পাবনার বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের একটি শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রে (এসি) ২০২২ সালের ৮ সেপ্টেম্বর পাখি ঢুকে পড়ায় সমস্যা দেখা দেয়। পাশের কাশীনাথপুর বাজারের মেকানিক আলিমকে ডেকে তা সারাতে খরচ হয় মাত্র ৫০০ টাকা। কিন্তু ওই তারিখে আলিমের দোকানের ভাউচারে দুটি এসি ও পাঁচটি ফ্রিজ মেরামত খরচ দেখিয়ে ২০২৩ সালের ৬ জুন ২২ হাজার টাকা উত্তোলন করে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষ। ঠিক তার এক মাস আগে ২০২২ সালের ৭ আগস্ট ওই পাঁচটি ফ্রিজই পাশের উপজেলার ফরিদপুর উপজেলার জে কে রেফ্রিজারেটর থেকে মেরামতের ভাউচার দেখিয়ে উত্তোলন করা হয় ২০ হাজার টাকা, আবার ওই বছরেরই মে মাসে একই দোকানের ভাউচারে দুটি এসির মেরামত দেখিয়ে উত্তোলন করা হয়েছে ১৮ হাজার টাকা। এসব মেরামতের বিষয়ে মেরামতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুই না জানলেও উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ফাতেমা তুজ জান্নাতের সইয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে। দেশ রূপান্তরের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে অনিয়মের এমন চিত্র।
২০২৩ সালের ৬ জুন অনুমোদন হওয়া কয়েকটি ভাউচারের সূত্র ধরে অনুসন্ধানে নামে দেশ রূপান্তর। আলিম রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড ইলেকট্রনিকস নামে একটি দোকানের ২২ হাজার টাকার ভাউচার নিয়ে দোকানটিতে গিয়ে কথা হয় মালিক আবদুল আলিমের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ওই সময়ে আমি একটি এসি সার্ভিসিং করেছিলাম। একটি পাখি ভেতরে ঢুকে মারা যাওয়ায় এসি কাজ করছিল না। আমি খুলে সেটি পরিষ্কার করে দিলে ভালো হয়ে যায়। সেদিন আমাকে ৫০০ টাকা বিল দেওয়া হয়েছিল।’
তার দোকানের ভাউচারে ২২ হাজার টাকা বিলের বিষয়ে বলেন, ‘আমার দোকানের নাম, আমার নাম ও মোবাইল নম্বর সবই ঠিক আছে। কিন্তু ভাউচারটি আসল নয়। এটি জাল ভাউচার।’ এ সময় তার দোকানের মূল ভাউচারও দেখান মেকানিক আলিম।
একই ধরনের জালিয়াতির প্রমাণ মেলে ফরিদপুরের বনওয়ারীনগরের জে কে রেফ্রিজারেটর সার্ভিস সেন্টারের স্বত্বাধিকারী শরিফুল আলমের সঙ্গে যোগাযোগ করলে। তিনি বলেন, ‘বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আমি বা আমার প্রতিষ্ঠানের কেউ কখনই কাজ করেনি। কোনো বিলও আমি করিনি।’ তাহলে তার দোকানের ভাউচারে বিল কীভাবে হলো জানতে চাইলে শরিফুল বলেন, ‘যারা পরিচিত রয়েছেন, তারা অনেকেই বিভিন্ন সময় দু-একটি ভাউচার চায়। সম্পর্কের খাতিরে অনেককেই দিতে হয়। হয়তো সেভাবে নিয়েছিল।’
করোনাকালে স্বেচ্ছাসেবকদের জন্য বরাদ্দ হওয়া সম্মানীভাতাও নয়ছয়ের অভিযোগ উঠেছে হাসপাতাল কর্র্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। বিধি ভেঙে ওই সময়ে হাসপাতালেরই নাইটগার্ড, আনসার সদস্য ও স্বাস্থ্যকর্মীদের স্বেচ্ছাসেবী দেখিয়ে জুলাই ২০২১ থেকে জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত তুলে নেওয়া হয় প্রায় ৯ লাখ টাকা। এমনকি চামেলী খাতুন চম্পা নামে আউটসোর্সিং কর্মী হিসেবে কাজ এক নারীকে চম্পা ও চামেলী আলাদা নাম দেখিয়েও তোলা হয়েছে টাকা। এসব অনিয়মে সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ হাসপাতালটির শীর্ষ কর্মকর্তা ডা. ফাতেমা তুজ জান্নাতের বিরুদ্ধে।
স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে কাজ করে ভাতা পাওয়ার কথা স্বীকার করেন হাসপাতালটিতে দায়িত্বরত আনসার সদস্য জুয়েল রানা। তবে গণমাধ্যমকর্মী আসার খবরেই সটকে পড়েন একাধিক নাম ব্যবহার করে ভাতা পাওয়া চামেলী খাতুন চম্পা।
অবশ্য নিজের নিজের বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে ডা. ফাতেমা তুজ জান্নাত বলেন, ‘একই যন্ত্র একাধিকবার নষ্ট হতেই পারে। আর করোনাকালে লোকবল না পেয়ে হাসপাতালের কর্মীদের স্বেচ্ছাসেবকের কাজ করানো হয়েছে। তাই তাদেরই বরাদ্দের ভাতা দেওয়া হয়েছে।’
এ বিষয়ে পাবনার সিভিল সার্জন ডা. শহীদুল্লাহ দেওয়ান বলেন, হাসপাতালের কর্মীদের স্বেচ্ছাসেবক ভাতা নেওয়ার সুযোগ নেই। অভিযোগ সত্য হলে প্রয়োজনে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
