নেতানিয়াহু যুদ্ধটাকে চালিয়ে যেতে চাচ্ছেন

আপডেট : ০৬ অক্টোবর ২০২৪, ০১:৩৬ এএম

কূটনীতিক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগে অধ্যাপনার মধ্য দিয়ে কর্মজীবন শুরু করেন। কাজ করেছেন জাতিসংঘে। প্রায় এক বছর ধরে গাজা যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন মোড় নিয়ে মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কও ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে দেশ রূপান্তরের সঙ্গে কথা বলেছেন অভিজ্ঞ এই কূটনীতিক। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সম্পাদকীয় বিভাগের সাঈদ জুবেরী।

দেশ রূপান্তর : মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি আরও ঘনীভূত হচ্ছে। ইসরায়েলের আগ্রাসন শুরুতে গাজায় সীমাবদ্ধ থাকলেও, প্রায় এক বছর ধরে চলা সংঘাত এখন মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে ছড়িয়ে পড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি নিয়ে আপনার পর্যবেক্ষণ কী?

এম হুমায়ুন কবির : আশঙ্কাজনকই বলব। কারণ গত এক বছর আগে গাজা এবং ইসরায়েলের মধ্যে সংঘাত শুরু হয় তখন মানুষের মধ্যে যে অস্বস্তি ছিল, সেই অস্বস্তি কিন্তু ক্রমেই বাড়ছে। তার কারণ ইসরায়েলিরা গাজাতে হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্প্রসারণ করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের জন্য যে জীবনহানির কারণ হয়েছে সেটা সারা পৃথিবীকে স্থম্ভিত করেছে। নিরীহ মানুষ যারা যুদ্ধের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয় তাদের জীবন ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে। কিছুদিন আগে গাজা থেকে তারা দৃষ্টি সরিয়ে লেবাননের হিজবুল্লাহ, যারা হামাসের সমর্থনে মাঝে মাঝে আক্রমণ বা গোলাবর্ষণ করছে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ সম্প্রসারণ করেছে। ইতিমধ্যে বৈরুতে হিজবুল্লাহর প্রধান নাসরাল্লাহকে তারা নিহত করেছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে যেটা দেখছি সেটা কিন্তু একটা ভয়ংকর চেহারা নিচ্ছে। সর্বশেষ তো ইরানও সরাসরি জড়িয়ে পড়ল।

দেশ রূপান্তর : নেতৃত্ব ও ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য ইরানের সামনে আর কোনো পথ খোলা ছিল?

এম হুমায়ুন কবির :  না ছিল না, আপনার সঙ্গে আমি একমত। এখানে আশঙ্কার কারণ হচ্ছে নেতানিয়াহু যুদ্ধটাকে চালিয়ে যেতে চাচ্ছেন বিভিন্নভাবে। যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সঙ্গে তার নিজের রাজনৈতিক এবং ব্যক্তিগত ভবিষ্যৎও জড়িত। তার কারণ হচ্ছে তিনি ক্ষমতা হারানোর পর তাকে জেলে যেতে হবে। সেই সম্ভাবনাকে দূরে রাখবার জন্যই তিনি যুদ্ধকে ক্রমাগতভাবে সম্প্রসারণ করে যাচ্ছেন। এটা করতে করতে এমন একটা জায়গায় তিনি পরিস্থিতিকে নিয়ে গেছেন, যেখানে ইরানের পক্ষে পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের বাইরে আর কোনো সুযোগ ছিল না। কারণ তেহরানেই আপনি ইসমাইল হানিয়াকে নিহত করেছেন; তাদের আরেক বন্ধু হিজবুল্লাহর প্রধান নাসরাল্লাহকে মেরে ফেলেছেন; ইরানের কনস্যুলেটকে মেরেছেন। অন্যদিকে, চারদিকে, ইরান এবং তার আশপাশের প্রত্যেককে কোণঠাসা করার চেষ্টা করছে ইসরায়েল। সেজন্য ইরানের জন্যও এটা একটা মুখ রক্ষার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সেই মুখ রক্ষার খাতিরেই কিন্তু ইরান বলেছে, তাদের বন্ধুদের মৃত্যুর প্রতিশোধ তারা নিয়েছে এবং একঘণ্টা আক্রমণ করে বলেছে যে, এই পর্যায়ে এই আক্রমণ শেষ, আমরা আর যুদ্ধ বাড়াতে চাই না। কিন্তু এখন আশঙ্কার জায়গাটা হচ্ছে ইসরায়েল কিন্তু ইঙ্গিত করছে যে পাল্টা হামলা করবে। বিশেষ করে নেতানিয়াহু গত ১০ বছর ধরে ইরানের নিউক্লিয়ার প্রোগ্রামের বিরুদ্ধে কিন্তু খুব সোচ্চার ছিলেন।

দেশ রূপান্তর : ইসরায়েল যদি ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করতে চায়, তাহলে তাতে সমর্থন দেবে না যুক্তরাষ্ট্র। ইসরায়েলি ভূখণ্ডে ইরানের প্রায় ১৮০টি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এ কথা বলেন।

এম হুমায়ুন কবির : এই কথাটা বলার অর্থই হচ্ছে, তাদের কাছে খবর আছে যে, ইসরায়েল এই স্থাপনাগুলোর ওপরে আক্রমণের পরিকল্পনা করছে এবং যাতে তারা সে কাজটা না করে বার্তা দেওয়া। সেই জন্যই বাইডেন প্রকাশ্যেই বলেছেন যে, আমরা তাদের এই ধরনের উদ্যোগকে সমর্থন করি না। এই কাজ তোমরা করলে আমরা তোমাদের সঙ্গে নেই। অর্থাৎ তিনি ইসরায়েলকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করছেন।

দেশ রূপান্তর : প্রথম প্রশ্নের উত্তরে গাজা যুদ্ধ নিয়ে মানুষের অস্বস্তির কথা বলছিলেন, মানুষ কি এখন অস্বস্তি কাটিয়ে সরাসরি পক্ষ নিচ্ছে না? বিশ^জুড়ে তো ইসরায়েলের আগ্রাসনবিরোধী জনমত সোচ্চার হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে আরব বিশ্ব কি অস্বস্তি কাটিয়ে ভূমিকা নিতে সক্ষম হবে?

এম হুমায়ুন কবির : এখানে সমীকরণটা খুব জটিল। কয়েকটা সমীকরণের জায়গা সংক্ষেপে বলি। ইসরায়েলি-প্যালেস্টিনীয়, তার মধ্যে প্যালেস্টিনীয়দের মধ্যে হামাস এবং ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ), কাজেই ইসরায়েলের পাশে প্যালেস্টিনীয়দের ধরেন যদি একটা সমীকরণ, সেখানেও কিন্তু প্যালেস্টিনীয়রা কমবেশি বিভাজিত। ইরান ইসরায়েলের ওপর যে মিসাইল হামলা করল তার পরের জায়গাটা এখন দুই লেয়ারে তৈরি, দুই সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। একটা হচ্ছে টার্কি, যিনি হামাসের পক্ষে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে জোরালো ভাষায় কথা বলেন। কিন্তু হিজবুল্লাহর ব্যাপারে তারা জোরালো কথা বলছেন না। কারণ হচ্ছে ইরান দুর্বল হলে তুরস্কের কোনো অসুবিধা নেই সেটা যেভাবেই হোক। এখানে একটা সমীকরণ বা বিভাজন আছে। আরেকটা সমীকরণ হলো যে ইরান কোনো কারণে দুর্বল হলে সৌদি আরবের কোনো অসুবিধা  নেই। কারণ তারা ওই অঞ্চলের প্রতিদ্বন্দ্বী। আবার শিয়া-সুন্নির সমীকরণও আছে। একটা মহাজটিল সমীকরণের আবর্তে মধ্যপ্রাচ্য আছে। কাজেই ইসরায়েলের বিরুদ্ধে সেটা হামাসই হোক বা হিজবুল্লাহ যারা লড়ছে কিংবা গাজা, লেবাননের পর ইসরায়েল যদি ইরানে আক্রমণ চালায় সেক্ষেত্রে আরবরা একসঙ্গে অবস্থান নেওয়ার মতো জায়গা তৈরি হয়েছে বলে এখনো আমার কাছে দৃশ্যমান হচ্ছে না।

দেশ রূপান্তর : মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি ইউক্রেন যুদ্ধের ওপর কি প্রভাব ফেলবে? ইসরায়েলে ইরানের হামলার আগে আগে ইউক্রেনকে নিয়ে লক্ষ্য অর্জন করা হবে ঘোষণা দিয়েছে রাশিয়া। চীনের ভূমিকাই বা কেমন হবে?

এম হুমায়ুন কবির : চীনারা মোটামুটি ইসরায়েলের বিপক্ষে অন্য যারা আছে তাদের সমর্থন করে, ইরানকেও হয়তো সমর্থন করবে তারা। কিন্তু সক্রিয়ভাবে কোনো ভূমিকা চীন পালন করবে না। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে যদি আলাপ ওঠে সেখানে হয়তো তারা সক্রিয় হতে পারে। কিন্তু অন দ্যা গ্রাউণ্ড আমার কাছে তা মনে হয় না তারা কিছু করবে। চীনারা মাঠে সক্রিয় হওয়ার মতো অবস্থানেও নেই। রাশিয়ার কথা যদি বলি, রাশিয়া হয়তো কূটনৈতিকভাবে ইসরায়েলকে সতর্ক করে ইরানকে ক্ষতিগ্রস্ত না করার জন্য মেসেজ দিতে পারে। কিন্তু এই মুহূর্তে ইউক্রেনে ব্যস্ত রাশিয়া, তারা মোটামুটি সেখানে আটকে আছে। সামরিকভাবে ইরানের পক্ষে দাঁড়াবার মতো সুযোগও তাদের নেই। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বা পাশ্চাত্য জগৎকে দুদিক থেকে মোকাবিলা করার সক্ষমতা তাদের নেই। কিন্তু যদি ইরানের ওপর আক্রমণ হয়, ইসরায়েল যদি সত্যি ইরানের ওপর ব্যাপকভাবে আক্রমণ করে বসে- সে ক্ষেত্রে ইরান যেহেতু রাশিয়ার দক্ষিণ সীমান্তের কাছাকাছি আমার ধারণা নিরাপত্তার ব্যাপারে তারা বাড়তি সতর্ক হবে। তবে এখানে রাশিয়ানদের বা চীনাদের সক্রিয় ভূমিকা আমি দৃশ্যমান দেখছি না বা আশাও করছি না। তারা হয়তো কূটনৈতিকভাবে নিন্দা করবে বা প্রতিবাদ করবে।

দেশ রূপান্তর : মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক উত্তেজনার প্রভাব তো তেলের বাজারে পড়া শুরু হয়েছে, একদিনে কয়েক ডলার বেড়েছে। সে ক্ষেত্রে হরমুজ প্রণালির প্রসঙ্গ আসবে। সে ক্ষেত্রে রাশিয়ার লাভবান হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে এখানে। অন্তত জ্বালানির মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বও তো ইউক্রেন থেকে মনোযোগ এদিকে সরাতে পারে...

এম হুমায়ুন কবির : হ্যাঁ, তাতে রাশিয়া লাভবান হবে বাইডিফল্ড আর চীনাদের জন্য বিপদ। কিন্তু তারপরও ইউক্রেন থেকে তারা দৃষ্টি বা মনোযোগ সরিয়ে এদিকে নিয়ে আসবে বলে খুব একটা মনে করি না। কারণ ইউরোপের যুদ্ধটা ইউরোপিয়ান প্লাস ওয়েস্টার্ন অ্যালায়েন্সের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটা উপাদান। কাজেই সেক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধে মনোযোগ থাকবে কিন্তু সেটা ইউক্রেন যুদ্ধের বিনিময়ে হবে সেটা আমি মনে করছি না, ইউক্রেনে পাশ্চাত্য জগতের যে ইনভলভমেন্ট সেটা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বলেন বা ন্যাটো বলেন সেটা তারা বজায় রাখবে। তবে এখানে ইরান এবং মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রে রাশিয়া মূলত কূটনৈতিক পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকবে। আমার ধারণা চীনও তাই থাকবে। কারণ দুজনের কারোরই সামরিকভাবে সেই সক্ষমতা নেই বা এখনো পর্যন্ত ওই অবস্থানে নেই যে তারা এর সঙ্গে যুক্ত হবে।

দেশ রূপান্তর : জাতিসংঘের মহাসচিবকে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছে ইসরায়েল। এটার প্রভাব আসলে কী পড়তে পারে?

এম হুমায়ুন কবির : জাতিসংঘের সঙ্গে ইসরায়েলের একধরনের ঠা-া লড়াই বহুকালের। সেটা ১৯৭৪ সাল থেকে শুরু ধরতে পারেন, যখন জাতিসংঘ পিএলওকে সদস্য করেছে তখন থেকেই। লক্ষ্য করেন, গত বছর ৭ অক্টোবর থেকে ইসরায়েলি হামলায় গাজায় যখন নিরীহ নারী-পুরুষ ও শিশু হতাহত হচ্ছিল তখনো কিন্তু জাতিসংঘের মহাসচিবের মন্তব্যে ইসরায়েল সাংঘাতিক রকম নারাজ হয়েছে, তারা প্রকাশ্যে মহাসচিবের মন্তব্যের বিরুদ্ধে কথা বলেছে। এবারও সেটা হয়েছে। তাতে আমার কাছে মনে হয় না খুব বেশি অবস্থার পরিবর্তন হবে। কারণ সেক্রেটারি জেনারেল শুধুমাত্র পেশাগত কাজ ছাড়া তো ইসরায়েলে যাওয়ার চিন্তা করছেন না। আর এখন যে যুদ্ধাবস্থা, তাতে এই সেক্রেটারি জেনারেল একটা শক্ত অবস্থান নিলেও আমার মনে হয়নি যে তিনি এ ঘটনায় খুব একটা আশ্চর্য হননি। এবং আমি মনে করছি না জাতিসংঘের দিকে থেকে নতুন কোনো উদ্যোগের আয়োজন আছে বা প্রয়োজন আছে। কারণ ইসরায়েলের এই বক্তব্য বা অবস্থান সম্পর্কে আমার ধারণা সেক্রেটারি জেনারেল আগে থেকেই পরিচিত এবং সেভাবেই উনারা সেটা দেখবেন। এটা নিয়ে খুব বেশি চিন্তিত বা খুব বেশি সক্রিয় হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে হয়তো তারাও মনে করছে না।

দেশ রূপান্তর : জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ কি এই ব্যাপারটাকে আমলে নেবে না? তাদের সংস্থার মহাসচিবকে এভাবে বলল, আবার জাতিসংঘের কয়েকজন কর্মীও নিহত হয়েছেন।

এম হুমায়ুন কবির : বিষয়টি তো আসলেই চোখে লাগার মতোই নেতিবাচক ঘটনা। কিন্তু আমি মনে করছি না যে, এই বিষয়টা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদ বা নিরাপত্তা পরিষদের সদস্য যারা আছে তারা খুব বেশি নাড়াচাড়া করবে। তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াবলি হচ্ছে যে এই যুদ্ধটাকে কীভাবে বন্ধ করা যায়। সেই জায়গাতেই তো নিরাপত্তা পরিষদ খুব বেশি সার্থকতা দেখাতে পারেনি।

দেশ রূপান্তর : আমাদের প্রধান উপদেষ্টা কিছুদিন আগে জাতিসংঘে গিয়ে তার ভাষণে গাজা প্রসঙ্গে কথা বললেন।

এম হুমায়ুন কবির : শুধু গাজা নয়, প্যালেস্টাইন নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান আমি বলব যে গত ৪০-৫০ বছর ধরেই অপরিবর্তিত আছে। আমরা বরাবরই প্যালেস্টাইনের পক্ষে কথা বলি, স্বাধীন প্যালেস্টাইনের কথা বলি, জেরুজালেমকে রাজধানী করে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা সবসময়ই সোচ্চার, আমরা প্যালেস্টাইনকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছি, প্যালেস্টাইনের রাষ্ট্রদূত ঢাকায় আছেন এবং আন্তর্জাতিক যত ফোরাম আছে সব ফোরামেই আমরা প্যালেস্টাইনের পক্ষে কথা বলি। এটা নিয়ে একটা জাতীয় ঐকমত্যও বাংলাদেশের ভেতরে আছে। আমার ধারণা প্রফেসর ইউনূস সেই ঐকমত্যটাই ওখানে প্রকাশ করেছেন। এটাই যুক্তিসংগত কথা এবং এটাই বাংলাদেশের কথা। তিনি সেটা বলেছেন সেজন্য আমি মনে করি সঠিক কাজই করেছেন।

দেশ রূপান্তর : আলোচনায় এমনটা অনেকে বলে থাকেন যে গণ-অভ্যুত্থানের মুখে হাসিনা সরকারের বিদায়ের পর বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক সখ্যেরও পরিবর্তন হয়েছে। আগে ছিলাম চীন-রাশিয়া বলয়ে এখন আমরা মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমামুখী। আপনার পর্যবেক্ষণে কী বলে?

এম হুমায়ুন কবির : আমরা কোনো বলয়ে ঢুকেছি বলে আমি মনে করছি না। কারণ একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়বার জন্য আমাদের যে আকাক্সক্ষা এবং প্রয়াস তারই অংশ হিসেবে একটা সফলতা এসেছে সাম্প্রতিককালে এবং তারই পথ ধরে একটা ইন্টেরিম গভর্নমেন্ট কাজ করছে বাংলাদেশে। সেই বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার প্রতি মানুষের যে আগ্রহ বা মানুষের যে প্রত্যাশা, সেটাকেই পাশ্চাত্য জগৎ সমর্থন করেছে। এটা তারা আগেও করেছে এখনো সেটাকে করছে। যেহেতু আমরা এখন একটা গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়বার সংগ্রামে আছি এবং সেটাকে সামনে রেখে যে সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে সেটাকেও তারা সমর্থন দিচ্ছে। তার অর্থ এই নয় যে, আমরা আমাদের অন্য অংশীদার যারা আছে সেটা আপনি চীন, রাশিয়া, ভারত বা জাপান বলেন তাদের সঙ্গে আমরা আমাদের যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছি তা কিন্তু নয়। কারণ একেক দেশের সঙ্গে একেক রকম সম্পর্ক এবং আমাদের স্বার্থের  নিরিখেই আমরা সেই সম্পর্কটা নির্ধারণ করি। কাজেই আমরা যদি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা করতে চাই তাহলে খুব সংগত কারণেই পশ্চিমা জগতের সঙ্গে কাজ করব। আর আর্থিকভাবে যদি কাজ করতে চাই পশ্চিমাদের সঙ্গে কাজ করব, চীনের সঙ্গে কাজ করব, ভারতের সঙ্গে আর্থিক বা নিরাপত্তা সংক্রান্ত বিষয়ে কাজ করব। আমাদের প্রয়োজনই নির্ধারণ করে দেবে আমরা কোথায় থাকব এবং সেজন্য কার সঙ্গে কাজ করব কিংবা সম্পর্কিত হব। আমার ব্যক্তিগত ধারণা হচ্ছে যে বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান, আমাদের প্রয়োজন, আমাদের প্রত্যাশা এগুলোর আলোকে সবার সঙ্গে আমাদের কাজ করে যেতে হবে এবং প্রয়োজনের নিরিখে সেখানে হয়তো একেক দিক একেক সময়ে কখনো কখনো একটু বাড়তি মনোযোগ পাবে। কিন্তু সেই বাড়তি মনোযোগ অন্যদিকের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নয়, অন্যদিকের দৃষ্টি বজায় রেখেই আমরা যার সঙ্গে যেটা প্রয়োজন সেই ভিত্তিতে মনোযোগটা একটু বাড়াব-কমাব। আমি মনে করছি না যে, আমরা কোনো বলয়ে ঢুকেছি, আমরা যেমন ছিলাম তেমনই আছি। শুধু আমরা সাম্প্রতিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে একটা নতুন অবস্থায় আমাদের যাদের সঙ্গে সহজাতভাবে, স্বাভাবিকভাবে কাজ করতে পারি তাদের সঙ্গে আমরা একটু বেশি চলাচল লক্ষ করছি, তারা একটু সরব আমরাও একটু সরব। এইটুকুই তফাৎ। তাদের কাছ থেকে এই মুহূর্তে আমাদের যেটুকু প্রয়োজন সেই প্রয়োজনের আলোকে তাদের সঙ্গে আমাদের যদি কাজ করতে হয় সেই কাজটা আমরা করে যাব।

দেশ রূপান্তর : বাংলাদেশ প্রশ্নে মার্কিন অথোরিটি কি ভারতের মতামতের বাইরে যেতে পারবে? 

এম হুমায়ুন কবির : আমার কাছে মনে হয় সেটা নির্ভর করে আমরা কতটা বলিষ্ঠভাবে আমাদের অবস্থানটা তুলে ধরতে পারি তার ওপর। আমরা যদি আমাদের অবস্থান তৈরি করে সেটা পরিচালনা করতে পারি তাহলে আমি মনে করি বাংলাদেশ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ইন্ডেপেন্ডেন্ট রিলেশনশিপ মেইনটেইন করা সম্ভব। তবে হ্যাঁ, আপনি যেটা বললেন, ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের আয়োজন বা সহযোগিতা আছে, সেটা মনে রেখেই আমরা আমাদের সঙ্গে সম্পর্কের জায়গা তৈরি করতে চাই। আমরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক গভীর করলে সেটা ভারতের বিরুদ্ধে যাওয়ার কারণ নেই এবং সেটা আমাদের উদ্দেশ্যও না। কাজেই আমাদের যে প্রয়োজন সেই নিরিখে আমি মনে করি ভারতের সঙ্গে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের বাইরে থেকে বা সেটাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবান্বিত না করেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক ভালো সম্পর্ক বজায় রাখা সম্ভব।

দেশ রূপান্তর : গত রেজিমের সময় ভারত ও চীনের সঙ্গে একটা ব্যালান্স গেম দৃশ্যমান ছিল, যদিও শেষের দিকে বিশেষ করে তিস্তা ইস্যুতে শেখ হাসিনার ভারতমুখী প্রবণতা চীন ভালোভাবে নেয়নি। প্রশ্ন হচ্ছে, চীনের সঙ্গে সম্পর্ককে যুক্তরাষ্ট্র কীভাবে নেবে? আর এখানে সম্পর্ক তো কেবল বাণিজ্য আর উন্নয়ন অবকাঠামো না, এর সঙ্গে ভূ-রাজনৈতিক কাঠামোগত বিষয় আছে...।

এম হুমায়ুন কবির : আমরা জানি চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আমাদের দেখতে চায়। আমার বক্তব্য হচ্ছে সেই জায়গায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কখনই বলেনি যে চীনের সঙ্গে আমরা কাজ করতে পারব না। এখন সেখানে আমার সক্ষমতার ওপরেই নির্ভর করে আমি কতখানি স্পেস চীনের সঙ্গে নিতে পারব। একটা দৃষ্টান্ত-পাল্টা দৃষ্টান্ত দিই। ভারত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ বন্ধু এখন। কিন্তু এই ইউক্রেন যুদ্ধের পরে ভারত কিন্তু রাশিয়া থেকে তেল আমদানি করে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানার পরও সেটা গ্রহণ করেছে, প্রত্যাখ্যান করেনি বা পানিশমেন্ট করেনি। তারা এস৪০০ অ্যান্টি মিসাইল ব্যাটারি কিনছে, সেটাতেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কিন্তু বাদ সাধেনি। তার অর্থ হচ্ছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র জানে, আমি যা চাই তার সব কিছু ভারত বা যুক্তরাষ্ট্র দিতে পারবে না, সব জায়গায় তাদের সরবরাহের সক্ষমতা নেই। সেখানটায় যদি আমি চীনের থেকে সক্ষমতা নিই তাহলে সেটা তারা গ্রহণ করছে, আপত্তি নেই তাদের, যদি আমি সেটা তাদের সামনে যথাযথভাবে উপস্থাপন করতে পারি। সেই জায়গায় আমার সক্ষমতা এবং দক্ষতা এখানে একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে বলে আমি মনে করি।

দেশ রূপান্তর : সময় দেওয়ার জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে।

এম হুমায়ুন কবির : আপনাকেও ধন্যবাদ।

অনুলিখন : মোজাম্মেল হৃদয়

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত