বছর পাঁচেক আগে, দিল্লির ফিরোজ শাহ কোটলা স্টেডিয়ামেই (যার পরিবর্তিত নাম অরুন জেটলি স্টেডিয়াম), ভারতের মাটিতে ভারতকে হারানো প্রথম অধিনায়ক হিসেবে মাঠ ছেড়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ। সেই চেহারার সঙ্গে আজকের শ্মশ্রুম-িত মাহমুদউল্লাহর বিস্তর ফারাক। তখন ছিলেন নেতৃত্বে, এখন বিদায়ের দ্বারপ্রান্তে। এখনো কেন খেলছেন, এই প্রশ্নটা উঠেছে নানান জায়গা থেকে। এমনকি সিরিজ শুরুর আগের সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তও বলেছিলেন, ‘এই ব্যাপারটা আমার কাছে ঠিক স্পষ্ট না।’ সেই দিল্লিতেই অধিনায়ককে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে শেষের ঘোষণা দিলেন মাহমুদউল্লাহ। এই সিরিজ শেষেই আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন পঞ্চপা-বদের সবশেষ জন। কানপুরে সাকিব আল হাসান জানিয়ে দিয়েছিলেন, নিজের শেষ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলা হয়ে গেছে বিশ্বকাপেই, এবারে বিদায় বলে দিলেন মাহমুদউল্লাহও।
সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশের হয়ে সবচেয়ে বেশি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি খেলা ব্যাটসম্যান। তবে নামের পাশে ম্যাচসংখ্যার তুলনায় রান অনেক কম- ২৩৯৫। গড় ২৩.৪৮, স্ট্রাইক রেট ১১৭, ৮টা হাফসেঞ্চুরি খুবই বেমানান। শেষের ঘোষণা দেওয়ার সংবাদ সম্মেলনে মাহমুদউল্লাহ বলেছেন, তার ব্যাটিং পজিশনটাই এমন যেখানে সাফল্যের চেয়ে ব্যর্থতাই থাকবে বেশি, ‘টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট খেলতে গেলে আপনি যদি বেশি চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে পারফর্ম করতে পারবেন না। কোনোদিন সফল হবেন, কোনোদিন হবেন না। ছয় নম্বরে ব্যাট করাটা অনেক কঠিন, এখানে ৫টা ইনিংস খেললে খুব সম্ভবত ৩ ইনিংসে আপনি ব্যর্থ হবেন, একটা খুব ভালো হবে আর আরেকটা মাঝারি হবে। তবে নির্দিষ্টভাবে, ঐ পজিশনে ঐ ব্যাটসম্যানের জন্য এটাই কাজ। তাকে টিম ম্যানেজমেন্ট থেকে এবং বোর্ড থেকেও ব্যাক করতে হবে। বাইরে কী কথা হলো সেদিকে কান দেওয়া যাবে না। সে তার জায়গায় বাকি সবার আস্থা অর্জন করতে পারলে ঐ খেলোয়াড়টা অনেক ভালো করবে।’
রিয়াদ নিজেও যে কাজটা ভালোভাবে করতে পারছিলেন সেটাও নয়, অন্তত নিজের মাপকাঠিতে রিয়াদ সাম্প্রতিক সময়ে ব্যর্থ। বিশ্বকাপে বা তার আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সিরিজে এমনকি সবশেষ গোয়ালিয়রে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচেও পরিস্থিতির দাবি মেটানো ব্যাট করতে পারেননি মাহমুদউল্লাহ। একটা সময় নিয়মিত হাত ঘোরাতেন, এখন বোলিংয়েও অনিয়মিত। সেই সঙ্গে ফিল্ডিংও শ্লথ। যোগ হয়েছে প্রজন্মের পার্থক্য। সমসাময়িক ক্রিকেটারদের কেউই তো আর ড্রেসিংরুমে নেই। সবকিছু মিলিয়েই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তটা জানিয়ে দিলেন মাহমুদউল্লাহ, ‘ভারত সিরিজের জন্য অনুশীলন শুরুর সময় থেকেই চিন্তা করছিলাম। পরিবারকে বললাম, ওরা বলল যে এটা হয়তো সেরা সময় না। তখন আমি আবার ওদের বুঝাই। এরপর ওরা বুঝেছে এবং নির্বাচকদের সঙ্গে কথা বললাম কোচ-অধিনায়কের সঙ্গে কথা বললাম। তখন মনে হয়েছে এখনই অবসর ঘোষণার সেরা সময়।’ দেশের মাটিতেই শেষ ম্যাচ খেলে অবসর নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও আন্তর্জাতিক সূচিতে বাংলাদেশে পরবর্তী ম্যাচ পর্যন্ত দীর্ঘ সময়টায় জায়গাটা আঁকড়ে ধরে থাকতে চাননি, ‘এখন যদি আমি মনে করি বাংলাদেশ থেকে অবসর নেব তাহলে ব্যাপারটা ভালো দেখায় না। আর এটা ঠিকও হবে না হয়তো। তাই আমি মনে করছি এখনই সেরা সময় অবসর ঘোষণার জন্য।’
প্রায় দেড় যুগের দীর্ঘ ক্যারিয়ার। উত্থান-পতন, ভালো সময় খারাপ সময় সবই দেখেছেন। বিশ্বকাপে দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। পরের বছর বিশ্বকাপে আবার দল থেকে বাদও পড়েছেন। শেষ বলে ছক্কা মেরে দলকে জিতিয়েছেন আবার সহজ অঙ্ক মেলাতে পারেননি বেঙ্গালুরুতে। ক্যারিয়ারের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত আর সবচেয়ে হতাশার মুহূর্ত হিসেবে সেই দুটো ম্যাচকেই বেছে নিলেন মাহমুদউল্লাহ, ‘ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আলোকিত মুহূর্ত নিঃসন্দেহে নিদাহাস ট্রফির সেই ম্যাচটা। যে ম্যাচটা আমাদের জন্য সেমিফাইনাল হয়ে গিয়েছিল, শ্রীলঙ্কাকে হারানোর সেই ম্যাচ। হতাশাজনক মুহূর্ত বলব বেঙ্গালুরুতে ২০১৬’র টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ঐ ম্যাচটা আমার জীবনকেও বদলে দিয়েছিল।’
হারজিত, সাফল্য-ব্যর্থতা, উত্থান-পতন সব কিছু মিলিয়েই ২০০৭ সালের সেপ্টেম্বরে কেনিয়ার বিপক্ষে অভিষেক দিয়ে যে যাত্রার শুরু হয়েছিল, তারই শেষটা হবে হায়দরাবাদে। এই দীর্ঘযাত্রায় যারা পাশে ছিলেন সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েই সংবাদ সম্মেলনের ইতি টেনেছেন মাহমুদউল্লাহ, ‘মানুষের ভালোবাসা ও দোয়া না থাকলে এই পর্যন্ত আসতে পারতাম না। সাংবাদিকদেরও এই ধন্যবাদটা দিতে চাই। যারা আমাকে পছন্দ করেন না তাদেরও ধন্যবাদ দিতে চাই।’ সেই সঙ্গে জানিয়েছেন, দীর্ঘ ক্যারিয়ারে চাওয়া-পাওয়া, প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি নিয়ে কোনো আক্ষেপ নেই তার, ‘আমার আক্ষেপ নেই, এক ফোঁটাও আক্ষেপ নেই। বাংলাদেশের জন্য এতগুলো বছর খেলা এটা আমার জন্য বিশাল একটা বিষয়। ২০০৭-এ শুরু করে এতদিন পর্যন্ত আমি যতদূর এসেছি, জানি না কতটুকু সফল হয়েছি কিন্তু সত্যি বলতে আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি এবং আমি খুশি।’
মাহমুদুল্লাহ বলেন, ট্রফিই সব কিছু নয়, ‘আমাদের সময় বড় কোনো ট্রফি জিততে না পারলেও আমি মনে করি, আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। শুধু ট্রফিই সাফল্যের মানদণ্ড হতে পারে না। যদি ট্রফি জয়ই একমাত্র মানদণ্ড হয়, তাহলে অনেক কিংবদন্তিকে কিংবদন্তি বলা হতো না।’ মাহমুদউল্লাহ বলেছেন, পঞ্চপা-ব ছাড়াও অনেকের অবদান এ অগ্রযাত্রায়, ‘আমার মনে হয়, পঞ্চপা-ব ছাড়াও দলের প্রতিটি খেলোয়াড়, কোচ এবং ম্যানেজমেন্টের অবদান ছিল বিশাল। আমাদের সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ ক্রিকেট এক অন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে।’
টেস্ট ক্যারিয়ারের ইতির ঘোষণা এসেছিল আচমকা, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সেঞ্চুরি করে জানিয়েছিলেন অবসরের সিদ্ধান্ত। টি-টোয়েন্টি ক্যারিয়ারের শেষটাও কি রাঙাতে পারবেন মাহমুদউল্লাহ? এই দিল্লি একবার জয়ের মুকুট পরিয়েছিল তার মাথায়, আরও একবার কি সেই সৌভাগ্য হবে তার!
