প্রকৌশলগত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে যানজট থেকে মুক্তি

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:৪০ এএম

ঢাকা মহানগরীতে সিটি সার্ভিসের বাস পরিষেবা উন্নত করে রুট রেশনালাইজেশন পদ্ধতি চালু করতে হবে। একই সঙ্গে বাসের জন্য প্রাধিকার লেইনের ব্যবস্থা করে নগরীর প্রধান প্রধান সড়ক থেকে রিকশা, ইজিবাইকসহ ছোট ছোট যানবাহন তুলে দিতে হবে। এভাবে প্রকৌশলগত ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা চালু হলে যানজট কমে আসবে।

গতকাল রবিবার সকালে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে ‘গণপরিবহন সংকট ঢাকার ভয়াবহ যানজটের মূল উৎস-মুক্তি চাই নগরবাসী’ শীর্ষক এক সংবাদ সম্মেলনে যানজট সমস্যা থেকে বেরিয়ে আসতে যাত্রী কল্যাণ সমিতি থেকে ১২টি সুপারিশ করা হয়।

সংগঠনের মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী বলেন, যত্রতত্র যাত্রী ওঠানামা, পরিবহন সংশ্লিষ্টরা নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করায় ভয়াবহ যানজটে নাকাল রাজধানীবাসী। নগরীর এক প্রান্ত থেকে যে কোনো গন্তব্যে যেতে ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার বেশি সময় পেরিয়ে যাচ্ছে। ঢাকার যানজটে প্রতিদিন নষ্ট হচ্ছে কর্মক্ষম মানুষের ৮২ লাখ কর্মঘণ্টা। বুয়েটের তথ্য বলছে, প্রতি বছর এই যানজটে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৫০ হাজার কোটি টাকা।

যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরে সংগঠনের মহাসচিব আরও বলেন, রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা বহুযুগ আগেই ভেঙে পড়েছে। নগরীতে চলাচলকারী বাস-মিনিবাস রঙচটা, বিবর্ণ, লক্কড়-ঝক্কড়, পেছনের লাইট-ইন্ডিকেটর আর সামনের লুকিং গ্লাস নেই। আসনে দুই-পা মেলে বসা যায় না। বাসে ওঠানামার পা দানি, হ্যান্ডেল ভাঙা থাকে। নারী, শিশু, প্রতিবন্ধী, বয়স্ক, অসুস্থদের জন্য এসব বাসে ওঠানামা এবং ভেতরে গাদাগাদি করে যাতায়াত করা চরম এক নারকীয় অবস্থা। তার ওপর অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের নৈরাজ্য, চালক শ্রমিকদের দুর্ব্যবহার তো রয়েছেই। এমন বাস্তবতায় সামর্থ্যবানরা ধার-দেনা করে ব্যক্তিগত গাড়ি কিনছেন। অন্যরা মোটরসাইকেলে রাইড শেয়ারিং, অটোরিকশা, ইজিবাইক পাঠাও-ওবারের মতো ছোট ছোট যানবাহনে স্বাচ্ছন্দ্যে যাতায়াতের দিকে ঝুঁকছেন। ফলে নগরীতে বিশৃঙ্খল বাসের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ৪ লাখ প্যাডেলচালিত রিকশা, ৬ লাখ ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইক, ১ লাখ ৩৪ হাজার রাইড শেয়ারিংয়ের ছোট ছোট যানবাহন, ৩০ হাজার সিএনজিচালিত অটোরিকশা অবাধ যাতায়াতের কারণে নগরীর যানজট ও জনজট চরমভাবে বেড়ে চলেছে।

তিনি আরও বলেন, যানবাহন নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিকব্যবস্থা এখনো সেকেলে পদ্ধতিতে রয়েছে। সরকার পরিবর্তনের পরে নগরীর ৪ হাজার ট্রাফিক পুলিশ এখনো নিষ্ক্রিয়। যানজট কমাতে প্রকৌশলগত গবেষণা করে ২ বা ৩ লেইনের ছোট ইন্টার সেকশনে ট্রাফিক সিগন্যাল ১ থেকে ২ মিনিট আর বড় ইন্টার সেকশনে ট্রাফিক সিগন্যাল ২ থেকে ৩ মিনিট চালু রাখা; যানজট হয় না এমন স্পটগুলোতে বাস স্টপেজ তৈরি করা, যত্রতত্র বাস দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা বন্ধ করে নির্দিষ্ট বাস স্টপেজ থেকে যাত্রী তোলা বাধ্যতামূলক করা জরুরি বলে দাবি করে সংগঠনটি।

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বিআরটিএর তথ্যমতে রাজধানীতে প্রতিদিন গড়ে ছোট ছোট ৮০০ গাড়ি নামছে। জাইকার সমীক্ষা অনুযায়ী ঢাকা মহানগরীতে প্রতিদিন গড়ে ৪ কোটি ট্রিপ যাত্রী যাতায়াত হয় এর ৬০ শতাংশ গণপরিবহন ব্যবহার করেন। এসব যাত্রীর ৬৭ শতাংশ কেবল বাস ব্যবহার করেন। অথচ ঢাকা সিটি বাসের মান-গুণ যাত্রীসেবার গত ২০ বছর ধরে কিছুই ঠিক নেই। ঢাকার যানজট কমাতে হলে সর্বপ্রথম বাস-মিনিবাস ব্যবস্থা ঠিক করতে হবে। বাস রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে বাসের জন্য প্রাধিকার লেইনের ব্যবস্থা করতে হবে। ছোট ছোট যানবাহনের নিবন্ধন ও নগরীর প্রধান সড়কে এসব যানবাহন চলাচল বন্ধ করতে হবে।

ভারতের উদাহরণ তুলে ধরে মোজাম্মেল হক বলেন, দিল্লিতে ১২টি মেট্রোলাইন, ২৮৮ স্টেশন, ৩৯৩ কিলোমিটার মেট্রোরেল পরিষেবা থাকার পরেও পাবলিক বাসগুলো মেট্রোর চেয়ে বেশি যাত্রী বহন করে। দিল্লিতে এক সময় চুক্তি ভিত্তিতে চলাচলকারী বেসরকারি বাসের তীব্র প্রতিযোগিতা, যানজট ও দুর্ঘটনা লেগেই ছিল। ২০১১ সালে বেসরকারি বাস তুলে দিয়ে ক্লাস্টার বাস চালু করে। ৬৫৭টি এলোমেলো বাসরুট বন্ধ করে ১৭টি ক্লাস্টারে বিভক্ত করা হয়। সেখানে সরকারি ডিটিসি বাস ও সরকারি-বেসরকারি পিপিপি বাস ৫০:৫০ অনুপাতে চালু করা হয়। কোন ক্লাস্টারে কোন কোম্পানি বাস পরিচালনা করবে, তা প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়। এই কারণে যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা যায় না।

তিনি বলেন, বর্তমানে দিল্লির বাস সার্ভিস পুরোপুরি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দিল্লি ট্রান্সপোর্ট করপোরেশনের (ডিটিসি) নিয়ন্ত্রণে। সেখানে দুই ধরনের মালিকানায় বাস চলে, পুরোপুরি ডিটিসি মালিকানাধীন লাল ও সবুজ রঙের বাস এবং পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ মেকানিজমে কমলা রঙের ক্লাস্টার বাস। এসব বাসে বেশিসংখ্যক যাত্রী পরিবহন করে থাকে। এই নীতি অনুসরণ করে ঢাকার বাসে মান উন্নত করে, বাসের জন্য প্রাধিকার লেইনের ব্যবস্থা করা গেলে, বাসে প্রাইভেট পরিবহন থেকে দ্রুতগতিতে যাতায়াত করা গেলে ব্যক্তিগত যানবাহন কমে এলেই ঢাকার যানজট সমস্যার ৫০ শতাংশ সমাধান সম্ভব।

১২টি সুপারিশের মধ্যে হলো রাজধানী ঢাকায় উন্নত সিটিবাসের ব্যবস্থা করা; বাস রুট রেশনালাইজেশনের মাধ্যমে বাসের জন্য প্রাধিকার লেইনের ব্যবস্থা করা; এই মুহূর্তে ঢাকায় মোটরসাইকেলসহ ছোট ছোট যানবাহন নিবন্ধন জরুরি ভিত্তিতে বন্ধ করা; রাজধানী ঢাকার প্রধান প্রধান সড়ক করিডর থেকে প্যাডেলচালিত রিকশা, ইজিবাইকসহ ধীরগতির যানবাহন চলাচল বন্ধ করা; ফুটপাত দখলমুক্ত করা, ফুটপাতে স্বাচ্ছন্দ্যে পথচারী যাতায়াতের ব্যবস্থা করা, প্রয়োজনে সড়কের মিডিয়ানে উড়াল ফুটপাত তৈরি করাসহ বেশ কয়েকটি সুপারিশ করা হয়।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত