতিক সাংবাদিক; হান্না এলিস-পিটারসেন : গার্ডিয়ানের দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক প্রতিনিধি

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত