রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের সম্মান

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:৫৬ এএম

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হচ্ছে রেমিট্যান্স। দেশের লাখ লাখ শ্রমজীবী মানুষ দুনিয়ার বেশিরভাগ দেশে কঠোর পরিশ্রম করে আয় করা অর্থের একটা বড় অংশ দেশে থাকা পরিবারগুলোকে পাঠায়। এই অর্থ বাংলাদেশের বিদেশি মুদ্রার অন্যতম প্রধান উৎস এবং তা বাংলাদেশের ব্যালান্স অব পেমেন্টের ঘাটতি দূর করে। দেশের অর্থনীতির টালমাটাল অবস্থা হলেও, শত দুর্নীতি আর লুটপাটেও একে টিকিয়ে রাখার বড় অবদান এই প্রবাসীদের। তবে আফসোসের ব্যাপার হচ্ছে, এসব প্রবাসী যথাযোগ্য সম্মান পান না। বাংলাদেশের বেশিরভাগ রেমিট্যান্স পাঠানো শ্রমিকরাই অল্প শিক্ষিত। রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রায় কোনোরকম সাহায্য ও ট্রেনিং ছাড়া তারা পৃথিবীর নানা দেশে যান। শিক্ষা ও দক্ষতার অভাবে তাদের নিম্নমজুরিতে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়। কখনো কখনো সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন উৎস থেকে এসব মানুষের অবর্ণনীয় কষ্টকর জীবনের কথা জানা যায়। তথাপি তারা তাদের আয়ের একটা অংশ নিয়মিত দেশে পাঠান। নানা সময়ে তাদের ‘রেমিট্যান্সযোদ্ধা’ জাতীয় গালভরা উপাধিতে ভূষিত করলেও এসব মানুষ দেশে ও বিদেশে সম্মান পান না। সম্ভবত, শিক্ষার অভাব ও আর্থিক শ্রেণিতে নিচের দিকে থাকার কারণেই সরকারি কার্যালয় কিংবা বিমানবন্দরে এসব রেমিট্যান্সযোদ্ধা উল্টো অবজ্ঞার স্বীকার হন। বিভিন্ন সময় এই বিষয়ে লেখালেখি করা হলেও অবস্থার পরিবর্তন ঘটেনি। এ দেশে শিক্ষিত দুর্নীতিবাজদের ভিআইপি সম্মান দিলেও তা মেলেনি দেশের অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখা যোদ্ধাদের ক্ষেত্রে। তবে আশার কথা হচ্ছে, অন্তর্র্বর্তী সরকার এই অবস্থার পরিবর্তন করবে বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বিমানবন্দরে রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের ভিআইপি সেবা দেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল। দেশ রূপান্তরের এক প্রতিবেদনে জানা গেছে, মঙ্গলবার প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয়ে ব্রিফিংকালে ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘এরই মধ্যে দেশের বিমানবন্দরে সেবার মান উন্নত করা হয়েছে। আমরা আরেকটি সেবা, যেটা চালু করতে যাচ্ছি।  রেমিট্যান্সযোদ্ধারা দেশে এলে বিমানবন্দরে ভিআইপি সেবা পাবেন। একজন ভিআইপি এয়ারপোর্টে যেসব সুবিধা পান, লাউঞ্জ ব্যবহার ছাড়া আমরা তাদের সব সুবিধা দেব।’

মধ্যপ্রাচ্যেই বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শ্রমিকদের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বিমানবন্দরে এ শ্রমিকদেরই সবচেয়ে বেশি সহায়তার প্রয়োজন হয়। নানা ধরনের অসুবিধার মুখোমুখি হওয়া এ শ্রমিকদের সবার আগে সুবিধা দেওয়ার কথা জানিয়েছেন উপদেষ্টা। জানিয়েছেন, যেভাবে একজন ভিআইপি এয়ারপোর্টে যান তখন তার লাগেজ নিয়ে একজন যেমন সঙ্গে থাকেন, চেকইন করার সময়ও সঙ্গে একজন থাকেন, ইমিগ্রেশন করার সময়ও পাশে একজন থাকেন তেমনি বাংলাদেশ থেকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়া শ্রমিকদেরও একই রকম সুবিধা দিতে চান তারা। আগামী দুই সপ্তাহ থেকে এক মাসের মধ্যেই তা বাস্তবায়ন করা হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। তবে একই সঙ্গে এও জানিয়েছেন, আপাতত লাউঞ্জ ব্যবহারের বিষয়টি ভাবছেন না। রেমিট্যান্সযোদ্ধারা কোন গেট দিয়ে প্রবেশ করবেন, চেকইন কীভাবে করবেন, ফরম পূরণ করা লাগলে কীভাবে করবেন, ইমিগ্রেশনে কোনো কাগজ চাইলে কীভাবে করবেন এসব কাজে নিয়োজিত থাকবে বিমানবন্দরের প্রবাসী কল্যাণ ডেস্ক। প্রয়োজন হলে এই ডেস্কের জন্য আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে প্রশিক্ষণ দিয়ে নতুন লোক নিয়োগ করা হবে বলে আশ্বাস দিয়েছেন আসিফ নজরুল। একজন প্রবাসী যেন কোনো অবস্থায়ই এয়ারপোর্টে হয়রানির শিকার না হন, অপমান বোধ না করেন এ ব্যাপারে জিরো টলারেন্স থাকবে বলেও তিনি জানান।

গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে থাকা একজন উপদেষ্টার এ ধরনের আশ্বাস খুবই আশাপ্রদ। অতীতেও আমরা এমন আশ্বাস শুনলেও শেষ পর্যন্ত তা আর কার্যে পরিণত হতে দেখিনি। অর্থনীতিতে অসাধারণ ভূমিকা রাখা মানুষদের সম্মান দেওয়া, যথাযথ সাহায্য করা রাষ্ট্রের প্রাথমিক দায়িত্ব। এসব দায়িত্ব পালন না করলে রাষ্ট্রের কার্যকারিতা থাকে না। বছরের পর বছর রাষ্ট্র এসব দায়িত্ব অবহেলা করে আসছে। রেমিট্যান্সযোদ্ধাদের সম্মান দেওয়ার ব্যাপারে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পরিবেশ গড়ে ওঠেনি। বিমানবন্দরে প্রবাসী শ্রমিকদের যথাযথ সম্মান দেওয়ার প্রথম ধাপ মাত্র। আশা করা যায়, এবারের প্রতিশ্রুতি দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। আশা করি, এই রেমিট্যান্সযোদ্ধারা তাদের উপযুক্ত সম্মান পাবেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত