গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটে নিট শিল্পনগরী নারায়ণগঞ্জে তৈরি পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। কোনো কোনো স্থানে উৎপাদন ৬০ থেকে ৭০ ভাগ পর্যন্ত কমেছে। মালিকরা বলছেন, বায়ারদের নির্ধারিত সময়ে শিপমেন্ট করতে না পেরে আর্থিকভাবে তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ নিয়েও রয়েছেন বিপাকে। লোডশেডিংয়ের কারণে কাজের পরিধি কমে গেছে।
কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর নারায়ণগঞ্জ উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, নারায়ণগঞ্জ জেলায় গার্মেন্টস রয়েছে ১ হাজার ১৫১টি। স্পিনিং অ্যান্ড কটন মিল রয়েছে ২১টি। টেক্সটাইল রয়েছে ৪৩৮টি। ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং কারখানা রয়েছে ১১৬টি। অ্যাক্সেসরিজ তৈরির কারখানা রয়েছে ১২০টি।
জেলায় সব ধরনের কারখানার সংখ্যা ৪ হাজার ২২১টি। এ ছাড়া হোসিয়ারি ২ হাজার ৪৮০টি, টেক্সটাইল ৩০টি, নিটিং ৫৬টিসহ সর্বমোট ২ হাজার ৭২১টি অরেজিস্ট্রিকৃত কারখানা রয়েছে। যার মধ্যে নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার ফতুল্লাতেই রয়েছে সবচেয়ে বেশি গার্মেন্ট কারখানা।
ফতুল্লার হাজীগঞ্জের আনোয়ারা গ্রুপের সুইং বিভাগের সুপারভাইজার রফিকুল ইসলাম জানান, গ্যাসের ব্যবহার বেশি হচ্ছে ডাইংয়ে। গার্মেন্টে বিদ্যুতের ব্যবহার বেশি। বর্তমানে গ্যাস বিদ্যুতের সংকটের কারণে আমাদের উৎপাদন যেমন ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি অর্ডারও কমে যাচ্ছে। বর্তমানে লোডশেডিংয়ের কারণে আমাদের কাজের পরিধিও কমে গেছে। আগে আমরা ওভারটাইম করতে পারতাম। শ্রমিকদের আয়ও আগের তুলনায় কমেছে। কিন্তু এখন শুধুমাত্র বেসিকেই কাজ করতে হচ্ছে। এক্সট্রা কোনো আয় হচ্ছে না।
মডেল গ্রুপের শ্রমিক বিপ্লব হোসেন বলেন, আগে আমাদের যে আয়টা হতো সেটা গ্যাস বিদ্যুতের প্রবলেমের কারণে অনেক কমে গেছে। আগে দৈনিক ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হতো, এখন সেটা ৩০০ থেকে ৪০০ টাকায় নেমে এসেছে।
গার্মেন্টস শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র নারায়ণগঞ্জ জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক ইকবাল হোসেন বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার চেষ্টা করলে এটা সমাধান করতে পারবে। বর্তমানে গার্মেন্ট শিল্পের পরিবেশ অশান্ত করতে আন্তর্জাতিক নানা ইন্ধন আছে। এগুলো মোকাবিলা করে এগোতে পারলে দেশ অনেক এগিয়ে যাবে।
ইউনিটি নিট কম্পোজিটের জিএম (ডাইং) রাজীব আহাম্মেদ বলেন, কখনো কখনো এমন অবস্থা দাঁড়ায়, গ্যাস একেবারেই থাকে না, জিরো পিএসআই থাকে। তখন ডাইং ফিনিশিং কিছুই চলে না। শুধু গ্যাসই নয় বিদ্যুতের লোডশেডিংও মারাত্মক অবস্থা। এক ঘণ্টা থাকলে আরেক ঘণ্টা থাকে না। অনেক সময় দেখা যায় মেশিনে রঙ দেওয়া হয়েছে কিন্তু তখন যদি বিদ্যুৎ চলে যায় তাহলে মেশিন শাটডাউন হয়ে পুরো রঙটাই নষ্ট হয়ে যায়। তখন সেটা ঠিক করতে ডাবল কস্ট লাগে। গার্মেন্টগুলো কোনোরকম চললেও ডাইংগুলো গ্যাস বিদ্যুৎ না থাকলে চালানো অসম্ভব। এক্সপোর্ট সাধারণত একটা নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে করতে হয়। করতে না পারলে গার্মেন্টগুলো ডিসকাউন্ট খাচ্ছে। আমরা বেতন দিতে পারছি না। ওভারটাইম দিতে পারছি না।
তৈরি পোশাক মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, বর্তমানে গ্যাস বিদ্যুৎ নিয়ে চরম সংকটে রয়েছি। বিগত সরকারের আমলে যখন গ্যাসের দাম অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি করা হলো তখন কথা ছিল আমাদের আনইন্টারেপ্টেড পর্যাপ্ত গ্যাস দেবে। এজন্যই অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধি করা হয়েছিল। কিন্তু সত্য হলো আমরা বর্ধিত দামেও পর্যাপ্ত গ্যাস পাইনি। বর্তমানে কোনো কোনো এলাকায় তো গ্যাস একেবারেই পাওয়া যাচ্ছে না। লোডশেডিং বেড়ে যাওয়ার কারণেও আমরা অনেক সমস্যায় ভুগছি। গ্যাস বিদ্যুৎ সংকটের কারণে উৎপাদন ৫০ ভাগে নেমে এসেছে। কোনো কোনো স্থানে উৎপাদন ৬০ থেকে ৭০ ভাগ পর্যন্ত কমেছে।
মোহাম্মদ হাতেম আরও বলেন, আমরা যে কয়েকটা সমস্যা চিহ্নিত করেছি তার মধ্যে ১ নম্বর কারণ হচ্ছে গ্যাস বিদ্যুতের সংকট। এটা নিয়ে যদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কাজ করা যায় তাহলে হয়তো ইমিডিয়েট সমাধান পেতে পারি, যদিও এটা সমাধানে লং টার্ম সময় লাগবে। স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনে সরবরাহ করা হলে গ্যাস সংকটের সমাধান কিছুটা হতে পারে।
