তাবিথের ঘোষণার পর তরফদার নিশ্চুপ

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:০৫ এএম

আলোচনার পথ বন্ধ করে বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের সভাপতি পদে নির্বাচনের তড়িঘড়ি ঘোষণা দিয়ে আরেকবার কি নিজের বিপদ ডেকে আনলেন তরফদার রুহুল আমিন? এই ঘোষণায় ফের তার ওপর নেমে আসতে পারে নানা বিপত্তি। যেমনটা হয়েছিল ঠিক চার বছর আগে। চার মেয়াদের সভাপতি কাজী সালাউদ্দিনের আসছে ২৬ অক্টোবর নির্বাচন না করার ঘোষণার একদিন পর সাড়ম্বরে নিজের প্রার্থিতার ঘোষণা দিয়েছিলেন সাইফ স্পোর্টিং ক্লাবের কর্ণধার তরফদার রুহুল আমিন। যে ঘোষণাকে ফুটবলাঙ্গনের অনেকেই অপরিপক্ব মনে করছেন। এর কিছুদিন পর সভাপতি পদে লড়াই করার ঘোষণা দেন বাফুফের টানা দুই মেয়াদের সহ-সভাপতি ও বিএনপি নেতা তাবিথ আউয়াল। তার ঘোষণার পর থেকেই দৃশ্যপট বদলাতে শুরু করেছে। শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়া রুহুল আমিনের নির্বাচন করা এবং সভাপতি পদে নির্বাচিত হওয়ার কাজটা এখন যথেষ্টই কঠিন। এদিকে তরফদারকে সমর্থন দিয়ে খানিকটা বিপাকে পড়েছেন জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক ও বিএনপির ক্রীড়া সম্পাদক আমিনুল হক। দলীয় আরেক নেতা ফুটবলের দায়িত্ব নিতে চাওয়ায় এখন তার কুল রাখি না শ্যাম রাখি দশা।

রুহুল আমিন ২০২০ সালে চেয়েছিলেন বাফুফের প্রধান পদে বসতে। নির্বাচনের প্রায় তিন বছর আগে প্রার্থিতার ঘোষণাও দিয়ে বসেন। এরপর থেকে নিজের প্রতিষ্ঠানের ব্যানারে দেশব্যাপী প্রতিভা অন্বেষণের নামে বিপুল অর্থ খরচ করেছেন শুধুই কাউন্সিলরদের মন পেতে। তবে তার এই সিদ্ধান্ত বুমেরাং হয় নির্বাচন ঘনিয়ে এলে। নিজেই অভিযোগ করেন, কাজী সালাউদ্দিন তৎকালীন আওয়ামী সরকারের একাধিক প্রভাবশালী নেতা ও বিভিন্ন এজেন্সিকে কাজে লাগিয়ে তাকে নির্বাচনের মাঠ থেকেই সরিয়ে দেন। সেবার তিনি বাধ্য হয়েছিলেন সালাউদ্দিনকে সমর্থন দিয়ে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে। এবারের প্রেক্ষাপট ছিল ভিন্ন। ১৫ বছরের ক্ষমতা হারিয়ে শেখ হাসিনা দেশত্যাগ করলে সরকারের দায়িত্ব নেয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। এই সরকার এখন ব্যস্ত রাষ্ট্র সংস্কারে। যার ধারাবাহিকতায় ক্রীড়াঙ্গনেও লেগেছে সংস্কারের হাওয়া। তবে সুযোগ বুঝে দেড় দশক বঞ্চিত থাকা বিএনপি ঘরানার মানুষরাও সোচ্চার সংস্কারের ফাঁক গলে ক্রীড়াঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত হতে। আমিনুল হকসহ বেশ কজন শীর্ষ সারির নেতা, যাদের ক্রীড়াঙ্গনে সম্পৃক্ততার অতীত রয়েছে, চাচ্ছেন বিভিন্ন ফেডারেশনে বসতে। ফুটবলও এর বাইরে থাকেনি। বিশেষ করে সালাউদ্দিনের সরে দাঁড়ানোর ঘোষণার পর আমিনুল হকের সমর্থন নিয়ে তরফদার চেয়েছিলেন মসনদে আসীন হতে। আগের বার ব্যর্থ হয়ে ফুটবল থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া মানুষটির মসনদের গন্ধে ফিরেছিল ফুটবলে ভালোবাসা। তবে তাবিথ আউয়াল আগ্রহ দেখানোর পর থেকেই খানিকটা থমকে গেছেন তরফদার। এখন নির্বাচন নিয়ে সেভাবে মুখ খুলতে চাচ্ছেন না তিনি। সামনের একটি সপ্তাহ তিনি কৌশলগত কারণেই মুখ খুলতে চাচ্ছেন না।

তাকে সমর্থন জানানো আমিনুলের কথায়ও আগের সেই ঝাঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তরফদারের প্রার্থিতা ঘোষণার দিন তিনি উপস্থিত হয়েছিলেন নিজ দলের একঝাঁক নেতাকর্মীকে সঙ্গী করে। এখন তিনি বলছেন দলীয়ভাবে বিএনপি বাফুফের নির্বাচনে কাউকেই সমর্থন দেবে না। আমিনুল বলেন, ‘আওয়ামী লীগ যেভাবে ক্রীড়াঙ্গনে দলীয়করণ করেছে, আমরা ঠিক তার উল্টোটা করতে চাই। এটা করতে গিয়ে আমাদের দলের ব্যক্তিগতভাবে কাউকে সমর্থন দেওয়ার সুযোগ নেই। আমরা চাই এমন একজন ফুটবলের দায়িত্ব নিক, সেটা এক্স, ওয়াই, জেড যে কেউ হতে পারে, যিনি বাংলাদেশের ফুটবলকে দেওয়ার জন্য আসবেন। আমি চাই এমন একজন লোক আসুক, যিনি পজিটিভ ওয়েতে ফুটবলকে দেবেন। দিতে ব্যর্থ হলে যাতে নিজেই সরে যান।’

তরফদারকে সমর্থন দেওয়ার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন আমিনুল, ‘কাজী সালাউদ্দিন দেশের ফুটবলকে ধ্বংস করেছেন। তার জায়গায় একজন সভাপতি প্রার্থী হতে আগ্রহ দেখিয়েছিলেন। তিনি ব্যক্তিগতভাবে আমাকে প্রার্থিতা ঘোষণার দিন সমর্থন জানিয়েছিলেন। তাই সেখানে গিয়েছিলাম।’

তাবিথ আউয়ালের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘তাবিথ সাহেব তো সভাপতি ঘোষণার ব্যাপারে আমার সঙ্গে কোনো আলোচনাই করেননি। ঘোষণা যেহেতু দিয়েছেন, মনে হয় না এটা নিয়ে তিনি আর কোনো কথা বলবেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছেন ব্যক্তিগতভাবে।’

আমিনুলের বিষয়টি সেভাবে আমলেই নিচ্ছেন না তাবিথ আউয়াল। নিজের প্রার্থিতার ঘোষণার দিন পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছিলেন রাজনীতি ও ক্রীড়ানীতিকে মিলিয়ে ফেলবেন না। নিজের মতো করে নির্বাচনে চ্যালেঞ্জ জিততে কাজ করে যাচ্ছেন তরুণ এই সংগঠক। এর মধ্যেই খুঁজতে শুরু করেছেন রানিংমেট। তাবিথ বলেন, ‘উনি (আমিনুল) কী বলছেন না বলছেন, এটা ওনার ব্যক্তিগত ব্যপার। আমার মনে হয় না বাফুফের নির্বাচনে এর কোনো প্রভাব পড়বে। প্রার্থিতা ঘোষণা করার পর থেকে আমি কাজ শুরু করেছি। জানার চেষ্টা করছি, কারা কারা নির্বাচনে প্রার্থী হতে আগ্রহী। সেটা জানার পর আমি চেষ্টা করব যোগ্যদের সঙ্গী করে এগিয়ে যেতে। আশা করছি, দেশের ফুটবলের জন্য ভালো কিছুই হবে।’

দৃশ্যত তরফদার এখন তাবিথের প্রতিপক্ষ। নির্বাচনে হারানোর ছক কষার পাশাপাশি কথার লড়াইয়েও প্রতিপক্ষকে পেছনে ফেলার চেষ্টা করতে হবে তাবিথকে। তবে এখনই সেভাবে কিছু বলতে চাচ্ছেন না তিনি। বরং আস্থা রাখতে চাচ্ছেন কাউন্সিলরদের ওপর। তবে রুহুল আমিনের তড়িঘড়ি ঘোষণার সমালোচনা আবারও করেছেন তাবিথ, ‘আমার মনে হয় উনি একটু তাড়াহুড়ো করে ফেলেছেন ঘোষণা দিতে। উনি ঘোষণা দেওয়ার কারণে আমাকেও একটু আগেই তৎপর হতে হলো। দেখা যাক, কাউন্সিলররা তাদের রায়ে কাকে বেছে নেন। আশা করছি যোগ্য হাতেই যাবে ফুটবলের গুরুদায়িত্ব।’

ফুটবলের নির্বাচন ঠিক এক মাস বাকি। এখন পর্যন্ত দুটি পক্ষকে উদ্যোগী হতে দেখা গেছে নির্বাচনকে সামনে রেখে। সামনে আরও অনেক কিছুই হতে বাকি। আগামী এক মাস ফুটবল যতটা না থাকবে সবুজ মাঠে, তার চেয়ে ঢের বেশি থাকবে নির্বাচনী ময়দানে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত