শচিন বলেছিলেন কুলদীপ ৫০০ উইকেট নেবে

আপডেট : ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৪, ১২:১৫ এএম

কানপুরের সন্তান কুলদীপ যাদব, ভারতের টেস্ট দলে থাকলেও একাদশে সুযোগ হয়নি। তাই খেলা দেখতে এসে মন খারাপ কোচ কপিল পান্ডের। দেশ রূপান্তরের সামীউর রহমানকে কপিল শুনিয়েছেন কুলদীপ যাদবকে মিডিয়াম পেসার থেকে চায়নাম্যান স্পিনারে রূপান্তরের গল্প

ক্রিকইনফোতে কুলদীপের প্রোফাইলে লেখা যে সে ফাস্ট বোলার হতে আপনার কাছে এসেছিল আর আপনি তাকে চায়নাম্যান স্পিনার বানিয়ে দিয়েছেন। কীভাবে হলো এই রূপান্তর?

কপিল পান্ডে : যা জেনেছেন সেটা শতভাগ সত্যি। আমি তার কোচ ছিলাম, এখনো আছি। ২০০৪ সালে কুলদীপের বাবা তাকে আমার কাছে নিয়ে আসেন। তার বাবার ইচ্ছা ছিল তাকে ফাস্ট বোলার বানানোর যেন সে কানপুরের হয়ে খেলতে পারে। আমি বলেছিলাম যে আমি তো কোচ, কেবল পরিশ্রম করার রাস্তাটা দেখিয়ে দিতে পারি। এরপর তার নিজস্ব চেষ্টা আর ভাগ্যের ওপর নির্ভর করবে কোথায় খেলবে। আমার এখানে যখন সে কোচিং করত তখন সে হতে চাইত ওয়াসিম আকরাম। মিডিয়াম পেস বোলিং করত। কয়েকদিন ওকে দেখার পর ওর শারীরিক গড়ন, উচ্চতা সবকিছু মিলিয়ে মনে হলো যে ওকে স্পিন বোলার বানানো যায়, বামহাতি স্পিনার। একদিন ওকে বললাম যে তুমি ওয়াসিম আকরাম হতে পারবে না, তোমার ওরকম গড়ন বা উচ্চতা নেই। সে বলেছিল আমার বলে তো সুইং আছে, কেন পারব না। আমি বললাম সুইং আছে কিন্তু এই বোলিং নিয়ে তুমি বেশিদূর এগোতে পারবে না। আমার এখানে অনুশীলন চালিয়ে যেতে চাইলে তুমি স্পিন করো, অথবা অন্য কোনো অ্যাকাডেমিতে যোগ দাও। এই বলে ওকে বললাম যাও গিয়ে বসে থাকো। এরপর দেখি সে কাঁদছে। ডেকে এনে স্পিন করতে বললাম, চায়নাম্যানের ভঙ্গিতে করল। ভাবলাম সে দুষ্টামি করে এভাবে বল করছে। আবার করতে বললাম, এ রকম তিনবার চায়নাম্যান অ্যাকশনে বল করল। সবগুলা বল লেন্থে পড়ল। আমি নৌবাহিনী দলের সদস্য ছিলাম, সার্ভিসেস দলের হয়ে মুম্বাইতে ১৬ বছর ক্রিকেট খেলেছি, ৮৬ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত। এই সময়ে কোথাও চায়নাম্যান বোলার নজরে আসেনি। দিল্লিতেও দেখিনি। তখনই আমি সিদ্ধান্ত নিই ওকে চায়নাম্যান বোলারই বানাব। ওর জন্য আমি শেন ওয়ার্নকে মডেল হিসেবে বেছে নিই, তবে ওয়ার্নের প্রতিবিম্ব। শেন ওয়ার্ন যেভাবে বল করত ওকেও সে রকমই কিন্তু উলটোভাবে বল করতে বলতাম। এরপর সে অনেক পরিশ্রম করেছে আর নিজের বোলিংয়ের ওপর দারুণ নিয়ন্ত্রণ এনেছে।

ছোটবেলায় কেমন ছিলেন কুলদীপ?

কপিল পান্ডে : ওর যখন ১২ বছর বয়স তখন তাকে প্রথম ম্যাচ খেলাই গ্র্যাজুয়েট ক্লাবের বিপক্ষে। ওকে খেলতেই নিচ্ছিল না, বয়স কম হওয়ার কারণে। আমি বলেছিলাম মানুষের দক্ষতাটা দেখো, বয়স নয়। প্রথমে এক দুইটা উইকেট নেওয়ার পর ওদের একজন বলল যে এখন আমাদের প্রধান ব্যাটসম্যান আসছে, সে একে পিটিয়ে ছাতু বানাবে। এসে একটা চার একটা ছয় মেরে পরে কুলদীপের বলে স্টাম্পড হয়ে যায়। ২০-২৫ বছর বয়সীদের বিপক্ষে ১২ বছরের কুলদীপ যেদিন ভালো বল করল, চাপের মুখে ঘুরে দাঁড়াল, সেদিন থেকেই মনে হয়েছে যে ও অনেকদূর যাবে।

মাঠে এসেছেন, খেলা দেখলেন। কিন্তু একাদশে কুলদীপকে দেখলেন না, কী মনে হয় ঘরের মাঠে কুলদীপকে খেলানো যেত না?

কপিল পান্ডে : খুবই গুরুত্বপূর্ণ কথা বলেছেন। কুলদীপ এই সময়ে টেস্টে দারুণ বল করছে। ওর খেলা সবশেষ ম্যাচে সে ম্যান অব দ্য ম্যাচ হয়েছে, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। এরপর সে একাদশের বাইরে চলে গেল। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার পারফম্যান্স খুব ভালো ছিল, ওর ১২ টেস্টে মনে হয় ৫০ উইকেট হয়ে গেছে (৫৩), তার মানে গড় খুব ভালো। দুঃখ আছে মনে যে ও খেলছে না। তবে একই সঙ্গে আশাও আছে যে আগামীতে খেলবে। তবে সে খেলুক বা না খেলুক, এই টেস্ট সিরিজটা ভারতের জেতা উচিত। টিম কম্বিনেশনের জন্য অধিনায়ক যে কোনো সিদ্ধান্তই নিতে পারে, তবে কুলদীপ এখন তার সেরা ফর্মে আছে। ওর জন্য কোনো বিশেষ ধাঁচের উইকেট দরকার নেই। সে যে কোনো জায়গায় বল ঘোরাতে পারে। কুলদীপ কোনো সাধারণ বোলার নয়। সে শেন ওয়ার্নের পথ অনুসরণ করছে। সে অনিল কুম্বলের মতো কিংবদন্তি স্পিনার হওয়ার পথে আছে। তাই আমি মনে করি কুলদীপকে খেলানো উচিত ছিল, শতভাগ উচিত ছিল।

কুলদীপের বলের প্রধান বৈশিষ্ট্য কী এখন? সামনে কতদূর যেতে পারবে?

কপিল পান্ডে : দেখবেন সব স্পিনার সিমের ওপর বলটাকে ঘুরাতে চাইবে, কুলদীপ একমাত্র বোলার যে স্ক্যাম্বল সিমে বল করে। এটা ব্যাটসম্যান বুঝতে পারে না। এটা বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানরাও বলবে। ওর বলের বৈশিষ্ট্যটাই আলাদা। ও যখন প্রথম ম্যাচ খেলে তখন ওর বোলিং দেখে শচিন টেন্ডুলকার বলেছিলেন, এই ছেলে কমপক্ষে ৫০০ উইকেট নেবে। আমি এটাই শুধু বলতে চাই, অন্তত শচিন যা বলেছেন সেটা করে দেখাও। আমি তো বলি ও আরও বেশি উইকেট নিতে পারবে। এই প্রতিভা নষ্ট করতে দেওয়া যাবে না। ও ৭ বছরে মাত্র ১২টা টেস্ট খেলেছে। ও ভালো করে ম্যাচসেরা হলেই তাকে বসিয়ে রাখা হয়। আমি চাই কুলদীপ যেভাবে পরিশ্রম করে যাচ্ছে সেভাবেই করে যাক, নিজের সাহসে ভর করে এগিয়ে যাক কারণ কারও কাছে বিদ্যা থাকলে তাকে আটকে রাখা যায় না। 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত