৪ হাজার ২৬১ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় খুলনা-মোংলা রেলপথ। বিপুল অর্থ বিনিয়োগে গড়ে তোলা এই রেলপথে প্রতিদিন চলে মাত্র একটি ট্রেন। এতে রাষ্ট্রের অর্থের অপচয় হলেও মিলছে না প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা। অর্জিত হচ্ছে না প্রকল্পের উদ্দেশ্যও।
তবে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানোর ব্যাপারে খুলনা রেলস্টেশনের টিআই অংশুমান রায় চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাস্তবতা ও চাহিদা অনুযায়ী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো দরকার। সে বিবেচনায় নতুন আরেকটি ট্রেন চালুর প্রস্তাবনা ইতিমধ্যে রেল মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
প্রকল্প কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১০ সালের ২১ ডিসেম্বর জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়। জমি অধিগ্রহণ, রেললাইন, রেলসেতু নির্মাণসহ প্রকল্পের ব্যয় তখন ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। ২০১৫ সালে সংশোধিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে (ডিপিপি) ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ৮০১ কোটি ৬১ লাখ টাকা। ২০২১ সালে আবার সময় ও ব্যয় বাড়ানো হয়। তখন ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬০ কোটি ৮৮ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। পরে ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত সময় বাড়ানো হয়। সে মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ করা হয়। এই মেয়াদে কাজ সমাপ্ত হয়। তবে ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে এই রেলপথের কাজ শুরু হয়।
প্রকল্পের কাজের অংশ হিসেবে রূপসা নদীর ওপর ৫ দশমিক ১৩ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যরে রেলসেতু, ফুলতলা থেকে মোংলা পর্যন্ত ৬৪ কিলোমিটার রেলপথ হলেও স্টেশনগুলোর ডাবল লাইন হিসাব করে ৯১ কিলোমিটার রেলপথ, ৯টি প্ল্যাটফর্ম এবং ১০৭টি ছোট সেতু ও ৯টি আন্ডারপাস নির্মাণ এবং সিগন্যালিং ও টেলিকমিউনিকেশনের কাজ করা হয়।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি যৌথভাবে ভার্চুয়ালি খুলনা-মোংলা রেললাইন প্রকল্পের উদ্বোধন করেন। এর আগে ৩০ অক্টোবর ফুলতলা থেকে মোংলা পর্যন্ত পরীক্ষামূলকভাবে রেল চালানো হয়। উদ্বোধনের সাত মাস পর গত ১ জুন খুলনা-মোংলা পথে ‘মোংলা কমিউটার’ নামে একটি ট্রেন বাণিজ্যিকভাবে চলাচল শুরু হয়। প্রতি মঙ্গলবার বাদে সপ্তাহে ছয় দিন ট্রেনটি এ রুটে চলাচল করছে। এ ছাড়া নতুন আর কোনো ট্রেন চালু করা হয়নি।
খুলনার মোহাম্মদনগর স্টেশন সূত্রে জানা গেছে, ট্রেনটি সকাল ৬টা ১৫ মিনিটে খুলনা স্টেশন ছেড়ে বেনাপোল যায়। ৯টা ১৫ মিনিটে বেনাপোল ছেড়ে ১২টা ৩৫ মিনিটে মোংলা পৌঁছায়। দুপুর ১টায় মোংলা স্টেশন ছেড়ে বিকেল সাড়ে ৪টায় বেনাপোল এবং সন্ধ্যা সাড়ে ৭টায় খুলনা স্টেশনে ফেরত আসে।
ট্রেনটির নির্ধারিত ভাড়ার পরিমাণ খুলনার মোহাম্মদনগর স্টেশন থেকে বাগেরহাটের কাটাখালী স্টেশন পর্যন্ত ২০ টাকা, চুলকাঠি বাজার স্টেশন ২০া ও মোংলা স্টেশন ৩৫ টাকা ভাড়া। এ ছাড়া স্টেশনটি থেকে ফুলতলা ২০ টাকা, নওয়াপাড়া ২০, সিঙ্গিয়া ২৫, যশোর ৩০, ঝিকরগাছা ৪০, নাভারন ৪৫ এবং বেনাপোল স্টেশন পর্যন্ত ৫০ টাকা ভাড়া।
মোহাম্মদনগর স্টেশনে অপেক্ষমাণ আবু বক্কর, তৌফিক শেখসহ বেশ কিছু যাত্রী দেশ রূপান্তরকে জানান, ট্রেনে ভাড়া কম ও সময়ও কম লাগে, সেজন্য বাগেরহাট, মোংলা ও খুলনা থেকে অনেক মানুষ যশোর ও বেনাপোলে চাকরিসহ নিত্যকাজ ট্রেনে যেতে চাই। কিন্তু যাত্রীদের প্রয়োজনের সময় ট্রেন পাওয়া যায় না। সারা দিনে একটি মাত্র ট্রেন চলাচল করে। এজন্য যাত্রীর চাপ অনেক বেশি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। এ ছাড়া ট্রেনটি বেনাপোল পৌঁছায় বিকেল সাড়ে ৪টায়। সে কারণে ভারতের উদ্দেশে যাওয়া যাত্রীদের বেনাপোল ইমিগ্রেশনের নির্ধারিত সময়ে পৌঁছানো নিয়ে দুশ্চিন্তা কাজ করে। এসব কারণে ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো উচিত।
মেহাম্মদনগর স্টেশনের চিত্র তুলে ধরে খুলনা রেলস্টেশনের টিআই অংশুমান রায় চৌধুরী জানান, এ স্টেশন থেকেই দেড় শতাধিক যাত্রী প্রতিদিন ট্রেনে চলাচল করে। গত এক মাসে স্টেশনটি থেকে ১ লাখ ৩৭ হাজার টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। শুধুই এটি না, সব স্টেশনেই যাত্রী ও রাজস্ব আয় সন্তোষজনক। কিন্তু তীব্র জনবল সংকট। মাত্র ১৫ জন জনবল দিয়েই রুটটি চালাতে হচ্ছে। প্রয়োজনের থেকে চার গুণ বেশি জনবল।
জানতে চাইলে এ ব্যাপারে বৃহত্তর খুলনা উন্নয়ন সংগ্রাম সমন্বয় কমিটির সভাপতি শেখ আশরাফ উজ্জামান দেশ রূপান্তরকে বলেন, মালবাহী ট্রেন এখনো চালু হয়নি। মোংলা বন্দর থেকে মালামাল পরিবহনে ব্যবসায়ী ও ভারতও মালবাহী ট্রেন ব্যবহার করছে না। তা ছাড়া যাত্রীবাহী ট্রেনের সংখ্যাও বাড়ছে না। এ কারণে এটি লোকসানের প্রকল্পে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে এর সুফল নিয়েও শঙ্কা রয়েছে।
