১৯৫৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মস্কোয় অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ২০তম অধিবেশনে সোভিয়েত ইউনিয়নের রাষ্ট্রনায়ক নিকিতা ক্রুশ্চেভ পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে সহাবস্থানমূলক নীতি ঘোষণার পাশাপাশি, সংসদীয় পন্থায় শান্তিপূর্ণভাবে বিপ্লবের কথা বলেন। চীনা কমিউনিস্ট পার্টি মস্কোর এই অবস্থানকে ‘সংশোধনবাদ’ হিসেবে চিহ্নিত করে এবং মস্কো ও পিকিং শিবিরে বিভক্ত হয় সমাজতান্ত্রিক বিশ্ব। সে সময় অন্য অনেকের মতো ক্রুশ্চেভের রাজনৈতিক লাইনের বিরোধিতা করেছিলেন ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কার কমিউনিস্ট নেতা রোহান উইজেবিরা, যে কারণে তিনি সোভিয়েত বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার অধিকার হারান।
ইনি সেই উইজেবিরা, যার নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘জনতা ভিমুক্তি প্যারামুনা (জেভিপি)’ এবং দলটির প্রার্থী অনূঢ়া কুমারা দিশানায়েকে (একেডি) গত ২২ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। একেডির এই বিজয় একদিকে দেশটির রাজনীতিতে অভূতপূর্ব ঘটনা, অন্যদিকে কমিউনিস্টদের রণকৌশলগত তত্ত্বের সম্ভবত সফল অস্ত্রোপচারের ঘটনা নয়। অনেক দেশেই সংসদীয় বিপ্লববাদীরা নির্বাচনে সাফল্য পেয়েছেন, কিন্তু সংশোধিত তত্ত্বকাঠামোর ওপর দাঁড়িয়ে ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার ঘটনা সত্যিই বিরল। প্রয়াত উইজেবিরাও হয়তো ভাবেননি যে তার দল কোনো একদিন ক্রুশ্চেভপন্থি রাস্তায়ই হাঁটবে। অবশ্য জেভিপির কমরেডরা মনে করেন, তাদের এই পরিবর্তনযাত্রা অনিবার্য।
সংশোধনবাদের নব্বই দশকীয় বদনামকে আলিঙ্গন করে শ্রীলঙ্কার প্রথম বামপন্থি প্রেসিডেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করলেন কমরেড দিশানায়েকে। তার অনুগামীরা এখন ভোট, ব্যালট আর নির্বাচনকে শ্রেণিসংগ্রামের উপায় মনে করেন। শ্রীলঙ্কার আইনসভা ভেঙে দেওয়া হয়েছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, আগামী আইনসভা নির্বাচনে জেভিপি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করবে।
জনযুদ্ধের পথ ছেড়ে ব্যালটে ভরসা করার এই যাত্রাপথ সহজ ছিল না। হাজার হাজার নিহত কমরেডের স্বজন, জেল-জুলুম ও নিপীড়নের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা নেতাকর্মীদের জন্য বিষয়টি বিব্রতকর। বিশেষত ১৯৮৯ সালে রাষ্ট্রযন্ত্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহের সময় প্রাণ হারান কমরেড উইজেবিরা। ব্যালটের রাস্তায় ফিরে আসার এই পরিক্রমাটা তাদের জন্য এখনো চ্যালেঞ্জিং। কিন্তু বাস্তবতা হলো, শ্রীলঙ্কার বুর্জোয়া অভিজাততন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রবলভাবে বিকশিত জনরোষকে ধারণ করা প্রয়োজন এবং কমিউনিস্ট বিশ্বের বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়েই কর্মসূচি নির্ধারণ করেছে জেভিপি।
২০২২ সালে গণবিক্ষোভের মুখে গোতাবায়া রাজাপাকসে পদত্যাগ করার তিন বছর আগে জেভিপির নেতৃত্বে কিছু রাজনৈতিক দল, অধিকার গোষ্ঠী, নাগরিক সমাজ, ট্রেড ইউনিয়নসহ ২০টিরও বেশি সংগঠন নিয়ে গঠিত হয় ‘ন্যাশনাল পিপলস পাওয়ার (এনপিপি)’। নির্বাচনী মোর্চার প্রার্থী হিসেবে দিশানায়েকের বিজয়ের মধ্য দিয়ে হয়তো শ্রীলঙ্কার রাষ্ট্রব্যবস্থার ক্ষমতা জনগণের হাতে পরিপূর্ণভাবে ন্যস্ত হবে না কিংবা সমাজতান্ত্রিক অভিযাত্রা শুরু হবে না; কিন্তু এই জোট এই মুহূর্তে দেশটির মানুষের জনরায়ের শ্বাস-প্রশ্বাস।
বাংলাদেশের মানুষের জন্য এ বিজয় শিক্ষণীয়। দুই বছর আগে লঙ্কান প্রেসিডেন্ট গোতাবায়া রাজাপাকসে যেভাবে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে পালিয়ে গিয়েছিলেন, একইভাবে গত আগস্টে গণঅভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে পালান বাংলাদেশের ১৬ বছরের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তফাৎ শুধু এটুকুই শ্রীলঙ্কায় রাজাপাকসে পরিবারের ক্ষমতাহারা হওয়ার নেতৃত্বের রাশ ছিল রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে, আর বাংলাদেশে পুরোপুরি জনবিস্ফোরণে। কমিউনিস্ট শুদ্ধতাবাদীরা একেডির উত্থানে নাক ছিটকালেও নিভু নিভু প্রদীপের মতো জ্বলতে থাকা কমিউনিস্ট শিবিরের মধ্যে নিজেদের আশা-ভরসা খুঁজে পেলেন লঙ্কানরা। রাজনৈতিক ভাষ্যকাররা বলছেন, এ জয়ের মধ্য দিয়ে দ্বীপে ভারতীয় আধিপত্যবাদের একচ্ছত্র প্রভাব দুর্বল হলো। কারণ গোড়া থেকেই জেভিপির পুরনো সংগ্রামের রাজনৈতিক বোঝাপড়ার কেন্দ্রবিন্দু ছিল দ্বীপে ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতা। সামগ্রিকভাবে, দক্ষিণ এশিয়ায় নেপাল ও মালদ্বীপের রাজনীতিতে ভারতের প্রভাবের খুঁটি নড়ে গেছে, এবার শ্রীলঙ্কায়ও তাই হলো। এর মধ্যে নেপাল ও শ্রীলঙ্কায় কমিউনিস্টরাই প্রভাবক শক্তি।
এখানে যে বিষয়টি দৃষ্টিগোচর হয়, তা হলো বাংলাদেশে সংসদীয় কিংবা মাওপন্থি কোনো ধারার কমিউনিস্টরাই হিসাবের খাতায় নেই। এমনকি সাম্প্রতিক সফল অভ্যুত্থানে তারা নিজেদের অস্তিত্ব খুঁজছেন। কলম্বোতে শাসন ক্ষমতার এত বড় পালাবদলের মুহূর্তে বাংলাদেশে নানা মত ও পথের কমিউনিস্ট দলগুলোর ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র শক্তি কোনোমতে পানিতে নাকটুকু উঁচিয়ে প্রাণরক্ষা করছে।
হাসিনার দীর্ঘ শাসনের মধ্যে নানা চাপের মধ্যেও নিরাপদ সড়ক আন্দোলন, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের নো ভ্যাট অন এডুকেশন এবং প্রথম দফার কোটা সংস্কার আন্দোলনের পুরোভাগে তরুণরা রাজপথে নেমে আসে। শেষমেশ দ্বিতীয় ভাগের কোটা আন্দোলনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতাহারা হলো। এসব আন্দোলনের কোনো শক্তিকে ধারণ করতে না পারার কারণ হলো বামপন্থি দলগুলোর নীতিনির্ধারণী ক্ষুদ্র ফোরাম, যাদের আদর্শিক দোলাচল প্রবল; আবার নেতৃত্বের একটি অংশ সনাতনী ভাবধারার অবসায়ন চান না। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতৃত্বাধীন জোটের বাইরে থাকা বামপন্থি রাজনীতির মূল ধারায় জেভিপির মতো কেউই নেই, যারা বিপুল শক্তি নিয়ে রাষ্ট্রকে চ্যালেঞ্জ করেছিল। একমাত্র সিরাজ সিকদার ছাড়া স্বাধীনতার পর তাৎপর্যপূর্ণ সে রকম কোনো দল বা উপদল ছিলই না। কিন্তু তার পরে এতদিন ধরে ভোটের রাজনীতিতে অবস্থান করেও বাংলাদেশের নির্বাচনপন্থি বাম দলগুলো ব্যালটের হিসাব-নিকাশ করে উঠতে পারছে না।
এবারের ছাত্র আন্দোলনের ভাষাকে রপ্ত করতে আমরা যদি বাংলাদেশের পরিস্থিতির সংকট বুঝতে যাই, তবে জেভিপির দলীয় মূল্যায়ন ও পরিবর্তনকে পর্যালোচনা করতে হবে। জেভিপি যখন ভোটের ময়দানে লড়ছে, তখন শ্রীলঙ্কায় দিশানায়েকে ও অনুগামীদের অপরাপর বামশক্তির সমালোচনা শুনতে হয়েছে। সমালোচনার যাবতীয় অভিযোগ ও গুরুগম্ভীর তত্ত্বীয় বিতর্ক হয়তো উড়িয়ে দেওয়া যাবে না; কিন্তু এটুকু বুঝতে হবে, বুর্জোয়া রাষ্ট্রকাঠামোর টিকে থাকা অবস্থায় কোনো না কোনো গণতান্ত্রিক শক্তিকে তো এগিয়ে আসতে হবে। দিশানায়েকের জোট এনপিপি সেই ডাক শুনেছেন। রাজাপাকসে পরিবার উৎখাত হওয়ার পর দুই বছরের প্রেসিডেন্ট রনিল বিক্রমাসিংহের শাসনে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বেইলআউট আলোচনা নতুন করে শুরু করতেই হবে দিশানায়েকের প্রশাসনকে। বিক্রমাসিংহের প্রশাসন রাজাপাকসেদের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি ঢাকতে যেভাবে আইএমএফের অন্যায্য শর্ত গ্রহণ করেছিলেন এবং দেশে বেসরকারিকরণের ধারা জোরালো করেছিলেন, তার জোরালো সমালোচক ছিলেন একেডি। এখন তিনি এসব কঠিন হিস্যার ফয়সালাকারী হিসেবে আবির্ভূত হলেন। গণহারে বেসরকারিকরণ ও জনগণের ওপর করের বোঝা চাপানোর মতো পদক্ষেপগুলো থেকে মানুষকে বাঁচাতে জেভিপির প্রতিশ্রুত রাজনৈতিক কর্মসূচির বাস্তবায়নের সময় চলে এসেছে। তা ছাড়া দুই বছর আগের গণআন্দোলনের চাহিদা কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তা নিয়েও নির্বাচনী প্রচারাভিযান থেকে প্রশ্ন শুনছেন দিশানায়েকের অনুসারী কমরেডরা।
বামপন্থি রাজনৈতিক পরিসরের শতফুলের মধ্যে দিশানায়েকে কৌশলগত ঝুঁকি নিয়েছেন এবং সফল হয়েছেন। বাংলাদেশের বাম-প্রগতিশীল মানুষ বামপন্থার এই পরিসরটুকুর বিকাশ চান, যেখানে বামপন্থিদের মধ্যে তুমুল তর্কবিতর্কের পরিবেশ তৈরি হবে। শাসনক্ষমতায় মতাশ্রয়ী প্রভাব তৈরি করে নিদেনপক্ষে নিজেদের কথাকে গুরুত্বের আওতায় নিয়ে আসতে পারার শক্তিটুকু অর্জন না করতে পারা ব্যাপক হতাশার। দেশে পাহাড়ি-সমতলের আদিবাসীদের ভূমি ও সংস্কৃতি রক্ষা, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে দ্বিধা, দেশে নতুন করে শানিত হওয়া ইসলামপন্থি ভাবধারা এবং সামগ্রিক রাষ্ট্রকাঠামোর নানাবিধ সংকটের বাস্তবতা রয়েছে। এসব ব্যাপারকে সামনে রেখে কৌশলগত ভূমিকা নিতে পারছে না বামপন্থিরা। দিশানায়েকের দল সেই বোঝাপড়ার পাঠ নিতে পেরেছিল।
ছোট্ট ভূখণ্ডে শ্রীলঙ্কা নৃতাত্ত্বিক ও ধর্মীয় বৈচিত্র্যে ঋদ্ধ। দেশের শাসনক্ষমতার প্রকৃত নিয়ন্ত্রক সিংহল বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের সঙ্গে হিন্দু সংখ্যাগরিষ্ঠ উত্তর-পূর্বের তামিল জনগোষ্ঠীদের বিবাদ বহু পুরনো, যার কারণে দেশটি দীর্ঘ গৃহযুদ্ধ পার করেছে। বাংলাদেশে জাতিগত সমস্যাটি শ্রীলঙ্কার মতো প্রকট না হলেও রয়েছে। জেভিপি বিষয়টিকে এতকাল ধরে যেভাবে মোকাবিলা করে এসেছে, সেটিকে অনেকে আপসকামী বলতে পারে; কিন্তু প্রকৃত অর্থে তারা কৌশলগত জায়গা তৈরিতে সমর্থ হয়েছে।
দিশানায়েকের বিজয় এবং সেই আয়নায় বাংলাদেশকে দেখতে গিয়ে সমসাময়িক প্রখ্যাত নাট্যকার ব্রাত্য বসুর প্রসিদ্ধ বাংলা নাটক ‘উইংকেল টুইংকেল’-এর কথা মনে পড়ল, যেটি এ শতকের প্রথম দশক থেকে পশ্চিমবঙ্গের মঞ্চে বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে। এটি উপমহাদেশের কমিউনিস্ট আন্দোলনের একটি ভাঙনপর্ব এবং কমিউনিস্ট নেতাদের আড়ষ্টতাকে বিদ্রুপ করে লেখা। নাটকটিতে বিপ্লবী আন্দোলনের রণকৌশল প্রশ্নে দুই বন্ধুর সংলাপ তীব্র শ্লেষাত্মক ভঙ্গিতে ভারতীয় কমিউনিস্ট নেতাদের বিদ্ধ করে। এতে নকশাল আন্দোলনে অংশ নিয়ে জেলখাটা মাওপন্থি কমরেড বন্ধু তার সংসদীয় পন্থার বিপ্লববাদী বন্ধুকে অট্টহাসিতে বলে ওঠেন, ‘বিপ্লবের কী হলো কমরেড!’ দিশানায়েকের জনযুদ্ধের কমরেডরা এমন অট্টহাসি দিলে জেভিপি সাক্ষাৎ সাফল্য হিসেবে সর্বশেষ নির্বাচনের কথা বলতে পারে। কিন্তু স্বাধীনতার অর্ধশতক পরে বাংলাদেশের কমিউনিস্টরা ঠিক কী জবাব দেবেন? তাদের অশীতিপর চিন্তার ক্যানভাসে জবাব দেওয়ার প্রয়োজনটুকুও হয়তো নেই। কিন্তু তারা যে হাসিনার স্বৈরাচারী ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও কোমর বেঁধে নামতে পারেননি, তা কি তারা বোঝেন?
লেখক: অনুবাদক ও লেখক
