বিমানবন্দর থেকে বের হয়ে টিম বাসে উঠছেন সাকিব আল হাসান, তখন জনাকয়েক স্থানীয় ক্রিকেট অনুরাগী ডেকে উঠলেন ‘সাকিব ভাই’। বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের ক্যামেরাগুলো জুম করছে সাকিবের বাম হাতের আঙুলে। বাসে জানালার ধারে বসে ফোনে কথা বলা সাকিবের আঙুলের দিকেই সবার নজর।
চেন্নাই টেস্টে সাকিবের বাজে বোলিং আর মুরালি কার্তিকের মন্তব্যের পর নির্বাচক হান্নান সরকারের ভাষ্যে সাকিবকে ৪৮ ঘণ্টার পর্যবেক্ষণে রাখার সিদ্ধান্ত জানানোর পর কানপুর টেস্টের আগে সাকিবের একাদশে থাকা নিয়ে তৈরি হয়েছে এক ধরনের অনিশ্চয়তা। তার ওপর মঙ্গলবার সাকিব আল হাসানকে প্যারামাউন্ট ইনস্যুরেন্স কোম্পানি লিমিটেডের শেয়ার লেনদেনে কারসাজির অভিযোগে ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করেছে বাংলাদেশের সিকিউরিটি অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় আদাবরে গার্মেন্টসকর্মী রুবেল হত্যাকা-ে সাকিবকে করা হয়েছে আসামি, এরপর পুঁজিবাজারের কেলেঙ্কারিতেও শাস্তি পাচ্ছেন। দলে রাখা নিয়েও লুকোচুরি। সব মিলিয়ে ভারতীয় সাংবাদিকদের কাছে সাকিবকে নিয়ে বাড়তি কৌতূহল, তাদের কাছে মনে হচ্ছে শেখ হাসিনা সরকারের সাংসদ থাকার কারণে ‘প্রতিশোধমূলক’ আচরণ হিসেবেই এসব ‘অন্যায়’ করা হচ্ছে সাকিবের সঙ্গে।
দিল্লিতে কর্মরত বাঙালি এক সাংবাদিক এসেছেন কানপুরে। সাকিবকে নিয়ে তার জিজ্ঞাসা, ‘তোমরা কি লোকটাকে ধরে জোর করে দল থেকে বের করে দেবে নাকি? এতদিন ধরে খেলছে, যখন তোমাদের মোস্তাফিজুর ছিল না, লিটন ছিল না তখন থেকে এই লোকটাই তো তোমাদের জিতিয়েছে, এখন তোমরা তাকে একটা টেস্ট খারাপ করেছে বলে বের করে দেবে?’ সাকিবের অবশ্য এখন পর্যন্ত চোটজনিত কারণে দল থেকে বাদ পড়ার কোনো কারণ নেই বলে জানিয়েছেন কোচ চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। দুবার দুই সাংবাদিক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে জানতে চেয়েছেন সাকিবের চোট নিয়ে। হাথুরুসিংহে উত্তর দিয়েছেন, ‘সাকিবের চোটের ব্যাপারে আমাদের ফিজিও বা দলের কেউ আমাকে কিছুই জানায়নি। সে একাদশে নির্বাচিত হওয়ার জন্য যোগ্য।’
উত্তর প্রদেশের সাংবাদিক বা স্থানীয় মানুষদের ভেতর সাকিব বা টেস্ট ম্যাচের চেয়ে বাংলাদেশি সাংবাদিকদের কাছে দেশের রাজনৈতিক অবস্থা জানতেই বেশি আগ্রহ। এক নিরাপত্তারক্ষী আলাপ করতে করতে জানালেন, তার বাড়ি হচ্ছে গাজিয়াবাদের হিন্দন অঞ্চলে, যেখানে ‘তোমাদের প্রধানমন্ত্রী’ লুকিয়ে আছে! বিনয়ের সঙ্গে জানালাম, তিনি এখন আর প্রধানমন্ত্রী নন। বাংলাদেশের এখন কী অবস্থা, অনেক মানুষ কি আসলেই মারা গেছে, এসব নিয়ে অনেকেই জানতে চেয়েছেন। তেমনি একজন ঠাট্টাচ্ছলে বলেছেন, টেস্ট ম্যাচে যদি ভিআইপি বক্সে শাড়ি পরা কোনো অতিথিকে দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে খবর রটে গেছে যে শেখ হাসিনা খেলা দেখতে চলে এসেছেন!
একজন সাংবাদিক জানতে চাইলেন সাকিবের কেন জরিমানা হলো। তাকে বিষয়টা বুঝিয়ে বলাতে তিনি বুঝলেন। সাকিব শেয়ারবাজারে একজন বিনিয়োগকারী, তিনি সেখানে কারসাজির মাধ্যমে শেয়ারের দাম বাড়িয়ে মুনাফা করেছেন। সে জন্য তাকে পুঁজিবাজার কর্র্তৃপক্ষ জরিমানা করেছে। এর সঙ্গে ক্রিকেট বা রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এটুকু শুনে তার চক্ষুকর্ণের বিবাদ ভঞ্জন হলো। অথচ ভারতের একটি অনলাইন শিরোনাম করেছে ‘খুনি সাকিব এবার টাকা চোর’। এমন শিরোনাম দেখলে যে কারোরই মাথা ঘুরবে।
উত্তর প্রদেশের স্থানীয় সাংবাদিক মহল এবং ভারতের জাতীয় গণমাধ্যমগুলোর কাছে আসলে বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ের সমস্যা, পেস বোলার কমিয়ে স্পিনার বাড়ানোর ভাবনা এসবের চেয়ে সাকিব নামটাই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ তাদের পাঠক এই নামটাই বেশি চেনে। সঙ্গে বিতর্কের মসলাও যথারীতি মজুদ। তাই চেন্নাইতে ব্যাটে-বলে খুব খারাপ পারফর্ম করেও কানপুরে কৌতূহলের কেন্দ্রবিন্দুতে সাকিবই।
