এবারের কলকাতা ভ্রমণে মিশ্র নানা অভিজ্ঞতা নিয়েই ফিরেছি। শঙ্কিত হয়েছি ধর্মনিরপেক্ষ ভারতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রবল উত্থানে। পশ্চিম বাংলায় হিন্দুত্ববাদী বিজেপিকে তৃণমূল কংগ্রেসসহ প্রগতিশীলরা কতদিন ঠেকাতে পারবে, বলা কঠিন। মমতার দলও ইতিমধ্যে ফ্যাসিবাদী কর্মকা-ে ইমেজ হারাতে বসেছে। যারা বামফ্রন্টকে হটিয়ে তৃণমূলকে ক্ষমতায় এনেছিল তাদের মধ্যেও হতাশা দেখেছি। এ ছাড়া কেন্দ্রীয় শাসক দল বিজেপি তৃণমূলের দল ভাঙার নানা কৌশল প্রয়োগ করে ইতিমধ্যে সফলও হয়েছে। তৃণমূলের সাংসদ-নেতাদের নামে দুর্নীতির মামলা দিয়ে জেলে পুরে আপস ফর্মুলায় বিজেপিতে যোগদান করানোর নানা ঘটনাও বিজেপি ঘটিয়ে চলেছে।
পশ্চিম বাংলায় বিজেপিকে ঠেকানোর একমাত্র ঢাল হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে অনেকেই বিবেচনা করছেন বটে, তবে ভুলে গেলে চলবে না বিজেপি জোট সরকারের যুক্ততায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বিগত বিজেপি জোট সরকারের কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী হয়েছিলেন। পশ্চিম বাংলায় গদি বাঁচাতে মমতার একমাত্র তুরুপের তাসটি হচ্ছে পশ্চিম বাংলার ৩০ শতাংশ মুসলিম ভোট। কলকাতায় মার্ক্সবাদী একজন রাজনীতিকের সঙ্গে আমার দীর্ঘ আলাপ হয়েছিল। তিনি আমাকে বলেছেন, ‘দেখুন আমরা দেশভাগে পূর্ব বাংলা প্রত্যাগতরা প্রায় সবাই এ দেশে এসে বামপন্থায় প্রত্যক্ষে বা পরোক্ষে যুক্ত হয়েছিলাম। কিন্তু আমাদের পরের প্রজন্মরা এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে এ যাবৎ যারা এসেছে তারা সবাই আচানক বিজেপির সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে পূর্বপুরুষদের দেশত্যাগের বদলা নিতে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটাই বাস্তবতা। আসামে এবং ত্রিপুরায়ও হিন্দু ধর্মাবলম্বী পূর্ববঙ্গীয়রা বিজেপির ভোটব্যাংক হয়ে পড়েছে। পশ্চিম বাংলার ভবিষ্যৎ যে কোথায় গিয়ে ঠেকবে, বলা মুশকিল।’ তার বক্তব্যের উজ্জ্বল প্রমাণ তো পশ্চিম বাংলার বিগত বিধানসভার নির্বাচনের ফলাফল। যেখানে তৃণমূলের প্রাপ্ত ভোট ২ কোটি ৮৭ লাখ আর বিজেপির ২ কোটি ২৮ লাখ।
ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ককে একপেশে বলা মোটেও ভুল হবে না। বাংলাদেশের ওপর ভারত সর্বময় কর্তৃত্বপরায়ণ। আমাদের শাসকরা ভারতীয় চাণক্য বুদ্ধির কাছে নিঃশর্ত হার মেনে এবং ক্ষমতাকে নিরঙ্কুশ রাখার অভিপ্রায়ে ভারতের অন্যায়-অন্যায্য আবদার রক্ষায় দেশের স্বার্থ বিলিয়ে দিতে কুণ্ঠিত হয়নি। আমাদের নির্বাচনীব্যবস্থায় নানা অনিয়মের পাশাপাশি, প্রশ্নবিদ্ধ বিষয়গুলোকেও ভারত সরকার বৈধতা দিয়েছে স্বীয় স্বার্থে। বাংলাদেশে গণতন্ত্র থাক বা না থাক সেটা নিয়ে তাদের চিন্তা-দুশ্চিন্তা নেই। যেমনটি নেই মিয়ারমারের অগণতান্ত্রিক সামরিক সরকারের রোহিঙ্গা গণহত্যায়। মিয়ানমারে রোহিঙ্গা গণহত্যায় মিয়ানমার সরকারকেই ভারত সমর্থন জুগিয়ে এসেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম বর্বরতার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়নি, জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায়। একাত্তরে পাকিস্তানিদের গণহত্যার বিরুদ্ধে এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদান অনস্বীকার্য তবে তাতে রাজনৈতিক অভিসন্ধি যে ছিল সেটা তো অস্বীকার করা যাবে না।
আমাদের দেশের সরকার বৈধ কিংবা অবৈধ, গণতান্ত্রিক না অগণতান্ত্রিক সেটাও ভারতের বিবেচ্য বিষয় ছিল না। ভারত চায় অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক আধিপত্য এবং প্রতিবেশীর থেকে সুবিধা আদায়। রোহিঙ্গাদের নিয়ে বাংলাদেশের দুরবস্থার বিষয়েও ভারত সরকার মুখে কুলুপ এঁটে থেকেছে এবং থাকছে। বাংলাদেশের বিগত সরকারের রাজনৈতিক অবৈধতা এবং দুর্বলতার সুযোগ হাতিয়েই ভারত একতরফা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা আদায় করে নিয়েছে। তিস্তার পানি নিয়ে টালবাহানার যেন আর শেষ নেই। অথচ বাংলাদেশ থেকে করিডর আদায় তাৎক্ষণিকভাবেই স্বীয়স্বার্থে ভারত হাতিয়ে নিয়েছে। স্বীকার করতেই হবে ভারতকে করিডর সুবিধা দিয়ে বাংলাদেশের প্রাপ্তিটা শূন্য। করিডর দেওয়া নিয়ে দেশে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। গড়ে উঠছিল বিগত সরকারের নতজানু নীতির বিরুদ্ধে জনমত।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী পশ্চিম বাংলা সফর শেষে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, ‘ভারতকে যা দিয়েছি, তারা তা কোনোদিন ভুলতে পারবে না। তবে বাংলাদেশ বিনিময় চায় না। আমরা দিতেই ভালোবাসি, পেতে নয়।’ একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ভারতের স্বার্থে দেশের স্বার্থের একপেশে বলিদান নিয়ে দেশব্যাপী নানা প্রশ্ন উঠেছিল। দেশের তরুণ সমাজ কিন্তু বিষয়গুলোকে গভীরভাবে বিচার-বিশ্লেষণ করে বন্ধুরাষ্ট্র ভারতকে প্রভুতে পরিণত করার ক্ষেত্রে বিগত সরকারের ভূমিকায় হতাশ ও ক্ষুব্ধ ছিল। হাসিনা সরকারের ভারতনীতিও তার করুণ বিদায়ের পেছনের অন্যতম কারণ। পাশাপাশি তরুণ সমাজ ক্রমেই ভারতের কাছ থেকে হিস্যা বুঝে নিতে চাচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক স্বার্থরক্ষা করেই প্রতিবেশীসহ সব রাষ্ট্রের মধ্যকার সম্পর্ক গড়ে ওঠে। বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক একপাক্ষিক স্বার্থরক্ষার বিষয়টি দেশবাসী সংগত কারণেই সুনজরে দেখেনি। এতে বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ভারত প্রসঙ্গে সচেতনতা ও হিসেবি মনোভাব ক্রমেই ব্যাপকভাবে বিস্তার লাভ করেছে এবং করবেও। অবশ্য ভারত সরকারের একের পর এক বাংলাদেশবিরোধী ভূমিকার মুখে এটা অনাকাক্সিক্ষত ছিল না।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধে ভারতের অবদানকে আমরা গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি। পাকিস্তান ভেঙে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠায় ভারতের রাজনৈতিক সুবিধার বিষয়টি অসত্য নয়। এর জন্য পাকিস্তানিরাই দায়ী। ভারত কেবল সুযোগের মওকাটি অধিক বুদ্ধিমত্তায় গ্রহণ করেছিল। এ প্রসঙ্গে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বেলাল মোহাম্মদের ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ’ বইতে এ সম্পর্কিত ঘটনার বর্ণনা রয়েছে। ঘটনাটি এরূপ, আগরতলার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহের বাসভবনে বৈকালিক চায়ের নিমন্ত্রণে গিয়ে বেলাল মোহাম্মদের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটে মুখ্যমন্ত্রী শচীন সিংহ, নন্দিনী সৎপথী এবং ড. ত্রিগুণা সেনের। মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির লনে একান্তে আলাপে ড. ত্রিগুণা সেন বলেন, ‘ইয়াংম্যান, কাজ করে যাও। পহেলা নভেম্বর ১৯৭১ ঢাকায় বিজয় উৎসব হবে। জানো, ১৯৪৯ সালে আমরা ‘বাংলাদেশ সেল’ প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। তখন থেকে আমি ওই সেল-এর দায়িত্বে। এতদিন পরে দুই নদীর স্রোত মিশেছে এক মোহনায়।’ সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে দাঁড়িয়ে বেলাল মোহাম্মদ বলেছেন, ‘‘স্যার আমি পাকিস্তান বেতারের স্ক্রিপ্ট রাইটারের কাজ করতাম। ‘সিগনিফিক্যান্ট’ নামে একটি কনফিডেন্শিয়াল তথ্য-পত্রিকা আমাকে দেওয়া হতো কাউন্টার প্রোগ্রামের ডেটা হিসেবে ব্যবহারের জন্য। বলা হতো পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ভারত চাচ্ছে, কী করে পাকিস্তানকে ভেঙে দেওয়া যায়। আপনারা ১৯৪৯ সালে ‘বাংলাদেশ সেল’ গঠন করেছেন। তাহলে তো ওই ডেটাটি মিথ্যা নয়।” ড. ত্রিগুণা সেন অপ্রস্তুত হয়েছিলেন। বেলাল মোহাম্মদকে চুপ করিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, ‘ছি, এসব বলতে নেই, খোকা।’
অক্টোবর মাসে ড. ত্রিগুণার সঙ্গে বাংলাদেশ মিশনের সামনে পুনরায় সাক্ষাৎ হলে কুশল বিনিময়ের পর বেলাল মোহাম্মদ বলেন, ‘আপনি বলেছিলেন পহেলা নভেম্বর ঢাকায় বিজয় উৎসব হবে। আর তো দশ-পনেরো দিন বাকি পহেলা নভেম্বরের। লক্ষণ কিছুই দেখা যাচ্ছে না।’ কিছুটা হকচকিয়ে গিয়েছিলেন ড. ত্রিগুণা সেন। নিজের বক্তব্য সম্পর্কে বলেন, ‘হ্যাঁ, আমি তো আর জ্যোতিষীর মতো ভবিষ্যদ্বক্তা নই। সেটা ছিল পলিটিক্যাল এজাম্পশন। যুদ্ধের স্ট্র্যাটেজি অহরহ পরিবর্তন হয়েই থাকে। তবে এখন আবার বলছি, পহেলা নভেম্বরের আর বিলম্ব নেই। কিন্তু মিডল অব ডিসেম্বর? আশা করি এর মধ্যে পর্যাপ্ত সময়ের মার্জিন আছে। ওয়েট অ্যান্ড সি।’
এই ঘটনার পাশাপাশি আগরতলা মামলার অভিযুক্ত কর্নেল শওকত আলীর বক্তব্যেও তিনি বলেছেন, আগরতলা মামলা মিথ্যা ছিল না। অর্থাৎ ভারতের রাজনৈতিক স্বার্থে পাকিস্তান ভাঙা ছিল অপরিহার্য। ভারতের সেই আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করেছিল পাকিস্তানের সামরিক সরকার, জুলফিকার আলি ভুট্টোসহ সামরিক নেতারা। ভারত সুযোগের মওকাটি অধিক বুদ্ধিমত্তায় কেবল গ্রহণ করেছিল। তবে আমাদের রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতা পাকিস্তানি শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিল। একাত্তর আমাদের অহংকার ও গর্ব সেটা কিন্তু অস্বীকার করা যাবে না। তবে এই লেখার উদ্দেশ্য ভারতের একাত্তরের ভূমিকা নয়, বরং দেশটির বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের পরিবর্তিত রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং সেই সূত্রে একাত্তর-পরবর্তী ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত
