অন্তর্বর্তী সরকারের দুই মাস পেরিয়ে গেছে। সরকারের অনেক কাজেই জনসাধারণ নাখোশ। কারণ জনসাধারণ কিছু বিষয়ে সন্তুষ্ট হতে পারেনি। যেমন নিত্যপণ্য মূল্যের লাগাম টানতে পারেনি। আগস্ট বিপ্লবে আহতদের চিকিৎসার পুরোপুরি দায়িত্ব সরকার নিতে পারেনি। বলা যায়, এসব কারণেই সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে সরকার নিয়ে এক ধরনের হতাশা কাজ করছে। মনে রাখতে হবে, এই সরকারের কাজের পরিধি আসলে খুব বেশি না। মনে হয়ে এটা সরকার বা জনসাধারণ কেউই বুঝতে পারছে না। সবাই মনে করছে, বর্তমান সরকার সব কিছুর সমাধান করে ফেলবে। সরকারের দায়িত্বশীলরাও মাঝে মাঝে এমন সব কথা বলছেন, অন্তর্বর্তী সময়ে তারা সব কাজে হাত দেবেন এবং সমাধান করে ফেলবেন। কিন্তু সবাইকে বিবেচনা করতে হবে, সরকারের মূল কাজ কী এবং এর চরিত্র বা ধরনটাই কেমন?
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, এটা জনগণ কর্তৃক নির্বাচিত বা বিপ্লবী কোনো সরকার না। বরং বলা যায়, বিপ্লবী ও নির্বাচিত সরকারের ধারণার বাইরে সংবিধান মেনে আপতকালীন একটি সরকার দেশ পরিচালনা করছে। এই সরকারের উপদেষ্টাদের বিশাল বোঝা নিজ দায়িত্বে মাথায় তুলে নেওয়া যুক্তিযুক্ত হবে না। সবাইকে বুঝতে হবে, সরকারের মূল কাজ হচ্ছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের আয়োজন করা। একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্যই এত রক্ত, এত আত্মত্যাগের বিনিময়ে দেশি-বিদেশি সমর্থনে সরকার গঠিত হয়েছে। কিন্তু একটি আলাপ সামনে চলে এসেছে যে, রাষ্ট্রের সংস্কার করতে হবে। ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ ধারণা বিশাল কর্মযজ্ঞকে নির্দেশ করে। রাষ্ট্রের এমন কোনো খাত নেই, যে খাতের সংস্কার করতে হবে না।
প্রতিটি ক্ষেত্রে পরিবর্তন আনতে হবে। সমাজের সর্বত্র ফ্যাসিবাদের থাবা বিস্তার করছিল। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু এটা সময়সাপেক্ষ। আমাদের ভাবতে হবে, বিশাল সংস্কার সম্পন্ন করার জন্য পর্যাপ্ত সময় এই সরকারের হাতে আছে কি না? সাধারণত বিপ্লবের পর দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংস্কার করা হয়। অথবা বিপ্লবীরা নিজেরাই সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। সে ক্ষেত্রে বিপ্লবীরাই ক্ষমতায় থাকে। এ ক্ষেত্রে আমরা ইরানের উদাহরণ দিতে পারি। ১৯৭৯ সালের ১৬ জানুয়ারি রেজা শাহ পাহলভি পালিয়ে যাওয়ার পর রিজেন্সি কাউন্সিল ও বিরোধী নেতা শাহপুর বখতিয়ার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নেন। ১ ফেব্রুয়ারি আয়াতুল্লাহ খোমেনি ইরানে ফিরে আসেন এবং ১১ ফেব্রুয়ারি ইরানের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এরপর নিজের মতো করে সংস্কার শুরু করেন। ফেব্রুয়ারি মাসে এক গণভোটের মাধ্যমে ইরান ইসলামিক প্রজাতন্ত্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেয় এবং খোমেনির নেতৃত্বে সরকার নতুন সংবিধান রচনার কাজ শুরু করে। এর মধ্যে খোমেনির ইরানকে নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু সব কিছুই সামলে নিয়ে ইরান তার পথে এখনো অটল আছে।
বিভিন্ন ধরনের অন্তর্কোন্দল, বহির্বিশে^র চাপের মুখেই ইরান বিপ্লবের এক বছরের মাথায়ই প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করে। আর ১৪ মাসের মাথায় মজলিশ বা সংসদের নির্বাচন সম্পন্ন করে। ফলে দেখা যাচ্ছে, ইরানের বিপ্লবীরা সংবিধানের মৌলিক চরিত্রের সংস্কার করে এক বছরের মাথায় সব ধরনের নির্বাচন সম্পন্ন করেছে। এরপর নির্বাচিত সরকার ও মজলিশ ইরানের রাষ্ট্র কাঠামোর খুঁটিনাটি ও বিস্তারিত সংস্কার করছে। মনে রাখতে হবে, ইরানে যারা বিপ্লব করেছিল তারাই এখনো ক্ষমতায় এবং সংস্কার তারাই করেছে। সাধারণত বিপ্লবীরাই রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করে এবং রাষ্ট্রকে সামনের দিকে নিয়ে যায়।
আমাদের এখানে বিপ্লবীরা রাষ্ট্রক্ষমতা গ্রহণ করেনি বা বিপ্লবী সরকার গঠন করা হয়নি। সংবিধানও কেউ বাতিল করেনি। সাধারণত বিপ্লবের পর রাষ্ট্র সংস্কারের প্রথম কাজ হিসেবে স্বৈরাচারের সংবিধানকে বাতিল করে বিপ্লবী সরকার গঠন করা হয়। আমাদের দেশেও কেউ কেউ সংবিধান স্থগিত করে বিপ্লবী সরকার গঠনের পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু ছাত্ররা তা না করে সংবিধানের ভেতরে থেকেই সরকার গঠন সমর্থন করেছে। ফলে এই সরকারকে কোনোভাবেই বিপ্লবী সরকার বলা যাবে না। বরং একে সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার সরকার বলা যায়। কিন্তু এই সরকার জনগণের মনোনীত নয়। ফলে তাদের পক্ষে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন আনা সম্ভব না। ইরানের ক্ষমতা পুরোটাই বিপ্লবীদের হাতে ছিল। যে কারণে প্রথমেই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, ইরানকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রে রূপান্তর করবে। এটা ছিল রাষ্ট্রের চরিত্রগত সংস্কার বা পরিবর্তন। এরপর নির্বাচন সম্পন্ন করে পুরো রাষ্ট্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে সার্বিক সংস্কার করেছে ইরানের বিপ্লবীরা।
শুধু ইরানই নয়, এমন উদাহরণ আরও অনেক দেওয়া যাবে। ফরাসি বা বলশেভিক বিপ্লবের পরও বিপ্লবীরা রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। কিন্তু আমাদের দেশে বর্তমান সরকার পুরোপুরি বিপ্লবীদের হাতে নেই। এখানে নানা ধরনের অংশীজন। তারা বিভিন্নভাবে সরকারকে পরিচালিত ও প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে। সময় যত যাবে তাদের প্রভাবও তত বাড়বে এবং সরকারের ইমেজ ক্ষয় হবে। নানা বিষয়ে হতাশার পরিমাণ আরও বাড়বে। ফলে সরকারের ভাবমূর্তি আগের মতো থাকবে না। যে কারণে এই সরকার বেকায়দায় পড়তে পারে।
অতিমাত্রায় উচ্চাভিলাষী না হয়ে এই মুহূর্তে সরকারের কাজ হচ্ছে দুটো। এক, দ্রুততম সময়ে নির্বাচনের আয়োজন করা। এই নির্বাচন আয়োজনের জন্য কাজের অগ্রাধিকারের তালিকা প্রস্তুত করতে হবে। কোন কোন কাজ করলে নির্বাচন সহজেই সম্পন্ন করা যাবে তার তালিকা করে কাজ শুরু করা। আমাদের রাষ্ট্রের চরিত্রগত কোনো পরিবর্তন আনতে হবে না। তাই সংবিধানের বড় ধরনের কোনো সংস্কার বা পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। গুরুত্ব দিতে হবে রাজনীতিতে যেন ফ্যাসিবাদ ও দুর্বৃত্তদের রাজনীতি আর ফিরে না আসতে পারে তার বন্দোবস্ত করা। রাজনীতি ঠিক করতে পারলে রাষ্ট্রের অন্যান্য খাতের অনিয়ম ও দুর্নীতি এমনিতেই কমে আসবে। এর জন্য নির্বাচন কমিশন ও গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশের পরিবর্তনের কথা ভাবতে পারে সরকার। রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরে গণতান্ত্রিক পদ্ধতি ও আচরণের বিস্তার ঘটাতে হবে। দলগুলোর ভেতরে গণতন্ত্র না থাকলে রাষ্ট্রে কখনোই গণতন্ত্র কায়েম করা সম্ভব হবে না। সরকারকে এসব বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে।
সরকারকে আরও একটি কাজ করতে হবে ফ্যাসিবাদী গণহত্যাকারীদের বিচার সম্পন্ন করা। এখানে ব্যক্তির পাশাপাশি গণহত্যাকারী ফ্যাসিবাদী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার করতে হবে। প্রয়োজনে বিচার করতে হবে আন্তর্জাতিক আদালতে। কারণ ভবিষ্যতে যেন বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে কোনো ধরনের বিতর্ক ও সমালোচনার সৃষ্টি না হয়। তাই বিশাল সংস্কারের দিকে না গিয়ে প্রয়োজনীয় কিছু সংস্কারের দিকে সরকারের মনোযোগ দেওয়া উচিত। এতে করে জনসম্পৃক্ত অন্য বিষয়গুলোতে মনোযোগ দিতে পারবে সরকার। একই সঙ্গে দ্রুততম সময়ে নির্বাচন আয়োজনের ঘোষণা দেওয়া প্রয়োজন। সংস্কারের জন্য নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়া বা দীর্ঘ সময় নেওয়ার প্রয়োজন নেই। এই সরকার দীর্ঘ সময় ক্ষমতায় থাকবে না। ফলে আগে নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত সরকার দিয়ে সংস্কারের উদ্যোগ নিতে হবে। তাহলে সংস্কার টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী হবে। যেটা ইরানে হয়েছে। ইরানের শাসন কাঠামো ও পদ্ধতি নিয়ে সমালোচনা আছে। কিন্তু ইরানের সংস্কারে ওই সময়ের জনসাধারণের সমর্থন ও অংশগ্রহণ ছিল বলেই এখনো টিকে আছে।
লেখক: রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সম্পাদক, দ্য মিরর এশিয়া
