সেক্যুলার ইসরায়েলিদের নীরব প্রস্থান

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৪, ১২:১১ এএম

নোবেল লরিয়েট অধ্যাপক অ্যারন সিচেনওভার চলতি গ্রীষ্মে নির ওজ কিব্বুৎজে ইসরায়েলিদের বড় একটি জমায়েতে হাজির হয়েছেন। তারা সবাই যুদ্ধবিরতি এবং জিম্মি হওয়া স্বজনদের মুক্তির দাবিতে জড়ো হয়েছেন। উল্লেখ্য, নির ওজ কিব্বুৎজে হলো সেই জায়গা, যেটি গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের (ফিলিস্তিনের স্বাধীনতাকামী সংগঠন) আক্রমণের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সে সময় এই বসতির এক-চতুর্থাংশ মানুষ হয় নিহত অথবা জিম্মিদশার মুখে পড়েছেন। এখনো ২৯ জনের মতো গাজা উপত্যকায় রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

হামাসের হাতে থাকা জিম্মিদের ফিরিয়ে আনা সম্ভব না হলে ইসরায়েলি সমাজের স্বাভাবিক সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়বে এবং এর প্রভাব পুরো ইসরায়েল রাষ্ট্রের ওপর এসে পড়বে এমন সতর্কবাণী শুনিয়েছেন চিকিৎসাশাস্ত্রের ৭৭ বছর বয়সী অধ্যাপক। নোবেলজয়ী এ অধ্যাপক বলেন, চিকিৎসক ও অন্য পেশাজীবীদের মধ্য থেকে ‘মেধা পাচার’ হচ্ছে। বিষয়টি এমনই উদ্বেগজনক যে, ইসরায়েলি অভিজাতদের অনেকে ভবিষ্যতে দেশে অবস্থান করা নিরাপদ মনে করছে না। আর এসব মানুষ ছাড়া ইসরায়েল রাষ্ট্র ভবিষ্যতে ধ্ুঁকবে।

সিচেনওভার দীর্ঘদিন থেকে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর সমালোচক। যুদ্ধের আগে তিনি নেতানিয়াহু সরকারের বিরুদ্ধে রাস্তায় নেমেছিলেন। এ ধরনের উদ্বেগ শুধু যে ইসরায়েলের বিরোধী পরিসরের নেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, বিষয়টি মোটেও তেমন না। এ বছরের শুরুতে খোদ নেতানিয়াহু সরকারের ‘ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিল’-এর চেয়ার ইউজিন কান্দেল প্রশাসনিক বিশেষজ্ঞ রন টিজুরের সঙ্গে সুর মিলিয়ে সতর্ক করেন, ইসরায়েল অস্তিত্ব সংকটের মুখে।

এ অবস্থায় একটি নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্তের আহ্বান জানিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী কাগজ (গবেষণাপত্র) প্রণয়ন করা হয়েছে, যেখানে বলা হয়, আগামী কয়েক দশকের মধ্যে সার্বভৌম ইহুদি রাষ্ট্র হিসেবে ইসরায়েলের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে না পারার বিরাট সম্ভাবনা রয়েছে। ওই কাগজে বর্ণিত ঝুঁকিগুলোর মধ্যে দেশত্যাগের প্রবণতাকে বড় কারণ হিসেবে দেখানো হয়েছে। বিশেষত, ইসরায়েলের উন্নত তথ্যপ্রযুক্তি খাত যারা গড়ে তুলেছেন তারা এই কাতারে রয়েছেন। বৈশ্বিক অভিজাতদের কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা স্কুল ও হাসপাতালগুলোতেও এই প্রবণতার প্রভাব দেখা গেছে। কাগজটিতে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘ইসরায়েলের প্রবৃদ্ধির অগ্রযাত্রার ইঞ্জিন হলো উদ্ভাবনী কৌশল এবং এটি চালিত হয় এক কোটি জনসংখ্যার দেশটির মাত্র কয়েক হাজার মানুষ দ্বারা। সংখ্যায় খুব কম হলেও এসব মানুষের দেশত্যাগ দেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলবে। ইসরায়েলের জনমিতি ও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রগতিবাদী ও সেক্যুলার মানুষজন প্রথাগত ধর্মীয় আধিপত্যের বাড়বাড়ন্তের মাঝে ভবিষ্যতে দেশে নিজেদের অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্নের মুখে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।’

নোয়াম তিন সন্তানের জনক। একটি জনসংযোগ (পিআর) প্রতিষ্ঠান ও ফার্মেসি রয়েছে তার। তিনি ভাবতেন, কয়েক দশকের পরিশ্রম শেষে চল্লিশের কোঠায় পৌঁছানোর পর তিনি হয়তো কম কাজ করবেন, আর জীবনটাকে অনেক বেশি উপভোগ করবেন। কিন্তু এসব চিন্তাভাবনা এখন ঝাপসা মনে হচ্ছে। এখন তিনি ও তার স্ত্রী চিন্তা করেন, ইউরোপের কোনো দেশে সন্তানদের ভালো স্কুলের বিকল্প রয়েছে কিনা। আরও ভাবেন, কোথায় গিয়ে নতুন একটা জীবন শুরু করা যায়। চলতি যুদ্ধ যেন সেই আকুতিকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে। দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণেই এ ধরনের সিদ্ধান্তের দিকে ঝুঁকতে হচ্ছে। নোয়াম বলেন, ‘সন্তানদের জন্য সুন্দর একটি ভবিষ্যৎই আমাদের চলে যাওয়ার প্রধান কারণ। এমনকি আগামীকালও যদি শান্তির জন্য সমঝোতা হয়, তাহলেও আমরা ভবিষ্যতের সঙ্গে নিজেদের জুড়ে নেওয়ার কথা ভাবছি না।’

নোয়াম বিশ্বাস করেন, ইসরায়েলের অর্থনীতি আল্টরা-অর্থডক্স মতাদর্শের ইহুদি তরুণ জনগোষ্ঠী বৃদ্ধির কারণে বাধাগ্রস্ত হবে; কারণ এসব তরুণ গণিত ও বিজ্ঞান অধ্যয়ন না করার পাশাপাশি ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে অনাগ্রহী। সামাজিকভাবে, ধর্মীয় রক্ষণশীলতা বৃদ্ধির কারণে সেক্যুলার তথা ধর্মনিরপেক্ষ ইহুদিদের জীবন কঠিন হয়ে যাবে বলে তিনি মনে করছেন। তিনি বলেন, ‘আপনি আমাকে যদি জিজ্ঞেস করেন, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি। এর উত্তর হলো, আপনি ইরানি মডেলের দিকে নজর দিন, যেখানে প্রাত্যহিক জীবনে ধর্মই মূল ভূমিকা পালন করে।’

নেগেভ অঞ্চলের গুরিয়ন ইউনিভার্সিটির সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের অধ্যাপক উরি র‌্যাম বলেন, উদার গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ইসরায়েলির সংখ্যা দেশটির মোট জনগোষ্ঠীর ক্রমহ্রাসমান ক্ষুদ্র একটি অংশ। ২০১৫ সালে ইসরায়েলের ইহুদি জনগোষ্ঠীর সংখ্যালঘু অংশ, যদিও শতাংশের হিসেবে ৪৫ ভাগ, নিজেদের সেক্যুলার মনোভাবের বলে জানিয়েছিল। এখন এই হার কমতে শুরু করেছে; যার কারণ হলো, প্রথাগত ধর্মীয় ও আল্টরা-অর্থডক্স পরিবারগুলো গড়ে অধিক সন্তান ধারণ করছে। ওই অধ্যাপক জানান, ২০২৩ সালে এসে দেখা গেছে, প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর প্রথম শ্রেণিতে মাত্র ৪০ শতাংশ সেক্যুলার ধারায় রয়েছে।

নোয়ামের মতো সেক্যুলার উদারপন্থি দৃষ্টিভঙ্গি এবং ঐতিহ্যবাদী ধর্মীয়-নৃতাত্ত্বিক (এথনো-রিলিজিয়াস ট্রেডিশনালিস্ট) মনোভাবাপন্ন এই দুই গোষ্ঠীর মাঝামাঝি অবস্থানে থেকে ভবিষ্যতের ইসরায়েলের অস্তিত্ব অনুসন্ধান করতে অধ্যাপক র‌্যাম গবেষণা করছেন। তিনি তার পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে বলেন, ‘মেধা পাচার-সংক্রান্ত ঘটনা ক্রমে ক্রমে প্রবল হচ্ছে। প্রথমত, সামরিক ঝুঁকি হ্রাস না পেলে এবং দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্র ক্রমাগত সত্যিকার অর্থে জনতুষ্টিবাদী স্বৈরতন্ত্রের দিকে মোড় নিলে মেধা পাচারের প্রবণতা আরও বাড়বে।’ তিনি মনে করেন, এসব পরিস্থিতিতে উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণি তরুণ প্রজন্মকে বিদেশে পাঠায়। বিদেশের পড়াশোনা ও পেশাগত ক্ষেত্রগুলোতে ইহুদিদের বিস্তৃত যোগাযোগ রয়েছে। পরিবার ও কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যোগাযোগ তরুণ ও শিক্ষিত ইসরায়েলিদের পছন্দসই জায়গায় যুক্ত হতে সহায়তা করবে।

গত বছরের ৭ অক্টোবর হামাসের আক্রমণ ইসরায়েলিদের দেশত্যাগের মূল কারণ হয়তো নয়। তবে সেই ঘটনা এই প্রবণতাকে ত্বরান্বিত করেছে। বছরব্যাপী সতর্কসংকেত ও নানা হুমকির পর সন্তানদের একটি স্বাভাবিক শৈশব উপহার দিতে চান তিনি।

হামাসের অস্ত্রধারীরা এক হাজার ২০০ জনকে, যার বেশিরভাগই বেসামরিক, হত্যার পর সিংহভাগ ইসরায়েলি বিষয়টিকে রাষ্ট্রের ব্যর্থতা বলে মনে করেছে। ইসরায়েলিরা একে সেনাবাহিনীরও ব্যর্থতা মনে করছে, যাদের ওপর নিরাপত্তার দায়িত্ব ছিল। আর সেনাবাহিনী গাজা থেকে এখনো জিম্মিদের উদ্ধার করতে পারেনি। অনেকে মনে করেন, রাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরায়েলিদের সামাজিক চুক্তি ভেঙে পড়েছে। কারণ অনেকে মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে তাদের সন্তানকে যুদ্ধে পাঠাচ্ছে, অথচ আল্টরা-অর্থডক্স পুরুষরা সামরিক কর্মকা- থেকে রেহাই পাচ্ছে। ডিরর স্যাদট এবং তার সঙ্গী যুদ্ধ শুরুর পর তাদের দেশত্যাগ পরিকল্পনা আরও এগিয়ে নিতে সক্রিয় হন। তাদের শঙ্কা হলো, বড় সংখ্যক ইসরায়েলি এই যুদ্ধকে সমর্থন করে যাচ্ছে, যেটি এরই মধ্যে ৪১ হাজারের বেশি প্রাণহরণ করেছে এবং নিহতদের বেশিরভাগই বেসামরিক ফিলিস্তিনি। এই নারীর ভাষ্য, যারা নিজেদের বামপন্থি বলে পরিচয় দেয়, তারাও বলা শুরু করেছে, এটি ন্যায়সঙ্গত লড়াই।

স্যাদট ও তার পরিবার ৭ অক্টোবরের মাসখানেক পরই জার্মানির বার্লিনে পাড়ি জমান এবং এখন তাদের ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা নেই। জার্মান শেখাটা কঠিন হলেও তিনি অন্যভাবে দক্ষতা অর্জনের চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘সর্বোত্তম পরিস্থিতিতে ইসরায়েলে (নিজের মতামতের জন্য) লোকে আমাকে পাগল বলে। আর একদম বাজে অবস্থায় বিশ্বাসঘাতক আখ্যা দেয়। এখানে (জার্মানিতে) অন্তত আমার মতটুকু প্রকাশ করতে পারি।’ তার অনেক বন্ধুবান্ধবও দেশত্যাগ করতে চায়, এমন কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সবাই এ নিয়ে আলাপ করে। তবে অল্প লোকই তা করতে পারে। দেশত্যাগ সময়সাপেক্ষ আর সবার সেই সুযোগ হয়ও না। বিশেষ করে সবাই ফিলিস্তিনিদের কথা বলে। কিন্তু অনেক ইসরায়েলিও রয়েছে, যাদের দ্বিতীয় পাসপোর্ট নেই এবং অনেকের পরিবার রয়েছে।’

ঠিক কতজন ইসরায়েলি দেশ ছেড়েছেন, এর কোনো সঠিক মূল্যায়ন করা কঠিন। ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’ জানায়, ২০২৩ সালে যুদ্ধ শুরুর আগে নেতানিয়াহু সরকারের বিচার বিভাগ সংস্কার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে জন-অসন্তোষের সময়ে দেশ ছাড়েন ৩০-৪০ হাজার ইসরায়েলি।

নোবেল লরিয়েট অধ্যাপক অ্যারন সিচেনওভার কথা দিয়ে লেখাটি শুরু হয়েছিল। সিচেনওভার ভয় পাচ্ছেন এই ভেবে যে, ইসরায়েলিদের অভিবাসনের ব্যাপারটি সরকারি হিসাব-নিকাশ ও পর্যবেক্ষণের চেয়েও দ্রুত ঘটছে। অন্য দেশে পরীক্ষায় পাস করা, আবাসন ব্যবস্থা করা এবং চাকরি জোগাড়সহ নানা কাজ করতে সময় লাগে। এক্ষেত্রে অনেক সহকর্মী প্রক্রিয়া শুরুর মুহূর্তে পরিবার ও বন্ধুদের কিছু জানান না। সিচেনওভারের ভাষায় এটি ‘নীরব প্রস্থান’। বিমানে ওঠার আগে কেউই কিছু বলেন না, এমনটাই তার পর্যবেক্ষণ। একজন শিশু বিশেষজ্ঞ সহকর্মীর কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ইসরায়েলে ফিরে আসার পরিকল্পনা বাদ রেখে ওই বিশেষজ্ঞ তিন বছরের জন্য ফেলোশিপের মেয়াদ বাড়িয়েছেন।

দি গার্ডিয়ান অনলাইন থেকে ভাষান্তর : মুজাহিদ অনীক

লেখক: গার্ডিয়ানের জ্যেষ্ঠ আন্তর্জাতিক প্রতিনিধি এবং মধ্যপ্রাচ্য ও এশিয়াভিত্তিক সাবেক সংবাদকর্মী

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত