নিশ্চিন্তে ও নিরাপদে রাষ্ট্রের নিপীড়ন ও কর্তৃত্ব চালিয়ে নিতে ‘সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩’ নানান খোলস পাল্টেছে। এর পূর্বের নারকীয় আইনটির নাম ছিল ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮’। এরও পূর্বের আইনটি ছিল ‘তথ্য ও প্রযুক্তি আইন (আইসিটি আইন), ২০০৬’, যা সংশোধিত তথা আরও নিপীড়নমূলক হয় ২০১৩ সালে। সেই আইনের ৫৭ ধারা জনমানসে কুখ্যাতি অর্জন করেছিল। ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়–য়া, আইনজীবী, বাংলাদেশ সুপ্রিমকোর্ট, তার সুবাদে জানা যায় যে, সাইবার নিরাপত্তা আইনে ইতিমধ্যেই ২৭৫টি মামলা হয়েছে আর ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮; এই আইনে মামলার সংখ্যা ৫৮১৮। ‘নিরাপত্তার’ ছদ্মবেশে অনলাইন স্পেসকে ত্রাসের জায়গা বানাতে এসব আইনের প্রচলন এবং অপব্যবহারের কোনো জুড়ি নেই। আজকের আলোচনার কেন্দ্রে থাকবে কেন নিপীড়নমূলক রাষ্ট্রের চূড়ান্ত কর্তৃত্ববাদী হয়ে ওঠার জন্য এই জাতীয় সাইবার আইন এত গুরুত্বপূর্ণ এবং সমাজের বিভিন্ন স্তরে কী বিপুল ক্ষতি এটি করেছে।
‘বাতিলযোগ্য সাইবার নিরাপত্তা আইন : জনগণের প্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে (৮ অক্টোবর, ২০২৪), একজন ভিক্টিম জানাচ্ছিলেন যে, ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের বিষয়ে, ৩ আগস্ট ২০১৮তে নিজের ফেসবুকে তিনি দাবির সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এরপর ৫ আগস্ট তাকে রাত ১২টায় গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করা হয়। তার বিরুদ্ধে ‘উসকানির’ অভিযোগ আনা হয়। গ্রেপ্তারের সময় তিনি ছিলেন সাত মাসের অন্তঃসত্ত্বা। উনি বলছিলেন, ‘রাত ১২টায় আমাকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়, তখন আমাকে জানানো হয়নি যে, কী অপরাধে আমাকে তুলে নিয়ে যাচ্ছে’। তিনি বারবার জামিনের আবেদন করেও জামিন পাননি। ১৪ দিন কারাভোগের পরে তিনি জামিন পান। এরপর থেকে তিনি চাকরি থেকে সাসপেনশনে আছেন। কান্নাভেজা কণ্ঠে তিনি জানান, ‘সেই থেকে এই ছয় বছর আমি যে কী পরিমাণ মানবেতর জীবনযাপন করছি তা আমিই জানি’। তবে উনিই শেষ নন, এরপর আমরা ওই গোলটেবিলে জানতে থাকি কীভাবে ‘সাইবার নিরাপত্তা’ নামক আইনটি বহু মানুষের জীবন অতিষ্ঠ করে পশুর জীবনের দিকে ঠেলে দিয়েছে। বহু মানুষকে ঘর ছাড়া করেছে, অনেকে সামাজিক বয়কটের শিকার হয়েছেন, পালিয়ে থেকেছেন, রিমান্ডে যেতে হয়েছে অনেককে। সব মিলিয়ে এক ভীষণ বেদনাময় চিত্র। যেখানে রাষ্ট্র তার সবচেয়ে হিংস্র চেহারা নিয়ে হাজির থেকেছে।
আমাদের অনেকের মনেই অনলাইন স্পেস বলতে ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া, অনলাইন মার্কেট প্লেস, ই-কমার্স, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এসব ছবি ভেসে আসতে থাকে। এখনো অনেকের মধ্যেই এই ধারণা প্রবল যে, অনলাইন স্পেস আর অফলাইন স্পেস আলাদা। অফলাইন স্পেসটি হলো আসল আর বাকিটা মানে অনলাইন ততটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। যদিও একবিংশ শতকের দ্বিতীয় দশকে অনলাইন আর অফলাইনকে আলাদা করে দেখার কোনো সুযোগ আসলে নেই। আমরা বসবাস করছি হাইব্রিড সমাজে। এই সমাজের একজন সদস্য হিসেবে তাই দুই জায়গায় আমাদের ভীষণ প্রভাবিত করে এবং নির্মাণ করে। আরও যে বিষয়টি পরিষ্কার করা দরকার তা হলো ইন্টারনেট কিংবা ইন্টারনেটভিত্তিক যা কিছু যেমন সামাজিক মাধ্যম (ফেসবুক, এক্স, ইউটিউব), কিংবা অনলাইন মার্কেট প্লেস (যেমন রকমারি, দারাজ, আমাজন), কিংবা আপনার ইমেইলও আর কেবল যোগাযোগ মাধ্যমে সীমাবদ্ধ নেই। এটি সমাজে রূপান্তরিত হয়েছে। একই সঙ্গে প্রচলিত গণমাধ্যম যেমন টিভি, কাগজের পত্রিকা, রেডিও এসবই আর একমাত্র গণমাধ্যম নয়, সামাজিক মাধ্যম নিজেই গণমাধ্যম হয়ে উঠেছে। আপনাদের অনেকের মনে হতে পারে, ‘আরে দেশে তো অনেক মানুষের এখনো ইন্টারনেট এক্সেস নেই উনারা কীভাবে এই সমাজের অংশ?’ উনারাও এই সমাজের অংশ কারণ কোনো না কোনোভাবে তাদের জীবনকে এই অনলাইন পরিসর প্রভাবিত করছে। যেমন, সাম্প্রতিক পাহাড়ি ঢলে প্রত্যন্ত এলাকার মানুষের কাছে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার বিষয়টি আমার অনেকেই প্রথম জানতে পারি সামাজিক মাধ্যমে। ফেনীর বন্যা, এখন উত্তরবঙ্গের বন্যা সবখানেই ত্রাণ তৎপরতা কিংবা মনোযোগ না দেওয়ার বিষয়গুলো কিন্তু সামাজিক মাধ্যমে উঠে আসছে। অনলাইন সামাজিকতা অফলাইনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখছে। ক্রমাগতভাবে অনলাইন আর অফলাইন মিশে যাচ্ছে। খেয়াল করুন কভিড ১৯-এর সময়টি। মনে করুন জুলাই মাসের ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়ার সময়টির কথা।
তাহলে মূল কথাটি হলো, ইন্টারনেটভিত্তিক যে সমাজ এবং অফলাইনের যে সমাজ দুই মিলিয়েই সমাজ। আমরা সেই সমাজেরই নাগরিক। ফলে অত্যন্ত মর্মান্তিক হলেও তথাকথিত সাইবার নিরাপত্তা আইন আসলে দুই সমাজের মিলিত যে হাইব্রিড সমাজ সেটিকে ত্রাসের রাজত্ব বানানোর জন্য সবচেয়ে জোরালো ভূমিকা রেখে এসেছে। রাষ্ট্র এবং গভর্নেন্স কেমন চায় এবং কোন ধরনের নাগরিক নির্মিত হবে, তার আচরণ কেমন হবে, সেটি নিয়ন্ত্রণে সাইবার আইন একটি যথার্থ অস্ত্র। যদিও এমনটি হওয়ার কথা ছিল না। কথা ছিল নাগরিকদের সর্বোচ্চ সুরক্ষা আর সব মানুষের নিরাপত্তার জন্য তৈরি হবে আইন এবং অবকাঠামো। একটি ভয়ার্ত, তোষামোদপ্রবণ, আতঙ্কগ্রস্ত, দায়িত্বজ্ঞানহীন সমাজ তৈরিতে বাংলাদেশের সাইবার আইনের ন্যক্কারজনক ভূমিকার কোনো তুলনা নেই। কেন বলছি?
যেহেতু আমি ২০০৬ সাল থেকে বাংলাদেশের ইন্টারনেট স্পেসের সঙ্গে নানান ভূমিকায় সংযুক্ত এবং এর বিভিন্ন বিষয়ে গবেষণা করে আসছি তাই একটি দীর্ঘ এবং সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষণ আমার রয়েছে। আজকের অনলাইন স্পেসের ভীতিকর অবস্থা আগে ছিল না। একদিকে যেমন ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে উঠছিল তেমনি এখানেও নানান রকমের ব্লগ, সাইট, নিউজ পোর্টাল গড়ে উঠছিল। একই সঙ্গে প্রচলিত গণমাধ্যমকে ছাড়িয়ে সামাজিক মাধ্যম নিজেদের অল্টার্নেটিভ নিউ মিডিয়া হিসেবে হাজির করছিল। ২০১৩-এর শাহবাগ আন্দোলনে আগের ছোট অনলাইন স্পেসটি বাংলাদেশের ভেতরে এবং বাইরে সবখানে ছড়িয়ে যায়। একটি জনপরিসর তাই রাজনৈতিক পরিসর হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করে। ফলে ২০০৬ সালে প্রায় নিভৃতে তৈরি হওয়া প্রথম আইনটি সংশোধন হয়। রাষ্ট্র বিপুল ব্যয় করতে থাকে এই পরিসরকে নিয়ন্ত্রণ করার পেছনে। তৈরি হতে থাকে নানান প্রতিষ্ঠান, মন্ত্রণালয়। সামাজিক মাধ্যমের রাজনৈতিক শক্তিকে অনুধাবন করার মাধ্যমেই এই পরিসরকে যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণে আনার তৎপরতা চলতে থাকে। যেই ইন্টারনেট এবং সামাজিক মাধ্যমকে ভাবা হচ্ছিল গণতন্ত্রের সহায়ক হিসেবে, সেটিকে পরিণত করা হয় সবচেয়ে ভীতিকর পরিসর হিসেবে। রাষ্ট্রের সব বাহিনীকে সর্বোচ্চ ছাড় দেওয়া হয় নাগরিকদের নিয়ন্ত্রণ করার পেছনে। অনলাইন পরিসর ম্যানিপুলেট করার জন্য বিপুল বিনিয়োগ করা হয়। প্রচলিত গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনার চাইতে সামাজিক মাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন। তাই খেয়াল করে দেখবেন গণমাধ্যমকর্মী, সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের ওপর একের পর এক খড়গ নেমে আসতে থাকে সাইবার আইনে। শেষ আশ্রয় হিসেবে যারা সামাজিক মাধ্যমকে আঁকড়ে ধরেন সেই অনলাইন স্পেসকে করে তোলা হয় ভয়ংকর ভীতিকর জায়গা হিসেবে। সর্বগ্রাসী ফ্যাসিস্ট রিজিমের জন্য এটি খুব জরুরি ছিল। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকে দায়িত্বশীল করার বদলে ভয়ে কুঁকড়ে থাকা এবং তোষামোদের চর্চা চালু করা হয়। অনলাইন স্পেস কখনোই তার সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও প্রাযুক্তিক বাস্তবতার বাইরে থাকে না। ফলে বাংলাদেশের অনলাইন জনগণ আর আমেরিকার জনগণ এক নন। ফ্রিডম অব এক্সপ্রেশন একটি বাহাসে পরিণত হয়। আজ যে ‘বাক্ দায়িত্বহীনতা’ দেখা যাচ্ছে সমাজে তা এভাবেই নির্মিত। নাগরিককে সক্ষম এবং শিক্ষিত করার বদলে মূলত বিনিয়োগ হয়েছে, ত্রাস তৈরিতে।
চলমান সাইবার আইন এই নৃশংস শাসনব্যবস্থার প্রতীক। নাগরিককে তার মৌলিক অধিকার বঞ্চিত করা, বিশেষায়িত ন্যারেটিভ তৈরি করা, একে অপরের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়ার যে সংস্কৃতি তৃণমূল পর্যন্ত পৌঁছে গেছে ভৌগোলিক সীমারেখা ছাড়িয়ে বিভিন্ন ডায়াস্পোরায় ছড়িয়ে গেছে সেটিরও প্রতীক এটি। ইন্টারনেট বন্ধ করে হত্যা চালাবার খবরই শুধু গোপন করার চেষ্টা করা হয়নি বরং সামাজিক ভয়কে আরও আক্রমণাত্মক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী বাংলাদেশে এই সামাজিক ক্ষতি কবে আমরা পুষিয়ে নিতে পারব তা জানা নেই। সাইবার আইন নামক এই প্রতীককে ভেঙে ফেলতে হবে এবং সব সাইবার আইনকে নাগরিকের সুরক্ষার জন্য আবার নির্মাণ শুরু করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সাইবার আইন একবিংশ শতকের সমাজ নির্মাণের আইন, কোন ধরনের রাষ্ট্র আমরা চাই আর কোন ধরনের নাগরিক আমরা হতে চাই, কোন বাংলাদেশ আমরা চাই এবং সর্বোপরি কোন ধরনের সমাজ আমরা চাই তা সাইবার আইনের ওপর অনেকাংশে নির্ভরশীল।
লেখক: নৃবিজ্ঞানী, শিক্ষক, লেখক, সোশ্যাল মিডিয়া তাত্ত্বিক
