‘ইসলামিক আমল’ থেকে হিজবুল্লাহ

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ০১:৫৭ এএম

লেবাননের সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর সঙ্গে ভয়াবহ সংঘাত চলছে ইসরায়েলের। ইরানের কাছ থেকে সহায়তা পাওয়া সশস্ত্র গোষ্ঠীটি লেবাননের ক্ষমতার উল্লেখযোগ্য অংশের নিয়ন্ত্রণ করে। প্রায় দুই দশক ধরে ইসরায়েলের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হিজবুল্লাহ। ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের আগ্রাসনের প্রতিবাদে হামাসের সমর্থনে দীর্ঘদিন ধরেই তেল আবিবের বিরুদ্ধে লড়ছে গোষ্ঠীটি। তবে দুপক্ষের চলমান সাম্প্রতিক সংঘাত অতীতের সবকিছুকে ছাপিয়ে গিয়েছে। হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের ব্যবহৃত পেজার ও ওয়াকিটকিতে একযোগে বিস্ফোরণের পর গোষ্ঠীটির দেড় হাজারের বেশি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল। প্রত্যুত্তরে ইসরায়েলের অভ্যন্তরে সামরিক স্থাপনাসহ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে হিজবুল্লাহও। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতি পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকদের মতে, এমন পাল্টাপাল্টি হামলা অঞ্চলটিতে সর্বাত্মক যুদ্ধ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে।

ইসরায়েলের তুলনায় সামরিক শক্তি কম থাকলেও, হিজবুল্লাহর রয়েছে দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের ইতিহাস। লেবাননে ইসরায়েলের দখলদারিত্বের মুখে গত শতাব্দীর আশির দশকের শুরুতে আত্মপ্রকাশ করে সংগঠনটি। তবে এর আদর্শিক বীজবপন হয় ষাট ও সত্তরের দশকে লেবাননে শিয়া ইসলামিক পুনর্জাগরণের সময়ে। ১৯৮২ সালে ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায় দক্ষিণ লেবাননে পাল্টা আক্রমণ চালায় ইসরায়েল। সে সময় লেবাননের প্রভাবশালী রাজনৈতিক দল আমল মুভমেন্ট থেকে বেরিয়ে আসা একটি অংশ ‘ইসলামিক আমল’ নামে নতুন একটি সংগঠনের যাত্রা শুরু করে। এই অংশটি সশস্ত্র লড়াইয়ে বেশি আগ্রহী ছিল। নতুন সংগঠনটি ইরানের রেভল্যুশনারি গার্ডের কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য সামরিক ও সাংগঠনিক সহায়তা পায়। ফলে তারা সবচেয়ে কার্যকরী শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। ১৯৮৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের উপস্থিতি জানান দেয় হিজবুল্লাহ। ইসরায়েলের সামরিক বাহিনী ও তার মিত্র দক্ষিণ লেবানন আর্মির ওপর হামলা চালায়। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য বিদেশি শক্তিও তাদের আক্রমণের লক্ষ্যে পরিণত হয়। লেবাননে গৃহযুদ্ধের অবসান এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য ১৯৮৯ সালে তায়েফ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি অনুযায়ী সশস্ত্র সংগঠনগুলোর নিরস্ত্রীকরণের প্রশ্ন ওঠে। তবে সেসব বাধা প্রতিহত করে হিজবুল্লাহ তাদের সামরিক শাখাকে ‘ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স’ নাম দিয়ে কার্যক্রম জারি রাখে। ইসরায়েলের দখলদারিত্বের অবসান ঘটানোর জন্য লড়াই চালানোর প্রতিশ্রুতির কারণে গোষ্ঠীটির যোদ্ধারা অস্ত্রশস্ত্র সমর্পণ না করে, নিজেদের কাছে রেখে দেওয়ার সুযোগ পান। তখন থেকে রাজনীতিতেও সক্রিয় হতে শুরু করে গোষ্ঠীটি। ১৯৯২ সালে দেশটির জাতীয় নির্বাচনে অংশও নেয়। এই শতাব্দীর শুরুতে লেবানন থেকে ইসরায়েলের সেনা প্রত্যাহারের কৃতিত্ব দেওয়া হয় হিজবুল্লাহকে।

একাধারে রাজনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক সংগঠন হিসেবে কার্যক্রম পরিচালনা করে হিজবুল্লাহ। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লেবাননের রাজনৈতিক ব্যবস্থারও গুরুত্বপূর্ণ কুশীলব হয়ে ওঠে হিজবুল্লাহ। এমনকি মন্ত্রিপরিষদে ভেটো দেওয়ার ক্ষমতাও বাগিয়ে নেয় গোষ্ঠীটি। কিছু ক্ষেত্রে লেবাননের সেনাবাহিনীর সক্ষমতাকেও ছাড়িয়ে যায় গোষ্ঠীটি। যার প্রমাণ মেলে ২০০৬ সালে পুনরায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধে। ইসরায়েলি লক্ষ্যবস্তুতে বোমা হামলা ও নাশকতার অভিযোগ আছে হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে। বিভিন্ন পশ্চিমা রাষ্ট্র, ইসরায়েল, আরব লীগ এবং আরব দেশগুলো তাদের ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ২০০৬ সালে সীমান্তের ওপারে হিজবুল্লাহ যোদ্ধাদের আক্রমণে আট ইসরায়েলি সেনা নিহত হয়। এর জবাবে দক্ষিণ লেবানন ও বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলে হিজবুল্লাহর শক্ত অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালায় ইসরায়েলি যুদ্ধবিমান। প্রত্যুত্তরে ইসরায়েল অভিমুখে চার হাজার রকেট ছোড়ে হিজবুল্লাহ। ৩৪ দিন ধরে চলা ওই সংঘাতে অন্তত ১ হাজার ১২৫ জন লেবাননির মৃত্যু হয়। আর ইসরায়েলে ১১৯ সেনাসদস্য এবং ৪৫ জন বেসামরিক ব্যক্তি নিহত হয়। তবে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পরও হিজবুল্লাহ টিকে যায় এবং পরে আরও শক্তিশালী হয়ে আবির্ভূত হয়। সেই থেকে নতুন নতুন যোদ্ধা সংগ্রহ ও অস্ত্রের উৎকর্ষ ঘটিয়ে সামর্থ্য বৃদ্ধি করে চলেছে তারা। এক সময় কঠোর ইসলামি আইন প্রবর্তনের চেষ্টা করলেও পরে নিজেদের দর্শনে বদল আনে হিজবুল্লাহ। দলটির শীর্ষ নেতার নানা সময়ে তাদের কার্যক্রমকে মুক্তি-সংগ্রামের লড়াই বলে দাবি করে আসছেন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত