আধিপত্য বিস্তার ও দলীয় কোন্দলে বিভিন্ন স্থানে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ হয়েছে। এসব ঘটনায় আহত হয়েছে অন্তত ৩৫ জন। এর মধ্যে মাগুরায় যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের সংঘর্ষে ১৫ জন আহত হয়। কুমিল্লা আদর্শ সদরের দুর্গাপুরে বিএনপির গণতন্ত্র দিবসের প্রোগ্রামে যাওয়া না যাওয়া কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হয়েছে।
রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে।
এ ছাড়া নাটোরের বড়াইগ্রামে পূর্বশত্রুতার জেরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে নয়জন আহত, চারটি বাড়ি ও তিনটি মোটরসাইকেল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। বিস্তারিত আমাদের প্রতিনিধিদের পাঠানো খবর:
মাগুরায় যুবদল-স্বেচ্ছাসেবক দলের সংঘর্ষ, আহত ১৫ : মাগুরায় যুবদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় শহরের ভায়না মোড় বাসস্ট্যান্ড এলাকায় এ সংঘর্ষ শুরু হলেও রাত পর্যন্ত থেমে থেমে সংঘর্ষ চলে। এ ছাড়া গতকাল শনিবার সকালে আবারও দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া হয়। পরে সেনাবাহিনী ঘটনাস্থলে এসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংঘর্ষে উভয় পক্ষের ১৫ জন আহত হয়েছে।
গুরুতর আহতদের মধ্যে ছয়জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। গুরুতর আহত তিনজনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানো হয়েছে।
এদিকে গতকাল শনিবার দুপুরে এ ঘটনায় আমির শেখ বাদী হয়ে সদর থানায় মামলা করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে তিনজনকে আটক করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। আটকরা হচ্ছে যুবদল নেতা রাসেল, কৃষক দল নেতা অপু ও কামরান মোল্যা।
হাসপাতালে ভর্তি আহত আলিম শেখ বলেন, বিকেলে একই এলাকার মসলেমের ছেলে সিনবাদ কয়কেজন সঙ্গী নিয়ে মোটরসাইকেলে আবদুর রহিমের বাড়ির সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেয়। এ সময় আবদুুর রহিম সিনবাদকে বলে আমরা বিএনপি করি, আমাদের বাড়ির সামনে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিচ্ছিস কেন বলে তর্কে জড়ায়। এ ঘটন কেন্দ্র করে দুজনের মধ্যে তর্ক ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। পরে সন্ধ্যায় সিনবাদ তার সঙ্গীদের নিয়ে দেশীয় অস্ত্রধারীদের নিয়ে আমাদের ওপর হামলা করে।
তবে নাম প্রকাশে অনেচ্ছুক নেতাকর্মীরা জানিয়েছে, ভায়না মোড়ে বাস-টেম্পোস্ট্যান্ড দখল ও সম্প্রতি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের ঠিকাদারি কাজের টাকার ভাগাভাগি নিয়ে নিজেদের দলের মধ্যে বিরোধ চলছিল। যাকে কেন্দ্র করে এ সংঘর্ষের সূচনা। প্রতিপক্ষের হামলায় জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আশরাফুজ্জামান শামীমের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ভায়না এলাকা এখনো থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে। পরবর্তী সহিংসতা এড়াতে এলাকায় সেনাবাহিনী ও পুলিশ অবস্থান করছে।
জেলা যুবদলের সভাপতি অ্যাডভোকেট ওয়াশিকুর রহমান কল্লোল বলেন, যুবদলের নেতাকর্মীরা এ সংঘর্ষের সঙ্গে জড়িত নন। ভায়নার মোড়ের বাসস্ট্যান্ড ও টেম্পোস্ট্যান্ড রয়েছে সেখানে স্থানীয়রা নিজেদের দখল নিয়ে এ সংঘর্ষ হতে পারে।
জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি আশরাফুজ্জামান শামীম জানান, স্থানীয় মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে স্থানীয় বাসিন্দারা কথা বলায় ওই সব মাদকসেবী ও বিক্রেতারা জোট বদ্ধ হয়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে। এর সঙ্গে স্বেচ্ছাসেবক দলের কোনো নেতাকর্মী জড়িত নন।
মাগুরা সদর থানার ওসি মো. মেহেদী রাসেল বলেন, তুচ্ছ ঘটনা কেন্দ্র করে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। বর্তমানে এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে। এ ঘটনায় আমির শেখ নামে এক ব্যক্তি ২০ জনের নাম এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাতপরিচয় ২০ জনকে আসামি করে মামলা করেছেন। ঘটনার সঙ্গে জড়িত তিনজনকে সেনাবাহিনীর সদস্যরা আটক করেছেন।
কুমিল্লায় বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ, আহত ৫ : কুমিল্লা আদর্শ সদরের দুর্গাপুরে বিএনপির গণতন্ত্র দিবসের প্রোগ্রামে যাওয়া না যাওয়া কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে পাঁচজন আহত হয়েছে। এ ঘটনার পর দুর্গাপুর এলাকায় থমেথমে অবস্থা বিরাজ করছে।
গত শুক্রবার সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে দুর্গাপুর দীঘিরপাড় কাজী নূর আহমেদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে এ ঘটনা ঘটে। আহতরা সদর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
আহতরা হলেন আদর্শ সদর উপজেলার উত্তর দুর্গাপুর ইউনিয়নের কৃষ্ণনগর এলাকার মৃত মকবুল আহমেদের ছেলে বিএনপি নেতা কাজী নূর আহমেদ শরীফ, দক্ষিণ দুর্গাপুর এলাকার মৃত সিদ্দিকুর রহমানের ছেলে আবদুল হান্নান, একই এলাকার আফজলের ছেলে গোলাম মোস্তফা, মৃত সমগাজীর ছেলে সুজন ও আবদুল বারেকের ছেলে ইউসুফ।
জানা গেছে, গত ১৭ সেপ্টেম্বরে কুমিল্লা নগরীর টাউন হল মাঠে বিএনপির গণতন্ত্র দিবসের প্রোগ্রামে যাওয়া না যাওয়া কেন্দ্র করে এ ঘটনা ঘটে। আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রেজাউল কাইয়ুম দুর্গাপুর বিএনপি নেতা নূর আহমেদদের কান্দিরপাড় প্রোগ্রামে যেতে নিষেধ করেন, সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রোগ্রামে যাওয়াই কাইয়ুমের ভাই রাশেদসহ দলবল নিয়ে এ হামলা করেন বলে অভিযোগ করেন আহত বিএনপি নেতাকর্মীরা।
ঘটনাটি ষড়যন্ত্র বলে অভিযোগের বিষয়ে কুমিল্লা আদর্শ সদর উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক রেজাউল কাইয়ুম বলেন, রাজনীতিতে ষড়যন্ত্র থাকবে। সে আলোকে আমার ওপর দোষ চাপাচ্ছে। প্রোগ্রামে যাওয়ার জন্য কাউকে নিষেধ করেনি। সবাইকে যেতে আমি বলেছি। যারা আহত হয়েছে তাদের দেখতে আমি নিজেই যাব।
কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানার ওসি মহিনুল ইসলাম বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার পর বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষ ঘটে। তবে এখন পরিবেশ শান্ত আছে। আমাদের ফোর্স ঘটনাস্থলে ছিল।
রাজবাড়ীতে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘষে আহত ১৫ : রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দিতে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে বিএনপির দুই গ্রুপের সংঘর্ষে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছে। আহতদের মধ্যে সাতজন বালিয়াকান্দি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে। বালিয়াকান্দি হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছে বালিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার মশিউল আজম চুন্নু, ইলিশকোল গ্রামের কালাম শেখের ছেলে আলম শেখ, একই গ্রামের হাসেম ভূঁইয়ার ছেলে জাহিদুল ভূঁইয়া, বালিয়াকান্দি গ্রামের মৃত ইদ্রিস মোল্যার ছেলে রুবেল মোল্যা, সাঈদ শিকদারের ছেলে আরিফ শিকদার, আমতলার কালু মিয়ার ছেলে লিটন মিয়া এবং পথচারী বালিয়াকান্দি গ্রামের বাদশা মোল্যার ছেলে ফিটু মোল্যা।
গত শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে বালিয়াকান্দি চৌরঙ্গী মোড়ে দুই গ্রুপের মধ্যে এ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, বালিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গোলাম সরোয়ার ভূঁইয়াকে সাবেক সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার মশিউল আজম চুন্নুর ছেলেসহ তার লোকজন লাঞ্ছিত করে। বিষয়টি জানাজানি হলে উভয়পক্ষের লোকজনের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে বালিয়াকান্দি শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে দুই গ্রুপ মুখোমুখি সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
এ সংঘর্ষের সংবাদ পেয়ে রাজবাড়ী জেলা শহরের কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে স্থাপিত আর্মি ক্যাম্প থেকে ক্যাপ্টেন মো. এনামুল হাসানের নেতৃত্বে সেনাবাহিনীর একটি টহল দল এবং বালিয়াকান্দি থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ সময় যৌথ বাহিনী উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদক খোন্দকার মশিউল আলম চুন্নুসহ তিন কর্মীকে আটক করে। আটকদের মধ্যে দুজন সংঘর্ষে আহত হওয়ায় তাদের বালিয়াকান্দি হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার তিনজন থানা হেফাজতে রয়েছেন। যৌথ বাহিনী সূত্র জানায়, মশিউল আলম চুন্নু সংঘর্ষে আহত হয়ে বালিয়াকান্দি হাসপাতালে গেলে তাকে কর্তব্যরত চিকিৎসক হাসপাতালে ভর্তি হতে বলেন। কিন্তু তিনি গ্রেপ্তার এড়াতে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে হাসপাতাল ত্যাগ করে নিজবাড়ির পাশের একটি বাড়িতে গিয়ে আত্মগোপন করেন। খবর পেয়ে সেখানে অভিযান চালিয়ে যৌথ বাহিনী তাকে আটক করে। এ সময় তিনি নিজেকে ভিন্ন নামে পরিচয় দেন। কিন্তু যৌথ বাহিনী তার পরিচয় নিশ্চিত হয়ে গ্রেপ্তার করে থানায় নিয়ে যায়।
সংঘর্ষের ঘটনার পর এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে যৌথ বাহিনী টহল ও সংঘর্ষের ঘটনায় জড়িতদের গ্রেপ্তারের অভিযান চলমান।
এ বিষয়ে জানতে বালিয়াকান্দি উপজেলা বিএনপির সভাপতি গোলাম শওকত সিরাজ বলেন, সংঘর্ষের পর চুন্নুর নেতৃত্বে আমার বাসভবনে আগুন লাগানোর চেষ্টা করে।
বালিয়াকান্দি থানার ওসি জামাল উদ্দিন বলেন, সংঘর্ষের খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। পরবর্তী আইনি কার্যক্রম চলছে।
নাটোরে আওয়ামী লীগ বিএনপির সংঘর্ষে আহত ৯ : নাটোরের বড়াইগ্রামে পূর্বশত্রুতার জেরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষে নয়জন আহত, চারটি বাড়ি ও তিনটি মোটরসাইকেল ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। শুক্রবার রাত সাড়ে ৮টার দিকে উপজেলার জোয়াড়ী সৈয়দ মোড় এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। আহতদের উদ্ধার করে দুজনকে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এবং অন্যদের নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, উপজেলার বৃ-কাছুটিয়া গ্রামে বিএনপিকর্মী সাইফুর রহমানের সঙ্গে আধিপত্য বিস্তার কেন্দ্র করে জোয়াড়ী গ্রামের আওয়ামী লীগ নেতা দুলাল হোসেনের দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। এর জেরে শুক্রবার রাতে তাদের মধ্যে কথাকাটির একপর্যায়ে সংঘর্ষ বাধে।
দুলাল হোসেন বলেন, সাইফুর রহমানের ভাতিজা ঈমান হোসেন ও আবদুর রহিমের সঙ্গে গাঁজা বিক্রি নিয়ে জামাত আলীর ছেলে নাইম এবং শহিদুলের ছেলে শিহাবের দ্বন্দ্ব বাধে। এ-সংক্রান্ত একটি ভিডিও ক্লিপও সম্প্রতি প্রকাশ প্রায়। শুক্রবার সন্ধ্যায় সাইফুর রহমান উপজেলার বিভিন্ন জায়গা থেকে বিএনপির কর্মীদের এনে জামাত আলী, শহিদুল ইসলাম ও আমার বাড়িতে হামলা করে, ভাঙচুর চালায়।
সাইফুর রহমানের ভাতিজা ঈমান হোসেন বলেন, আমাদের আমবাগানে দুলালরা সব সময় অত্যাচার করে। প্রতিবাদ করলেই দলীয় প্রভাব খাটিয়ে মারধর করে। শুক্রবার সন্ধ্যায় চায়ের স্টলে রাজনৈতিক কথা বলা নিয়ে কথা কাটাকটির একপর্যায়ে দুলাল হোসেন ও তার লোকজন আমাদের ওপর হামলা করে। এতে ছয়জন আহত হয় এবং তিনটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে তারা।
বড়াইগ্রাম থানার ওসি সিরাজুল ইসলাম বলেন, ঘটনাস্থল পরিদর্শন করা হয়েছে। লিখিত অভিযোগ পেলে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
