আশ্বিনের শুরু থেকে অস্বস্তিকর গরমের পর টানা কদিনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে তিস্তার পানি বিপদসীমার ওপরে ওঠার পাশাপাশি অন্যান্য নদীর পানিও বেড়েছে। ফলে নীলফামারী, রংপুর, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। গতকাল রবিবার এমনই তথ্য জানিয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। এদিকে অসময়ের এই বন্যায় পাঁচ জেলার প্রায় অর্ধলাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে। ডুবে গেছে হাজার হাজার একর জমির ফসল। ভেসে গেছে পুকুর ও মৎস্য খামার। কোনো কোনো এলাকায় নদী তীরের মানুষ পড়েছে ভাঙন আতঙ্কে। এসব এলাকার দিনমজুর ও খেটে খাওয়া মানুষ পড়েছেন অসহায় পরিস্থিতিতে।
দেশ রূপান্তরের রংপুর, লালমনিরহাট, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা প্রতিনিধি ওইসব এলাকার নদনদীর অবস্থা, ক্ষয়ক্ষতি ও আশঙ্কার তথ্য পাঠিয়েছেন গতকাল। সেসব তথ্যের আলোকে বিস্তারিত
রংপুর প্রতিনিধি জানান, গতকাল অবধি বন্যা পরিস্থিতি সবচেয়ে খারাপ হয়েছে রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে। সেখানে তিস্তার পানি বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। সরেজমিনে দেখা যায়, টানা বৃষ্টি আর উজানের পানির ঢলের কারণে ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে তিস্তা। ইতিমধ্যে রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার বালাপাড়া ও টেপামধুপুর ইউনিয়নের হরিচরণ শর্মা, আজমখাঁ, হয়বত খাঁ, বিশ্বনাথের চর, চরগনাই, ঢুষমারা, চর রাজিব, গোপিঙ্গা, গদাই, পাঞ্জরভাঙ্গা, তালুক শাহবাজপুরসহ চরাঞ্চলে অস্থায়ীভাবে পানিবন্দি হয়েছে কিছু পরিবার। তারা বলছেন, নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে আমরা ভাঙন আতঙ্কে আছি, পানি কমতে শুরু করলেই ভাঙন শুরু হবে। ইতিমধ্যে অনেক বাড়িঘর ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। বালাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আনসার আলী বলেন, রাতের মধ্যে পানি বেড়েছে। তবে কোনো বৃষ্টি হয়নি। এরপরও নদীপাড়ের মানুষজনকে সাবধানে থাকতে বলা হয়েছে।
গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী, কোলকোন্দ, চরবিনবিনাসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নদী তীরবর্তী ও চরাঞ্চলের মানুষদের মধ্যে দুর্ভোগ দেখা দিয়েছে। নদী তীরবর্তী আবাদি জমিগুলো তলিয়ে গিয়ে আগাম আমন ধানসহ শীতকালীন সবজিসহ উঠতি বিভিন্ন ফসলের ক্ষতি হবে। হঠাৎ পানি বাড়ার ফলে গবাদি পশুপাখি নিয়ে মানুষজন বিপাকে পড়েছেন। কোলকোন্দ ইউনিয়নের পশ্চিম ইচলি গ্রামের আমিনুল ইসলাম বলেন, গত শনিবার ভোর থেকে বাড়িঘরে নদীর পানি ঢুকতে শুরু করেছে। তিস্তার পানি বাড়তে থাকায় চরের অনেক পরিবার তাদের মালপত্র সরিয়ে নিরাপদে নিয়ে যাচ্ছে। পানি বৃদ্ধির কারণে ছোট ছোট বাচ্চা ও গবাদিপশু নিয়ে খুবই বিপাকে রয়েছি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড বলছে, দুপুরের দিকে পানি সামান্য কমলেও সন্ধ্যা থেকে তিস্তার পানি আবারও বাড়বে। তাই চরাঞ্চলবাসীকে সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বসহকারে নিয়ে ইতিমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সবার ছুটি বাতিল করা হয়েছে। সবাই এখন যে যার স্থানে দায়িত্ব, সেই স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
তিস্তা বাঁচাও, নদী বাঁচাও সংগ্রাম পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম হাক্কানি বলেন, অসময়ের বন্যা ও ভাঙনে প্রতি বছর ১ লাখ কোটি টাকার সম্পদ তিস্তার গর্ভে চলে যায়। এ সমস্যার স্থায়ী সমাধানের জন্য তিস্তা খনন, সংরক্ষণ ও তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা ছাড়া বিকল্প নেই।
পানি উন্নয়ন বোর্ড রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম জানান, তিস্তার কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ৩৪ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে পানি প্রবাহ হচ্ছে, যা রাতে আরও বাড়বে। তাছাড়া পানি বাড়ায় তিস্তাসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে সবসময় মনিটরিং করা হচ্ছে। যাতে রাস্তাঘাট, ব্রিজ ভেঙে না যায় সেই বিষয়গুলো মাথায় রেখে কাজ করা হচ্ছে। তাছাড়া রংপুরের তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সমতল বাড়ছে। তিস্তা নদীর পানি সমতল রংপুরের কাউনিয়া পয়েন্টে বিপদসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে ধরলা ও দুধকুমার নদীর পানি সমতল বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
লালমনিরহাট প্রতিনিধি জানান, উজানের ঢল ও দুদিনের টানা বৃষ্টিতে লালমনিরহাটে তিস্তা নদীর পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিপদসীমা অতিক্রম করেছে। লালমনিরহাট পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শুনিল কুমার বলেন, রবিবার সকাল ৬টায় তিস্তা নদীর ডালিয়া পয়েন্টে পানি প্রবাহ বেড়ে বিপদসীমার ২ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়। দুপুর ১২টায় একটু কমে পরে ৩ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। নদীর পানি বৃদ্ধির ফলে ইতিমধ্যে জেলার তিস্তা তীরবর্তী পাঁচটি উপজেলার ২৫-৩০ গ্রামে পানি ঢুকে পড়েছে। চরাঞ্চলগুলোর ঘরবাড়ি ও ফসলি জমিতে পানি উঠে চরম ভোগান্তিতে পড়েছে এসব গ্রামের মানুষ। এসব গ্রামের বেশ কিছু রাস্তাঘাট, ব্রিজ-কালভার্ট পানির তোড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। উঠতি আমন ধান ও বিভিন্ন সবজি ক্ষেত ডুবে পানিতে তলিয়ে গেছে। পানির তোড়ে ভেসে গেছে বেশ কিছু পুকুরের মাছ। পাঁচ উপজেলায় ২০ হাজার পরিবার পানিবন্দি হয়ে পড়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে জানা গেছে। বিদ্যালয়ে পানি উঠে পড়ায় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে বন্ধ রয়েছে পাঠদান কার্যক্রম।
এদিকে গতকাল বেলা ১১টায় লালমনিরহাট জেলা প্রশাসক এইচএম রকিব হায়দার আদিতমারী উপজেলার মহিষখোচা ইউনিয়নের পানিবন্দি লোকজনের খোঁজখবর নিতে সরেজমিন পরিদর্শন করেছেন। এ সময় অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মাহাবুব রহমান, জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা এসএম সাফায়াত আখতার নুর, আদিতমারী উপজেলা নির্বাহী অফিসার নুর-ই-এলাহী সিদ্দিকী, আদিতমারী সহকারী কমিশনার ভূমি রওজাতুন জান্নাত এবং আদিতমারী প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।
লালমনিরহাট জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন অফিস জানিয়েছে জেলার পাঁচটি উপজেলায় শিশুখাদ্য ক্রয়ের জন্য ৫ লাখ, গো-খাদ্য ক্রয়ের জন্য ৫ লাখ, নগদ বিতরণের জন্য জিআর ক্যাশ ৩ লাখ ও ৯০ টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
গাইবান্ধা প্রতিনিধি জানান, গাইবান্ধায় কয়েক দিনের বৃষ্টি আর উজানের ঢলে প্রধান চার নদনদীর পানি আবারও বাড়তে শুরু করেছে। এতে জেলার ১৬৫টি চরের নিচু অঞ্চলগুলোয় পানি উঠছে। তবে গাইবান্ধার প্রধান তিন নদনদীর পানি বিপদসীমার অনেক নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এ পানিতে জেলায় আপাতত বন্যার আশঙ্কা নেই বলে জানিয়েছে পাউবো।
গাইবান্ধা পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) উপসহকারী প্রকৌশলী রায়হানুল ইসলাম বলেন, উজান থেকে পানি আসছে এবং গত কয়েক দিনের বৃষ্টির পানিতে জেলার সব নদনদীর পানি বাড়তে শুরু করেছে। চরের কিছু নিচু অঞ্চলে পানি প্রবেশ করেছে। তিস্তা, করতোয়া, ঘাঘট ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বিপদসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। আপাতত এ পানিতে বন্যার আশঙ্কা নেই। আমরা সার্বক্ষণিক নজর রাখছি।
কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি জানান, টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা পানিতে কুড়িগ্রামের ধরলা, দুধকুমার ও ব্রহ্মপুত্র নদীর পানি বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে তিস্তা নদীর পানি বিপদসীমার ৩১ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তার পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় চর ও নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে পড়েছে। ফলে কিছু কিছু এলাকায় ধান ক্ষেত, বাদাম ক্ষেত ও মরিচ ক্ষেত তলিয়ে গেছে। হঠাৎ পানি বেড়ে যাওয়ায় নদী ভাঙন ও ফসল নিয়ে আতঙ্কে আছে মানুষজন।
কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রাকিবুল হাসান জানান, রবিবার সন্ধ্যার মধ্যে তিস্তা নদীর পানি কমতে শুরু করবে। এ ছাড়া অন্যান্য নদনদীর পানি কমবে। বিপদসীমা অতিক্রম করার সম্ভবনা নেই।
