যে কোনো কিছুতেই লাভ-লস, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির টাটকা হিসাব মেলাতে অভ্যস্ত বাংলাদেশের মানুষ। এটা দোষ নয়, গুণেরও নয়। বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে নিষ্ঠুর বাস্তবতায়। বাকিতে নয়, নগদায়নের এ বৈশিষ্ট্যটি অনিবার্যও। হচ্ছে-হবে, আসছে-আসবে ধরনের কথায় আর গলে না তারা। কারণ, এগুলো শুনতে শুনতে তারা যারপরনাই কাহিল সেই কবে থেকেই। তাই যে কোনো কিছুতে খাড়ার ওপর হিসাব চায়। হালখাতায় টালি মেলায়। টানা ১৫ বছর ৭ মাস সয়েছে বলে এখন ৪৫ দিনও সইতে না পারার নেপথ্য অন্যতম এক কারণ এটি। এ ধারাবাহিকতায় নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনে গিয়ে কী এনেছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস? এ প্রশ্নের খাড়ার ওপর জবাব চায় মানুষ। রাজনীতি, অর্থনীতি, কূটনীতি ইত্যাদি সেক্টরের বিশ্লেষকরা বলছেন, সফরটি রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে বাংলাদেশের জন্য মাইলফলক হয়ে থাকবে। এই ‘থাকবে’ কথাটা ভবিতব্য। মানুষ চায় পেল কী তা জানতে?
এ ধরনের সফরে ব্যাগ-ট্রলি ভরে কিছু নিয়ে আসা যায় না, তা জানা-বোঝার পরও মানুষ নমুনা বা আলামত দেখতে চায়। সেই নমুনা রয়েছে পর্যাপ্ত। জাতিসংঘ মহাসচিব, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে এশিয়া, ইউরোপ, লাতিন আমেরিকা, আফ্রিকার ১২টি দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান, বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রধানরা ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারকে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে একদম নগদে। আর সহযোগিতা বাকিতে হলেও তাদের ওয়াদাগুলো নগদের কাছাকাছি।
জাতিসংঘের ৭৯তম অধিবেশনে যোগ দিতে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নিউ ইয়র্ক পৌঁছান ২৩ সেপ্টেম্বর। পরদিনই জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সভাকক্ষে হৃদ্যতাপূর্ণ বৈঠক করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের সঙ্গে। সাধারণ অধিবেশনের ফাঁকে বাংলাদেশের কোনো শীর্ষ নেতার সঙ্গে মার্কিন কোনো প্রেসিডেন্টের এমন বৈঠক বিরল। প্রথা ভেঙে এ বৈঠকে বাইডেন অন্তর্বর্তী সরকারের প্রতি পূর্ণ সমর্থনের কথা জানিয়ে বাংলাদেশের সংস্কারে সব ধরনের সহযোগিতার কথা জানান। আরেকটি বৈঠকে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনও বাংলাদেশে বহুল কাক্সিক্ষত সংস্কার ও সুষ্ঠু নির্বাচনে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের গ্যারান্টি দেন। গেল সরকারের জমানায় বাংলাদেশের রপ্তানির প্রধান গন্তব্য ও প্রবাসী আয়ের মূল উৎস যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্কের টানাপড়েনের অবসানের একটি বার্তা হিসেবে একে পাঠ করা যায়।
জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ভন ডার লেন, চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই’র বার্তাও বেশ আশা জাগানিয়া। বাংলাদেশের সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও সুদৃঢ় করার আগ্রহ জানিয়েছে চীন। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেনের সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্করের বৈঠকে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার আশাবাদ প্রকাশও একটি ঘটনা। পাকিস্তান, মালদ্বীপ ও নেপালের সরকারপ্রধানদের সঙ্গে প্রধান উপদেষ্টার বৈঠককে দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যকার পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্পর্ক উন্নয়নের তাগিদও কম কথা নয়।
দীর্ঘ কর্র্তৃত্ববাদী শাসনে গুম, খুন, ভিন্নমত দমনে যেখানে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি তলানিতে চলে যায়, সেখানে জাতিসংঘ মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সহায়তার প্রতিশ্রুতি নগদায়নের মতোই। তার ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান কৌঁসুলি করিম এ খানের জুলাই-আগস্টের গণহত্যার বিচারের সহযোগিতার আশ্বাস আরেক প্রাপ্তি। এর বাইরে অর্থনৈতিক সহায়তার এক একটি প্রতিশ্রুতিকেও নগদ ধরা যায়। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা বাংলাদেশকে ৩৫০ কোটি ঋণসহায়তা দেবেন বলে কথা দিয়েছেন। যার ২০০ কোটি ডলার নতুন ঋণ। আইএমএফের সঙ্গেও কথা হয়েছে ৩০০ কোটি ডলারের নতুন ঋণের ব্যাপারে।
জাতিসংঘের সাধারণ অধিবেশনের ভাষণে ড. ইউনূস বিশ্বনেতৃত্বের কাছে গণ-অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশকে একটি নতুন বাংলাদেশ বলে পরিচয় করিয়েছেন। যেখানে টেকসই সংস্কারের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্র, সুশাসন ও সমৃদ্ধি অর্জনের মাধ্যমে বাংলাদেশকে চিনবে বিশ্ব। বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণে বিশ্বকে কেবল পাশে বা কাছে নয়, সম্পৃক্তই থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বিশ্বনেতারা মাথা নেড়ে তুমুল করতালিতে সাড়া দিয়েছেন।
বক্তব্যে অধ্যাপক ইউনূস বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন ও অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। তার সরকারের গৃহীত সংস্কার কার্যক্রম ও লক্ষ্য সম্পর্কেও ধারণা দেন। বাংলাদেশের বৈষম্যবিরোধী ও সরকার পতন আন্দোলনকে আখ্যা দিয়েছেন ‘মনসুন রেভল্যুশন’ বা ‘মনসুন অভ্যুত্থান’ নামে। রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, অভিবাসন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্কতা নিয়েও কথা বলেন মুহাম্মদ ইউনূস। ইসরায়েল-গাজা, ইউক্রেন যুদ্ধের মতো বৈশ্বিক সংকট উঠে আসে তার বক্তব্যে। বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত ও সমালোচিত দিক অর্থ পাচার। অর্থ পাচার ইস্যুও উঠে আসে প্রধান উপদেষ্টার ভাষণে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এ মুহূর্তে প্রায় দেড় কোটি প্রবাসী বাংলাদেশির কথা উল্লেখ করে বলেছেন, সবার জন্য অভিবাসনের উপযোগিতা নিশ্চিত করতে বিশ্বসমাজকে নিরাপদ, সুশৃঙ্খল, নিয়মিত এবং মর্যাদাপূর্ণ অভিবাসনের পথ সুগম করতে হবে।
ক্লিনটন গ্লোবাল ইনিশিয়েটিভের মঞ্চেও বক্তব্য দিয়েছেন ড. ইউনূস। সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন নিজেও এ সময় উপস্থিত ছিলেন। জাতিসংঘে ড. ইউনূসের সরকারপ্রধান হিসেবে উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও বিল ক্লিনটনের উচ্ছ্বসিত ভঙ্গিমার ছবিতে সয়লাব হয়ে গেছে বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। সরকারপ্রধান হিসেবে ইউনূসের জাতিসংঘে উপস্থিতির পর যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো যে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে, তা থেকে বাংলাদেশও যেমন সহযোগিতার বার্তা পেয়েছে, তেমনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বাংলাদেশ সম্পর্কে ইতিবাচক বার্তা পেয়েছে।
ড. ইউনূস বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান হওয়ায় বিশ্ববরেণ্য হননি। তিনি তা হয়ে আছেন সেই কবেই। এই বরণীয়কে বিশ্বনেতারা সামনেও কতটা আমলে রাখেন, কদর দেনসেটাই প্রশ্ন। আর তাকে গ্রাহ্য করা মানে বাংলাদেশের প্রাপ্তি। বিভিন্ন রাষ্ট্র, সরকার ও সংস্থার প্রধানরা তাকে যেভাবে জড়িয়ে ধরেছেন, তা বাংলাদেশকেই জড়িয়ে নেওয়া। সেই ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রাপ্তির বালাম বইটির ভলিউম মোটা হতে থাকবে অবশ্যই। যা ধীরে ধীরে আমাদের আগের যন্ত্রণা ভুলিয়ে দিতে পারে। গত কয়েক বছর ধরে গণতন্ত্র ও নির্বাচন ইস্যুতে বাংলাদেশের শেখ হাসিনা সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপড়েন অবিরাম কেবল বাড়তে থাকে। প্রকাশ্যে চরম নোংরা কাজ ও কথাও বলা হয়েছে বাংলাদেশের দিক থেকে। এ কদাকার রূপ প্রকাশ পায় ২০২১ সালের ডিসেম্বরে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে এলিট ফোর্স র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে। পরে ২০২৩ সালের ২৫ মে যুক্তরাষ্ট্র নির্বাচন সামনে রেখে ভিসানীতি ঘোষণা শেখ হাসিনার সরকারকে নজিরবিহীন চাপে ফেলে দেয়।
এরপর চলতি বছরের জানুয়ারিতে আরেকটি একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলেও চলতি বছরের মে মাসে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে দুর্বল করা ও দুর্নীতিতে জড়িত থাকার কারণ দেখিয়ে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর কর্তৃক সাবেক সেনাপ্রধান আজিজ আহমেদ ও তার পরিবারকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা আরেকটি চরমপত্রের মতো। এরপর নানা ঘটনার পরম্পরায় ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে শেখ হাসিনার পলায়ন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে এ এক নতুন রেকর্ড। এরপর দৃশ্যপটে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। পশ্চিমা বিশ্বসহ নানা অক্ষশক্তির উচ্ছ্বাস। আর প্রতাপশালী প্রতিবেশী ভারতের জন্য বিষ হজম করা। বাংলাদেশ যে নতুন দিকে যাচ্ছে সেই বার্তা ভারতের কাছেও পরিষ্কার। ড. ইউনূসকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রে জাতিসংঘে যা হয়েছে তার মানে বুঝতে দেরি করেনি বিশাল শক্তি ভারত। বাংলাদেশের তিনদিক ভারত বেষ্টিত। আবার সর্বশেষ শ্রীলঙ্কাসহ এই ভারতের চারদিকের দেশগুলোতে এখন ভারতবিরোধী শাসক। এ ক্ষেত্রেও সামনে বাংলাদেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির হালখাতা খোলা। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছেও ভারত-বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র স্পষ্ট। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা চলছে।
যুক্তরাষ্ট্র সফরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বাংলাদেশের একটি বৈঠকের গুঞ্জন থাকলেও শেষ পর্যন্ত বৈঠকটি হয়নি সফরসূচিতে মিল না থাকায়। সামনে কোথাও তা হতেও পারে। তবে, দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে একটি নতুন আবহ চলছে। পররাষ্ট্রসহ বিভিন্ন উপদেষ্টা, এমনকি বিএনপি নেতাদের সঙ্গে পর্যন্ত ভারতের রাজনীতিক ও কূটনীতিকদের কথাবার্তা ও দেখাসাক্ষাৎ বাড়ছে। যা মাস কয়েক আগেও ছিল ধারণার বাইরে। বলা বাহুল্য, বাংলাদেশের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ডালি এখন আর ভারতকেন্দ্রিক নয়। ড. ইউনূসের ফোকাস বিশ্বের সব দিকে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছ থেকে সংস্কারের সম্ভাব্য সব সাপোর্ট আদায়ের কূটনীতি তার বেশ জোরদার। কাক্সিক্ষত আশ্বাসও মিলছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া অর্থ পুনরুদ্ধারে বিশেষ ভূমিকা রাখার কথা দিয়েছেন।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বাংলাদেশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার হয়েছে তা ফেরত আনতে টেকনিক্যাল, ফাইন্যান্সিয়ালসহ বিভিন্ন ধরনের আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জরুরি। অর্থনীতিকে টেকসই করতে হলে কিংবা সুষম অর্থনীতি চালু করতে হলে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতেই হবে। কেবল কানাডার বেগমপাড়া নয়, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জসহ বিশ্বের বেশ কিছু দেশ রয়েছে যেখানে বাংলাদেশ থেকে টাকা-পয়সা পাচার হয়ে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের ক্ষমতাধর দেশগুলোর সহায়তা মিললে নিঃসন্দেহে বিরাট প্রাপ্তি যোগ হবে বাংলাদেশের।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
