পুলিশ মানে (Polite, Obedient, Loyal, Intelligent, Courageous Ges Efficient) অর্থাৎ একজন মানুষের মধ্যে যখন এ ধরনের অসাধারণ গুণাবলির সমন্বয় ঘটে, তখন একজন আদর্শ পুলিশ সদস্য হয়ে ওঠেন। পৃথিবীর অনেক দেশে পারিবারিক ও সামাজিক নীতিনৈতিকতা ও মূল্যবোধ সৃষ্টি ও রক্ষায় কাজ করছে পুলিশ। যদিও অনেক আগে থেকেই সরকারের ‘লাঠিয়াল বাহিনী’ হিসেবে পুলিশকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
প্রতিটি সভ্য ও গণতান্ত্রিক দেশে জননিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রে পুলিশ বাহিনীর ভূমিকাকে অত্যন্ত গুরুত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা প্রায়ই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন, যা অন্য কোনো চাকরিতে খুব কম দেখা যায়। সাম্প্রতিক গণ-অভ্যুত্থানের পরে এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ। দেশের ইতিহাসে পুলিশ সবসময়ই জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে। যখনই দেশে সংকট সৃষ্টি হয়েছে, পুলিশ বাহিনী জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেই সংকট মোকাবিলা করেছে। দেশের জনগণের সার্বক্ষণিক নিরাপত্তায় পুলিশের সংখ্যার অনুপাত অনেক অনুন্নত দেশের থেকেও কম। পাশাপাশি জনগণের মধ্যে রয়েছে আস্থার ঘাটতি। কোনো সরকার যখন হীন দলীয় স্বার্থে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করে, তখনই তারা দাঁড়িয়ে যাচ্ছে জনগণের বিরুদ্ধে। ঠিক সেই মুহূর্তে প্রশ্ন আসে সংস্কারের।
ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের গুলিতে শিক্ষার্থীসহ অসংখ্য নিরীহ লোকজন মারা গেছে। আন্দোলনের সময় পুলিশের বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে দেশ-বিদেশে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। ফলে পুলিশের সংস্কার করতে কমিশন গঠন করা হয়েছে। কমিশন কাজও শুরু করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের এই উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। পুলিশ সংস্কারের জন্য পুলিশ সদর দপ্তর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কমিশনের কাছে প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে। ওই প্রস্তাবনায় ব্রিটিশ আমলের আইনের সংশোধন করাসহ ৩৯টি বিষয়ে প্রস্তাবনা দেওয়া হয়েছে। তাছাড়া কমিশন সুশীল সমাজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকেও মতামত নিচ্ছে। এ বিষয়ে পুলিশের সংস্কার কমিশনের প্রধান ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাবেক সিনিয়র সচিব সফর রাজ হোসেন বলেন, ‘কমিশনের কাজ শুরু হয়েছে। জনবান্ধব পুলিশ গঠন করতে যা করা দরকার সেই সুপারিশ করা হবে। আমরা সবাইকে নিয়ে কাজ করব। পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাবনা তৈরি করে তিন মাসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষের কাছে জমা দেওয়া হবে। পুলিশ সদর দপ্তর একটি প্রস্তাবনা পাঠিয়েছে। পুলিশও চাচ্ছে জনবান্ধব পুলিশ গঠন করতে।’ বাংলাদেশ পুলিশ প্রজাতন্ত্রের বাহিনী। এ প্রতিষ্ঠানের কাজ হচ্ছে রাষ্ট্র কর্তৃক ক্ষমতাপ্রাপ্ত আইন কার্যকর, সম্পত্তি রক্ষা, সামাজিক অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা এবং জনগণের নিরাপত্তা রক্ষা। যখন যে দল ক্ষমতায় এসেছে তখনই সেই দল রাজনৈতিক কাজে পুলিশকে ব্যবহার করেছে। এতে বাংলাদেশ পুলিশ কোনোভাবেই জনবান্ধব হতে পারেনি। পুলিশে রাজনীতিকরণ শুরু হয়েছে বহু আগে।
পুলিশের ওপর মানুষের যে আস্থা নষ্ট হয়েছে, সেটি ফিরিয়ে আনতে হবে। পুলিশের শতভাগ সদস্য দুর্নীতিগ্রস্ত বা দলীয় ক্যাডার নন। পুলিশকেও এ বিষয়ে স্পষ্ট করে নিজেদের অবস্থান ঘোষণা করতে হবে যে, তারা দলমত নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তায় আন্তরিকভাবে কাজ করবেন। শুধু পুলিশের সংস্কার করে এই সংস্থাকে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করে তোলা কঠিন। কারণ কেবল পুলিশের সংস্কারই যথেষ্ট নয়, প্রশাসনের অন্যান্য ক্ষেত্রের ঊর্ধ্বতন অংশ যদি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত থাকে, তাহলে পুলিশ বাহিনী থেকে দুর্নীতি দূর করা কতটুকু সম্ভব? পুলিশ হবে জনবান্ধব এর বাইরে কোনো কথা থাকতে পারে না। সম্ভবত সেই পথেই সরকার হাঁটছে। আমাদের প্রত্যাশা, পুলিশ নিয়ে ভবিষ্যতে আর কোনো ধরনের বিতর্ক হবে না।
