শাহ সুজা কেরমানির সুফিদের স্মৃতি

মূল ফরিদ উদ্দিন আত্তার ভাষান্তর রাব্বী আহমেদ

আপডেট : ০২ অক্টোবর ২০২৪, ১১:৪৬ পিএম

দ্বাদশ-ত্রয়োদশ শতাব্দীর মরমি কবি ফরিদ উদ্দিন আত্তারের তাজকিরাত আল-আউলিয়া ফার্সি ভাষায় রচিত সুফিদের জীবনীভিত্তিক একটি গ্রন্থ। বাংলায় এর আক্ষরিক অর্থ ‘সাধুদের জীবনী’। এই বইয়ে ৯৬ জন সুফি সাধক ও তাদের জীবনের লোকাতীত ঘটনার উল্লেখ রয়েছে। শাহ সুজা কেরমানির এই গল্পটি এ জে আরবেরির ইংরেজি অনুবাদ Muslim Saints and Mystics (2000) থেকে বাংলায় ভাষান্তর করা হয়েছে। শাহ সুজা কেরমানির পুরো নাম শাহ ইবনে সুজা আবু আল-ফাওয়ারেস শাহ ইবনে সুজা আল-কেরমানি। ইরানের কেরমান শহরের এক জ্ঞানী পরিবারে তার জন্ম। কাজ করেছেন সুফিবাদ নিয়ে। এ বিষয়ে বেশ কিছু বইও লিখেছেন। কিন্তু সেগুলো এখন আর পাওয়া যায় না। হিজরি ২৭০ সালের (ইংরেজি ৮৮৪) কিছু সময় পরে তিনি মারা যান। 

শাহ সুজা কেরমানি ও তার সন্তানরা

শাহ সুজা কেরমানির এক ছেলে ছিল। ছোট বয়সে তিনি ওই ছেলের বুকে সবুজ রঙ দিয়ে লেখেন ‘আল্লাহ’, এই শব্দটি। বড় হয়ে সেই ছেলে যৌবনের উচ্ছৃঙ্খল আবেগে ডুবে যায়। সারা দিন ঘোরাফেরা করে লুট (গিটারের মতো এক প্রকার বাদ্যযন্ত্র) হাতে। এ-ই ছিল তার বিনোদন। তবে ছেলেটির কণ্ঠ ছিল চমৎকার। যখন সে গান গাইত, তখন লুট বাজাত। আর গাইত কান্নাভেজা সুরে। এক রাতে মাতাল হয়ে সে বাইরে বেরিয়ে যায়। রাস্তায় বসে লুট বাজিয়ে মগ্ন মনে গাইতে থাকে গান। গাইতে গাইতে চলে আসে পাড়ার এক বাড়ির সামনে। ওই বাড়িতে ছিল এক নতুন বিয়ে করা নারী। ঘুমাচ্ছিলেন স্বামীর পাশে। হঠাৎ গানের সুরে ওই নারীর ঘুম ভেঙে যায়। স্বামীকে বিছানায় রেখে দেখতে আসেন গানটা কে গাইছে। এর কিছুক্ষণ পর স্বামীরও ঘুম ভেঙে যায়। স্ত্রীকে না পেয়ে খুঁজতে থাকেন এদিক-সেদিক। হাতড়ে চশমা চোখে দেন। এরপর ছেলেটিকে ডেকে বলেন, ‘এখনো কী তোমার অনুতপ্ত হওয়ার সময় আসেনি?’ তরুণটির হৃদয়ে এই কথা দারুণভাবে আঘাত করে। ‘হ্যাঁ, এসেছে। অনুতপ্ত হওয়ার সময় এসেছে’, ছেলেটি এই বলে কেঁদে ওঠে। এরপর গায়ের পোশাক ছিঁড়ে, বাদ্যযন্ত্রটি ভেঙে ঘরে ফিরে যায়। তারপর টানা ৪০ দিন না খেয়ে থাকে। তারপর একদিন বেরিয়ে আসে বাইরে। তখন দেখা হয় তার পিতা শাহ সুজার সঙ্গে। ছেলেকে দেখে সুজা বলে ওঠেন, ‘৪০ বছর সাধনার পর আমি যা সম্মানের সঙ্গে পেয়েছি, তুমি সেটা চল্লিশ দিনেই পেলে।’

একটা মেয়েও ছিল শাহ সুজার। সেই সময়ের কেরমানের রাজা ওই মেয়েকে বিয়ে করতে মনস্থির করে। এ কথা তিনি সুজাকে জানান। সুজা তখন রাজার কাছ থেকে বিনয়ের সঙ্গে ৩ দিনের সময় চেয়ে নেন। এর পরের তিন দিন ছুটে যান এক মসজিদ থেকে আরেক মসজিদে। একদম শেষের দিন এক মসজিদে রাতের শেষ প্রহরে দেখতে পান এক দরবেশ বিনীতভাবে প্রার্থনায় মগ্ন। শাহ সুজা তখন ধৈর্য নিয়ে তার নামাজ শেষ হওয়ার অপেক্ষা করেন। নামাজ শেষ হওয়ার পর বলেন, ‘দরবেশ, তোমার কি কোনো পরিবার আছে?’  ‘না। কেউ নেই আমার’, দরবেশ উত্তর দেয়। এটা শুনে সুজা তখন বলেন, ‘তুমি কি এমন একজনকে স্ত্রী হিসেবে চাও, যে কোরআন পড়তে জানে?’ দরবেশ তখন বলেন, ‘কে আছে এমন যে আমাকে এ রকম স্ত্রী দেবেন? যখন আমার কাছে সাকল্যে আছে মাত্র ৩ দিরহাম।’ উত্তরে সুজা বলেন, ‘আমি দেব। আমি আমার মেয়েকে তোমার কাছে দেব। তোমার কাছে যে তিন দিরহাম আছে, তার একটি দিয়ে তুমি রুটি কিনবে। আরেক দিরহাম দিয়ে কিনবে গোলাপের আতর। এরপর তোমাদের বিয়ে হবে।’ এভাবে দুজনে এক মতে এসে পৌঁছায়। পরদিন সুজা তার মেয়েকে ঘরের বাইরে বের করে আনেন। তারপর নিয়ে যান দরবেশের ঘরে। ঘরে ঢুকতেই মেয়েটি দেখতে পায় এক জগ পানি, আর তার পাশে পড়ে আছে কিছু শুকনো রুটি। এটা দেখে মেয়েটি জিজ্ঞেস করেন, ‘এই রুটি কীসের জন্য?’ দরবেশ তখন বলেন, ‘রুটিগুলো গতকাল থেকে এখানে পড়ে আছে। এগুলো আমি আজকে রাতের জন্য রেখেছি।’ এ কথা শুনে মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে দরবেশের বাসা থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। দরবেশ তখন বলে ওঠেন, ‘আমি জানতাম শাহ সুজার মেয়ে কখনো আমার মতো ফকিরের সঙ্গে থাকতে পারবে না। আমার দারিদ্র্যের সঙ্গে মানিয়েও নিতে পারবে না।’ মেয়েটি তখন বলে, ‘শুনুন, আমি চলে যাচ্ছি এ কারণে নয় যে, আপনার কিছুই নেই। বরং যাচ্ছি এ জন্য যে, আপনার আল্লাহর ওপর বিশ্বাস ও আস্থায় ঘাটতি আছে। আপনি আগের দিনের বাসি রুটি রেখে দিয়েছেন। আগামীকাল আল্লাহর কাছ থেকে, যা আসবে তার ওপর নির্ভর না করেই। আর আমি আমার পিতার কথা ভেবেও অবাক হই। এই বিশটা বছর ধরে তিনি আমাকে তার বাড়িতে রেখেছেন। সবসময় বলতেন, ‘আল্লাহভীতু একজন মানুষের সঙ্গে আমি তোমাকে বিয়ে দেব। অথচ এখন দেখতে পাচ্ছি এমন একজনের সঙ্গে তিনি আমাকে বিয়ে দিতে চাইছেন, যিনি তার প্রতিদিনকার রুটির জন্য আল্লাহর ওপর নির্ভর করে না।’ এটা শুনে দরবেশ তখন বলেন, ‘এই পাপের কি কোনো প্রায়শ্চিত্ত নেই?’ ‘হ্যাঁ, আছে’, মেয়েটি বলেন। দরবেশ বলেন, ‘কী?’ মেয়েটি জানান, ‘প্রায়শ্চিত্ত এই ঘরে এখন দুটো জিনিস, এর মধ্যে যেকোনো একটা থাকবে। হয় আমি, না হলে আপনার এই বাসি রুটি।’  

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত