শিহাবের ধ্যান-জ্ঞান আরবি ক্যালিগ্রাফি

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৪, ১২:৪৪ এএম

টিভিতে একজন ক্যালিগ্রাফারের ইন্টারভিউ দেখে তিনি ক্যালিগ্রাফিতে উদ্বুদ্ধ হন। ওই ক্যালিগ্রাফারের নাম উসামা হক। পরবর্তী সময়ে তিনি উসামার কাছে ক্যালিগ্রাফির কোর্স করেন। এখন তিনি নিজে যেমন ক্যালিগ্রাফি করেন তেমনি শতাধিক মানুষকে ক্যালিগ্রাফি শিখিয়েছেন। ক্যালিগ্রাফি করে তার মাসে আয় প্রায় ২৫ হাজার টাকা। এতক্ষণ যে ক্যালিগ্রাফারের গল্প বলা হলো তিনি হলেন শিহাব উদ্দিন আয যুহরী। জামিয়া রাজ্জাকিয়া জুবদাতুল উলুম ব্রাহ্মণবাড়িয়া মাদ্রাসায় পড়াশোনার পাশাপাশি ক্যালিগ্রাফি করে সবার নজর কেড়েছেন। তার বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরে। অবসরে বাসায় বসেই ক্যালিগ্রাফির জগতে ডুব দেন তিনি।

২০২০ সালে শুরুটা ওসামা হকের কোর্সের মাধ্যমে হলেও এরপরে তিনি বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফার মাহবুব মুর্শিদের দুটি কোর্স সম্পন্ন করেন। নিজে কোর্স করাচ্ছেন সেটাও দেড় বছর হলো। শতাধিক শিক্ষার্থী তার কাছে ক্যালিগ্রাফি শিখেছে বলে জানান। অনলাইন অফলাইন দুভাবেই তার কোর্স আছে। অফলাইনে তিন মাস মেয়াদি কোর্স এবং অনলাইনে আড়াই মাস মেয়াদি।

শখের বসেই তার ক্যালিগ্রাফি করা। এটা করতেই ভালো লাগে। তাই অন্য কোনো শৌখিন কাজে তার যুক্ত হওয়া হয়নি। কখনো কখনো নিজের মতো লিখেন। কখনো বা কাস্টমার যা চান সেটাই লিখে দেন। তবে লেখাটা সুন্দর করতে তার চেষ্টার একটুও কমতি থাকে না। তার পেইজের নাম ‘আয যুহরী’স ক্যালিগ্রাফি’। এখান থেকেই তিনি ক্যালিগ্রাফি বিক্রি করেন।

শিহাবের কাছে আয় মুখ্য নয়। তিনি চান আগ্রহীদের ক্যালিগ্রাফিটা ভালো করে  শেখাতে। নিজের ক্যালিগ্রাফিতে যেন প্রাণ থাকে। তিনি সব সময় চেষ্টা করে যান। আজ ক্যালিগ্রাফার হিসেবে বেশ ভালো সুনাম হলেও শুরুতে নানা বাধার মুখে পড়েছেন তিনি। পরিবার সায় দেয়নি। তবে আস্তে আস্তে নিজের চেষ্টায় তিনি একটা জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছেন। অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় ক্যালিগ্রাফির মাধ্যমে প্রথম আয় করেন তিনি। সেটা ছিল ২ হাজার টাকা।

ক্যালিগ্রাফি জীবনে একটি আনন্দময় ঘটনা শিহাব আজও ভুলতে পারেন না। ঘটনাটি হলো, একদিন হঠাৎ করেই প্রিন্সিপাল স্যার ডেকে নিয়ে বলেন, আমাদের পাঠাগারে তোমার কিছু কাজ সংরক্ষণ করতে চাই। বাজেট নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। কিছুদিন আগে হওয়া ছাত্র আন্দোলনের সময় শিহাব বসে থাকেননি। ওই সময়ে ইউরোপিয়ান স্টাইলে গ্রাফিতি করে রীতিমতো হইচই ফেলে দেন। সব মহলে তার কাজ প্রশংসিত হয়।

ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর, কিশোরগঞ্জ জেলা, বুয়েটের মেইন ক্যাম্পাসের সামনেসহ বিভিন্ন জায়গায় সব মিলিয়ে প্রায় ৩৫টির বেশি গ্রাফিতি করেছেন তিনি। মূলত গ্রাফিতিতে আরবি অক্ষর ব্যবহার করে ইনসাফ, ইনকিলাব, ইহসান ইত্যাদি লিখে থাকেন। গ্রাফিতি যে কেবল বাইরের দেয়ালে করতে হয় এমন নয়। বাসার দেয়ালেও করা যায়। বাসার দেয়ালে কাজ করার ক্ষেত্রে একটু দামি কালার ব্যবহার করেন শিহাব। যেন কাজটা দীর্ঘমেয়াদি এবং দেখতে সুন্দর হয়। পড়াশোনা এবং ক্যালিগ্রাফি এক সঙ্গে দুটো করতে গিয়ে মাঝে মধ্যে হিমশিম খেতে হয় তাকে। তখন অতিরিক্ত চাপ নিয়ে পড়াশোনা কভার করতে হয়। তবে ক্যালিগ্রাফির জন্য শিহাব আলাদাভাবে সময় নির্ধারণ করে রাখেন।

ভালো কাজ করলে মানুষ তো তার প্রশংসা করবেই। আর সে প্রশংসা যদি হয় শিল্পবোদ্ধাদের কাছ থেকে তাহলে তো তার তুলনাই হয় না। বিখ্যাত ক্যালিগ্রাফি শিল্পী মাহবুব মুর্শিদ একদিন কর্মশালায় সবার সামনে বলেছিলেন, ‘সে হলো আমাদের যুহরী। নাম্বার ওয়ান। আমরা যা শুরু করতে সাহস করিনি, তা এই ছেলে শেষ করে ফেলেছে। মূলত এই কথাটা তিনি বলেছিলেন শিহাব উদ্দিন আয যুহরীর ইংরেজি নিয়ে কাজ করা প্রসঙ্গে।

বন্যাসহ দেশের যেকোনো দুর্যোগে শিহাব এগিয়ে আসেন। মানুষের পাশে দাঁড়ান। এবারের বন্যার সময় দুটো শিল্পকর্ম বিক্রি করে সেখান কিছু অর্থ বন্যার্তদের জন্য দেন। ভবিষ্যতে অন্য যে পেশাতেই যান না কেন শখ, ভালোলাগা, ভালোবাসা হিসেবে ক্যালিগ্রাফি করবেন। নিজের কাজ দেশের বাইরে পৌঁছে দেবেন। এমনটাই তার আগামী দিনের ভাবনা।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত