ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত ৫ আগস্ট পতন হয় আওয়ামী লীগ সরকারের। এরপর একে একে গ্রেপ্তার হন গত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী ও উপদেষ্টা এবং আওয়ামী লীগ ও ১৪-দলীয় জোটের শীর্ষ নেতারা এবং সাংবাদিক ও পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাদের রিমান্ড ও জামিনের শুনানির জন্য বিভিন্ন সময়ে ঢাকার আদালতে হাজির করা হয়।
মধ্য আগস্টের দিকে গ্রেপ্তারকৃতদের পক্ষে কোনো আইনজীবী শুনানিতে অংশ নেননি। আওয়ামী লীগের দাপুটে আইনজীবীরাও তখন গরহাজির ছিলেন। অভিযোগ ওঠে, কোনো আইনজীবীকেই তখন শুনানির সুযোগ দেওয়া হয়নি। শুনানি করতে গিয়ে তাদের অনেকেই হেনস্তা হয়েছেন। তবে গত কয়েক দিনে পরিস্থিতি একটুু পাল্টেছে।
আওয়ামীপন্থি শীর্ষ আইনজীবীরা গরহাজির থাকলেও অপেক্ষাকৃত তরুণ আইনজীবীরা এখন শুনানি করছেন। তাদের অনেককে বিরোধীপক্ষের আইনজীবীদের তোপের মুখেও পড়তে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের তথ্যমতে, শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর সাবেক মন্ত্রী, আওয়ামী লীগ নেতাসহ ৫০ জনের বেশি ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করে আদালতে তোলা হয়। তাদের প্রায় সবার রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়।
গ্রেপ্তারের পর গত ১৪ আগস্ট ঢাকার একটি আদালতে হাজির করা হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা সালমান এফ রহমানকে। সদ্য সাবেক সরকারের এ দুই প্রভাবশালীর পক্ষে ওইদিন কোনো আইনজীবী ছিলেন না। সেদিন দুজনকে আদালতে আনা-নেওয়ার সময় অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটে। উৎসুক আইনজীবীরা ও জনতা ঝাড়–, জুতা হাতে তাদের বিরুদ্ধে মিছিল করে। তাদের উদ্দেশে ডিম, পানির বোতল ও ইটের টুকরো ছুড়ে মারে। ওইদিন দুজন তরুণ আইনজীবী তাদের হয়ে শুনানিতে অংশ নিতে চাইলেও বিএনপি-জামায়াতপন্থি আইনজীবীরা তা হতে দেয়নি। গত ২১ আগস্ট হাজিরার সময় সাবেক মন্ত্রী দীপু মনিও মারধর ও হেনস্তার শিকার হন।
এমন পরিস্থিতিতে গত ২৫ আগস্ট সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে আদালতে উপস্থিত আসামিদের আইনগত সহায়তাদান এবং তাদের হয়রানি না করতে সংশ্লিষ্ট লিগ্যাল এইড প্যানেল থেকে আইনজীবী নিয়োগ দিতে হবে।
আইনজীবীরা বলেন, এরপর পরিস্থিতি পাল্টাতে শুরু করে এবং লিগ্যাল এইড প্যানেলের কিছু আইনজীবী শুনানি শুরু করেন। এরপর একাধিক তারিখে আনিসুল হক ও সালমান এফ রহমানের পক্ষে আইনজীবীরা শুনানি করেন। পর্যায়ক্রমে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু, সাবেক মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনি, সাবেক তথ্য ও যোগাযোগ প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলকের পক্ষেও শুনানি করেছেন একাধিক আইনজীবী।
ঢাকা বারের আইনজীবী মোরশেদ হোসেন শাহীন বলেন, গ্রেপ্তারকৃতদের অনেকের পক্ষে তিনিসহ ১০ জন আইনজীবী শুনানি করছেন। দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাদের দুঃসময়ে পাশে দাঁড়িয়েছি। তাদের আইনের আশ্রয়ের অধিকার রয়েছে। তবে শুনানি করতে গিয়ে আমরা নানা সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছি।’
আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানকে গ্রেপ্তারের পর তার উন্নত চিকিৎসার নির্দেশনা দিতে কিছুদিন আগে হাইকোর্টে একটি আবেদন করা হয়। আবেদনকারী পক্ষের আইনজীবী বিভূতিভূষণ সরকার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গত ১০ সেপ্টেম্বর হাইকোর্ট সংশ্লিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদনটি দাখিলের নির্দেশ দিয়ে আদেশের ৭২ ঘণ্টার মধ্যে এটির নিষ্পত্তির নির্দেশ দেয়। পরে শাজাহান খানকে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে তার স্বাস্থ্যগত পরীক্ষা শেষে আবারও কারাগারে পাঠানো হয়।’
গত ১৭ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির করা হয় আওয়ামী লীগ সরকারের রেলমন্ত্রী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী নূরুল ইসলাম সুজনকে। ওইদিন তাকে রিমান্ডে দিয়েও বিকেলে রিমান্ড বাতিল করে ঢাকার একটি আদালত। অবশ্য ২২ সেপ্টেম্বর তাকে রিমান্ডে পাঠানা হয়। আদালতে তার পক্ষে শুনানি করছেন অ্যাডভোকেট এএফএম রেজাউল করিম হিরন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুজন ভাইকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চিনি। আমরা কয়েকজন তার পক্ষে শুনানি করছি। তবে শুনানি করতে গিয়ে নানা কটুবাক্য ও উপহাস শুনতে হচ্ছে।’
হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার একাত্তর টেলিভিশনের সিইও মোজাম্মেল বাবু, সাংবাদিক দম্পতি শাকিল আহমেদ-ফারজানা রুপার পক্ষে শুনানি করছেন ঢাকা বারের আইনজীবী মো. আবদুর রহিম। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গ্রেপ্তারের পর শাকিল ও ফারজানা রুপার পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। পরে একজন আইনজীবী যুক্ত হন। তিনিও পরে আর শুনানি করেননি। তার কাছ থেকে অনাপত্তিপত্র নিয়ে আমি তাদের পক্ষে এখন শুনানি করছি।’
ঢাকার আদালতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নিয়োগপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পাবলিক প্রসিকিউটর পদমর্যাদার একজন আইন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে দেশ রূপান্তরকে বলেন, “শুরুর দিকে তাদের পক্ষে কোনো আইনজীবী ছিলেন না। কাউকে শুনানির সুযোগও দেওয়া হয়নি। তবে এখন কিছু আইনজীবী নিজেরাই উৎসাহী হয়ে শুনানি করছেন। অনেকে আদালতে তাৎক্ষণিক ‘ডামি’ আইনজীবী হয়ে শুনানি করছেন।”
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আসামির আইনি সহায়তা পাওয়া মৌলিক অধিকার। কোনো আইনজীবীকে শুনানিতে বাধা দেওয়া অন্যায়। এটা একটা ভালো দিক যে, তাদের পক্ষে এখন কিছু আইনজীবী শুনানি করছেন।’
